kalerkantho

শনিবার । ২৪ আগস্ট ২০১৯। ৯ ভাদ্র ১৪২৬। ২২ জিলহজ ১৪৪০

অ্যানড্রয়েড গোর হালহকিকত

২০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অ্যানড্রয়েড গোর হালহকিকত

স্মার্টফোনের র‌্যাম ও রম কম হলে ফোন ধীর গতির কিংবা সব অ্যাপ কাজ না-ও করতে পারে। এই সমস্যা সমাধানে কম কনফিগারেশনের স্মার্টফোনের জন্য অ্যানড্রয়েডের হালকা সংস্করণ হিসেবে ‘অ্যানড্রয়েড গো’ চালু করেছে গুগল। জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

 

প্রায় দুই বছর আগে গুগল প্রকাশ করে অ্যানড্রয়েডের হালকা সংস্করণ ‘অ্যানড্রয়েড গো’। মূলত ৫১২ মেগাবাইট থেকে ১ গিগাবাইট র‌্যামসংবলিত স্মার্টফোনের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা একটি অপারেটিং সিস্টেম, যা হার্ডওয়্যারের সঙ্গে বিশেষ সমন্বয়ে কাজ করে। এই প্লাটফর্মের জন্য আলাদাভাবে হালকা সাইজের অ্যাপ তৈরি করেন ডেভেলপাররা। গুগল তাদের সব সেবা যেমন—ইউটিউব, অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফাইলস, ম্যাপস ইত্যাদির ‘গো’ সংস্করণও নিয়ে আসে এই বিশেষ প্লাটফর্মটিকে কেন্দ্র করে। গুগলের দাবি অনুযায়ী এই অ্যাপগুলো সাধারণ অ্যাপের চেয়ে ১৫ শতাংশ দ্রুত কাজ করে।

অ্যানড্রয়েড গো জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে শাওমি ও স্যামসাংয়ের মতো বড় দুই মোবাইল প্রস্তুতকারক বেশ অবদান রেখেছে। এখন তাদের দেখানো পথে অনেকে হাঁটতে শুরু করেছে। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, মোবাইল বাজারে অচিরেই ‘অ্যানড্রয়েড গো’ হয়ে উঠতে পারে জনপ্রিয় এক অপারেটিং সিস্টেম।

 

যেমন হয় অ্যানড্রয়েড গো ফোন

গুগলের বেঁধে দেওয়া স্পেসিফিকেশনের বাইরে অ্যানড্রয়েড গো ফোন তৈরি করতে পারবেন না নির্মাতারা। ফোনটির দাম হতে হবে ১০০ ডলারের কম, সেটির র‌্যাম হতে হবে ঠিক ১ গিগাবাইট, স্টোরেজ হতে হবে ৮ অথবা ১৬ গিগাবাইট, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর বা ফেইস আনলক থাকবে না। ফোনে ডুয়াল ক্যামেরা ব্যবহার করা যাবে না, থাকতে হবে মেমোরি কার্ড স্লট। অতএব শক্তিশালী অ্যানড্রয়েড গো ফোনের দেখার সুযোগ আপাতত নেই বললেই চলে। অনেক বিশেষজ্ঞ এবং ব্যবহারকারী অবশ্য গুগলকে র‌্যামের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য আবেদন জানাচ্ছেন, ভবিষ্যতে ২ গিগাবাইট র‌্যাম ব্যবহারের জন্য অনুমতি গুগল দিতেও পারে।

 

সফটওয়্যারে পার্থক্য

গুগল সরাসরি পরিষ্কার করে না বললেও, অ্যানড্রয়েড গো সিস্টেম সব সময়ই ৩২বিট মোডে চলে। ফোনের প্রসেসর ৬৪বিট হলেও, গো-সংবলিত ফোনে সেটি ৩২বিট মোডেই কাজ করবে। মূল অ্যানড্রয়েডের সঙ্গে গো সংস্করণের পার্থক্য এখানেই। এর বাইরে আছে, অল্প র‌্যাম ও স্টোরেজ সঠিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য বিশেষায়িত কিছু টুইক। গুগল সেবাগুলোর হালকা সংস্করণ গো ফোনগুলোতে দেওয়া হয়, এতে জায়গা, র‌্যাম এবং প্রসেসরের ওপর চাপ অনেকাংশে কমে যায়। বিশেষ করে ‘গুগল প্লে সার্ভিসেস গো’ সংস্করণ মূল অ্যানড্রয়েড সংস্করণের চেয়ে প্রায় তিন গুণ ছোট। আবার ইউটিউব গো সংস্করণে ভিডিও ডাউনলোড করা এবং অন্যদের সঙ্গে সে ভিডিও শেয়ার করারও উপায় আছে। তবে গো অ্যাপ সব সময় কাজের তা নয়, যেমন ম্যাপস গো সংস্করণ মূল ম্যাপসের চেয়ে অনেক কম ফিচারসমৃদ্ধ।

 

দৈনন্দিন ব্যবহারে অ্যানড্রয়েড গো

অন্যান্য অ্যানড্রয়েডের সঙ্গে গো ফোনগুলোর পার্থক্য প্রথমেই হয়তো চোখে পড়বে না। স্পেসিফিকেশনের তুলনায় ফোনের পারফরম্যান্স ভালো পাওয়া যাবে, এটুকুই। তবে ফোন কেনার পর শুরুতেই কিছু গো অ্যাপ বাদ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ গুগল সেবার অ্যাপ ইনস্টল করে নিতে হবে, যেমন—ম্যাপস, ইউটিউব, জি-মেইল। ইউটিউবের গো সংস্করণের মূল সীমাবদ্ধতা, ভিডিও রেকমেন্ডেশন এবং ভিডিওতে কমেন্ট করার উপায় নেই। ম্যাপস গো আসলে অ্যাপ নয়; বরং ম্যাপস সাইটের জন্য একটি ইন্টারফেইস। ফলে এতে নেই অফলাইন ম্যাপস, ক্যাশিং বা নেভিগেশন সুবিধা। আর জি-মেইল গোর মূল সমস্যা, অ্যাটাচমেন্ট খোলার কোনো উপায় নেই। অ্যানড্রয়েড গো ফোনগুলোতে ফেইসবুক অ্যাপের লাইট সংস্করণ ইনস্টল করা উচিত। কেননা এটি প্রচুর র‌্যাম ও প্রসেসর ব্যবহার করে থাকে। ফোনে অবশ্যই অন্তত ৩২ গিগাবাইট মেমোরি কার্ড ব্যবহার করতে হবে, না হলে ইন্টারনাল স্টোরেজ খুব দ্রুতই ফুরিয়ে যাবে।

 

উল্লেখযোগ্য কিছু অ্যানড্রয়েড গো ফোন

সবার প্রথম দেশের বাজারে অ্যানড্রয়েড গো এনেছিল এইচএমডি গ্লোবাল। তাদের ‘নকিয়া ১’ ফোনটি অবশ্য তেমন একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। এরপর বাজারে আসে ‘স্যামসাং গ্যালাক্সি জে২ কোর’। নিজস্ব এক্সিনস ৭৫৭০ প্রসেসরে তৈরি ফোনটিতে স্যামসাংয়ের নিজস্ব স্কিন ব্যবহার করা হয়েছে। স্যামসাং সম্প্রতি ‘এ২ কোর’ নামে আরো একটি অ্যানড্রয়েড গো ফোন বাজারে এনেছে, যার প্রসেসর অক্টাকোর। তবে কোনোটিই ‘রেডমি গো’র মতো জনপ্রিয়তা পায়নি। শাওমির তৈরি ফোনটিতে কাস্টমাইজেশনহীন অ্যানড্রয়েড ব্যবহার করা হয়েছে। ফোনটির অন্যান্য হার্ডওয়্যার মিলিয়ে এখনো পর্যন্ত এটাই বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় অ্যানড্রয়েড গো ডিভাইস।

 

অ্যানড্রয়েড গোর খামতি

‘গেইমিং’ শব্দটিই মাথায় রাখা যাবে না অ্যানড্রয়েড গো কেনার সময়। কোনো মতে দৈনন্দিন স্মার্টফোনের কাজ, যেমন—ইন্টারনেট ব্রাউজ করা, ভিডিও দেখা, গান শোনা, টুকটাক ছবি তোলা এবং ই-মেইল বা চ্যাটিং ছাড়া আর কোনো কাজেই অ্যানড্রয়েড গো পারদর্শী নয়। মূল্য অনুযায়ী অবশ্য এই অপারেটিং সিস্টেমের ফোনে গেইমিং আশা করাটাই ভুল। র‌্যামের স্বল্পতা মাল্টিটাস্কিং করার ক্ষেত্রে বাধা দেবে। তাই রাইড শেয়ারিং অ্যাপগুলোর জন্যও অ্যানড্রয়েড গো তেমন কাজের নয়। বিশেষ করে ‘রেডমি গো’তে অনেক সময় উবার ইনস্টল না হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। ট্যাক্স এবং অন্যান্য ফি দেওয়ার পর অ্যানড্রয়েড গো ফোনের দাম দেখা যায় বাজারে মূল অ্যানড্রয়েড ফোনের কাছাকাছি পড়ে যায়। সে ক্ষেত্রে গো ডিভাইস বাদ দিয়ে সেগুলোই নেওয়া উচিত, যদিও অ্যানড্রয়েড গোর মতো পারফরম্যান্স হয়তো সেগুলো দেবে না।

 

সুবিধা আছে অনেক

পুরো অপারেটিং সিস্টেমটি হালকা হওয়ায় ব্যাটারি লাইফে গো সিরিজের ফোনগুলো বেশ এগিয়ে। শুধু কথা বলা, হালকা ভিডিও দেখা এবং অল্পস্বল্প চ্যাটিং করলে অনায়েসে তিন-চার দিন চার্জ না দিয়েই গো ফোনগুলো ব্যবহার করা যায়। এটার প্রধান কারণ স্ট্যান্ডবাইতে থাকাকালীন ফোনগুলো কয়েক ঘণ্টায়ও ১ শতাংশ চার্জ ব্যবহার করে না। ধীরে ধীরে স্টোরেজ ভরে যাওয়া আর ল্যাগ করা স্বল্পমূল্যের অ্যানড্রয়েডের চিরচেনা সমস্যা, যা গো ফোনগুলোতে নেই। এ দুটি কারণে যাদের স্মার্টফোন তেমন ব্যবহার হয় না, যেমন পরিবারের বয়স্ক মানুষদের জন্য এটি হতে পারে আদর্শ। অন্তত প্রতিদিন ফোন চার্জ দেওয়ার মতো সমস্যায় পড়তে হবে না তাঁদের। গুগল অ্যাসিস্ট্যান্ট গো সহজেই কথা বুঝতে ও বলতে পারে আজ, তা-ও বাংলাতেই।

 

ভবিষ্যৎ

অ্যানড্রয়েড গো নিয়ে কাজ বন্ধ করেনি গুগল; কিন্তু তার অগ্রগতিও যে খুব একটা হচ্ছে তা-ও কিন্তু নয়। অ্যানড্রয়েড পাইয়ের গো সংস্করণ শুরুতে এতটাই সমস্যাযুক্ত ছিল যে এখনো অনেক ফোন নির্মাতা সেটি তাদের ফোনগুলোতে ব্যবহার করছে না বা ডিভাইসে আপডেটও দেওয়া হচ্ছে না। অ্যানড্রয়েড কিউ গো সংস্করণ কবে আসবে বা তার নতুন ফিচার কি হবে তা নিয়েও খোলাসা করে তেমন কিছু জানায়নি তারা। এদিকে গুগল খুব দ্রুতই ৩২বিট অ্যাপ প্লে স্টোরে প্রকাশ করা বন্ধ করে দেওয়ার কথা ভাবছে। সেটি হতে এখনো দুই বছর বাকি আছে। তাই বর্তমান গো ব্যবহারকারীদের তা নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটাই প্রমাণ করে অ্যানড্রয়েড গোকে খুব বেশি দিন টিকিয়ে না-ও রাখতে পারে গুগল। হয়তো মূল অ্যানড্রয়েডের মধ্যেই গোর ফিচারগুলো একসময় ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। নির্মাতারা সেগুলো স্বল্পশক্তির ফোনগুলোতে চালু করে দিতে পারবেন। আবার এ কথাও বলা যায়, ব্যবহারকারীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলে এই চিত্রটাও হয়তো বদলে যেতে পারে। তবে গুগল যে উদ্দেশ্যে অ্যানড্রয়েড গো তৈরি করেছে—স্মার্টফোন আর ফিচার ফোনের মাঝখানের বাজারের ক্রেতাদের জন্য, সে উদ্দেশ্যে যে তারা এর মধ্যেই উতরে গেছে এ কথা বলা যেতেই পারে।

মন্তব্য