kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৫ রবিউস সানি          

চালক-যাত্রী সবাই যখন নারী

দুই বছর ধরে শুধু নারীদের রাইড দিয়ে আসছে লিলি। এটির চালকরাও নারী। অ্যাপভিত্তিক এই স্কুটারসেবাটি আপাতত রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ। প্রতিদিন গড়ে ৩০০ রাইডের অনুরোধ আসে এই অ্যাপের মাধ্যমে। প্রতিনিয়ত বাড়ছে এই সংখ্যা। জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



চালক-যাত্রী সবাই যখন নারী

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

যাত্রা হলো শুরু

দেশে রাইড শেয়ারিং ফুলেফেঁপে ওঠার বছর ২০১৭। সে বছর দেশীয় বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান রাইড শেয়ারিং অ্যাপ নিয়ে আসে। যাত্রী হিসেবে ঢাকায় তখন নারী-পুরুষ উভয়ই সেসব অ্যাপে নিবন্ধন করেন। রাইড নেন। কিন্তু একজন অপরিচিত পুরুষ বাইকারের সঙ্গে রাইড নেওয়ার সময় বেশির ভাগ নারীই খুব স্বস্তি বোধ করতে পারেন না। তেমনই একটি ঘটনা ঘটে সৈয়দ মো. সাইফুল্লাহর পরিবারে। তাঁকে অস্বস্তিকর এক রাইড শেয়ারিংয়ের অভিজ্ঞতা জানান স্ত্রী। সেই অভিজ্ঞতার কথা শোনার পর সাইফুল্লাহ চিন্তা করেন নারীদের জন্য এমন কোনো আলাদা রাইড শেয়ারের ব্যবস্থা করা যায় কি না, যা তাঁদের জন্য স্বস্তিদায়ক হবে। সেই চিন্তা থেকেই নারীদের জন্য আলাদা রাইড শেয়ারিং আনার জন্য কাজ শুরু করেন তিনি, যেখানে বাইকার এবং রাইডার উভয়ই হবেন নারী।

সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে ২০১৭ সালের ২ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে ‘লিলি’।  

 

রাইড শেয়ারিং, তবে ধারণা ভিন্ন

শুরুর দিকে যখন অ্যাপটি বাজারে ছাড়া হয়, তখন ৭২ জনের মতো নারী ফ্রিল্যান্স বাইকার রাইড শেয়ারিং দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেন। তাঁদের নিয়ে সে সময় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এরপর রাইড শেয়ারিং শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যে অনেক ফ্রিল্যান্সার বাইকার ঠিকমতো রাইড দিচ্ছিলেন না। তাই অনেক রাইডের রিকোয়েস্ট এলেও সেগুলো দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এরপর একটু ভিন্ন মডেলে রাইড শেয়ার করার কথা ভাবে লিলি। লিলিতে স্থায়ী নারী বাইকার নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়। সেই পরিকল্পনা থেকে একটি বাইক কিনে মাত্র একজন রাইডার দিয়ে শুরু হয় লিলির রাইড সেবা।

নারীদের জন্য বাইক শেয়ারিং অ্যাপটির লিলির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সহপ্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ সাইফুল্লাহ জানান, ‘আমরা চেয়েছি, যাঁরা আমাদের রাইড শেয়ারিং সেবা নেবেন, তাঁরা যেন সেটি ধারাবাহিকভাবে নিতে পারেন। সে জন্য স্থানীয়ভাবে বাইকার রাখার চেষ্টা করেছি।’

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯ জন নারী স্থায়ী বাইকার রয়েছেন। আর তাঁরা যে বাইকগুলো ব্যবহার করেন, সেগুলো সবই লিলি থেকে দেওয়া। ফ্রিল্যান্স বাইকাররাও রাইড শেয়ারিং করেন। লিলিতে এখন দিনে গড়ে তিন শতাধিক রাইডের অনুরোধ আসে।

 

নারীদের নিরাপদ রাইড

নারীদের জন্য রাইডকে নিরাপদ করতে রয়েছে লিলির নির্দিষ্ট গাইডলাইন। যেমন—অনেক সময় দেখা গেছে অনেক পুরুষ অ্যাপে অনুরোধ পাঠিয়েছেন নারী নাম ব্যবহার করে। হয়তো ফোন করে বাইকার বুঝেছেন তিনি নারী নন, তখন রাইড বাতিল করতে হয়েছে। আবার এমনও হয়েছে, নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে দেখা গেছে সেবাপ্রার্থীটি পুরুষ, তখন রাইড দেননি বাইকার। লিলি সব সময় নারীদের নিরাপত্তার দিকটিতেই বেশি নজর দিয়েছে। কেননা বাইকার রাইডার দুজনই নারী।

বাইকার নারীদের নিরাপদ রাখতে বনানী থেকে উত্তরা রোডের দিকে রাইড শেয়ারিং দেয় না প্রতিষ্ঠানটি। যদি সেদিকের কোনো নারী রাইডের জন্য অনুরোধ পাঠান, তবে তাঁদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলা হয়।

 

প্রশিক্ষণ দেন নারীরাই

বাইকার হিসেবে যাঁরা প্ল্যাটফর্মটিতে নিবন্ধন করাতে চান, তাঁদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে লিলি। লিলিতে যেসব দক্ষ নারী বাইকার রয়েছেন, তাঁরা সেই প্রশিক্ষণ পরিচালনা করেন। বাইকার হিসেবে দক্ষ না হলে রাইড শেয়ারিং দেওয়ার বিষয়েও সতর্ক থাকে প্রতিষ্ঠানটি।

 

চালকদের জন্য নিবন্ধন

লিলি অ্যাপে ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নারীরা রাইড শেয়ারিং করতে পারেন। সে জন্য তাঁদের নিবন্ধন করতে হয় প্লেস্টোরের https://urlzs.com/HTQ3S থেকে লিলির রাইডার অ্যাপ নামিয়ে। বাইকার হিসেবে নিবন্ধনের জন্য যেকোনো নারী বাইকারকে অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। এরপর সেখানে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের সময় বাইকারকে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র, ড্রাইভিং সনদ, বৈধ বাইকের কাগজপত্র সাবমিট করতে হবে। এরপর লিলি কর্তৃপক্ষ সেটি যাচাই-বাছাই করবে। তার পরই শুধু তাঁকে বাইকার হিসেবে পূর্ণাঙ্গভাবে নিবন্ধন করা হবে। 

সাইফুল্লাহ বলেন, ‘অনেক পুরুষ অ্যাপটি নামিয়ে নিবন্ধন করাতে চেয়েছেন। কিন্তু আমাদের নজরদারিতে সেটা সম্ভব হয়নি।’ 

 

যাত্রীদের জন্য লিলি অ্যাপ

ব্যবহারকারী হিসেবে লিলি অ্যাপে নিবন্ধন করাতে অবশ্য নারীদের খুব বেশি কিছু করতে হয় না। এ জন্য প্লেস্টোরের https://urlzs.com/4gAik এই লিংক থেকে লিলির অ্যাপ নামিয়ে নিবন্ধন করতে হবে।

 

স্বপ্নটা অনেক বড়

লিলি টেকনোলজিস বড় স্বপ্ন নিয়ে এগোচ্ছে। সৈয়দ মোঃ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘অনেকেই যেমন বলেন, তাঁরা নারীদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছেন। অন্যদিকে আমরাও নারীদের নিয়ে কাজ করি; কিন্তু বলছি না যে নারীদের জন্য অনেক কর্মসংস্থান তৈরি করব। এটা যদি ব্যাবসায়িক দিক থেকেও দেখি, তবে বড় একটা বাজার হতে পারে, যেখানে কাজের সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবসারও সুযোগ রয়েছে। সেসব সুযোগ যখন কাজে লাগাতে পারব, তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি হবে।’

শুধু রাইড শেয়ারিংয়েই সীমাবদ্ধ নেই লিলি টেকনোলজিস। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটি এখন নারীদের জন্য অনলাইন টেইলার্স সার্ভিস দিতে যাচ্ছে। নারীরা যেসব টেইলার্স সার্ভিস নেন, সেগুলোতে পুরুষরাই বেশি কাজ করেন। অনেক সময় নারীরা তাঁদের দ্বারা হয়রানির শিকার হন। আর সেই ভাবনা থেকেই পাইলট প্রকল্প হিসেবে লিলি টেইলার্স শুরু করেছে লিলি টেকনোলজিস। সৈয়দ মোঃ সাইফুল্লাহ বলেন, ‘একজন নারীর পোশাকের মাপজোখ সবই আমাদের একজন দক্ষ কর্মী বাসায় গিয়ে নিয়ে আসেন। সেটি তৈরি হলে আবার তা ডেলিভারিও করে দেন। লিলি টেইলার্স এখনো পাইলট প্রকল্প হিসেবে রয়েছে বলে অ্যাপে সেবাটি পাওয়া যাচ্ছে না। তবে শিগগিরই সেবাটি অ্যাপে আনা হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা