kalerkantho

সোমবার । ১৪ অক্টোবর ২০১৯। ২৯ আশ্বিন ১৪২৬। ১৪ সফর ১৪৪১       

যখন খুশি তখন দেখো

দেশে আইপি টিভি বা ইন্টারনেট টিভি সেবা চালু হবে—এমন আলোচনা চলছে। সঙ্গে আসতে পারে ভিডিও অন ডিমান্ড সেবাও। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল-আমিন দেওয়ান

৫ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যখন খুশি তখন দেখো

মডেল : মাহিয়া ছবি : তারেক আজিজ নিশক

বাংলাদেশে এখন সবার বাসায় বাসায় যে কেবল টিভি চলে সেখানে আমরা দেখি বাইরে থেকে একটি গোল মোটা কালো কেবল বা তার এসে টিভির সঙ্গে প্লাগইন বা যুক্ত হয়েছে। একটু উন্নত ছবি ও বেশি চ্যানেলের জন্য এই কেবল আবার একটা সেট-টপ বক্স হয়ে টিভির সঙ্গে যুক্ত হয়। সাধারণভাবে একে ডিশের লাইন বলা হয়ে থাকে।

একেকটি এলাকায় এই ডিশের লাইনের অপারেটর বা কেবল অপারেটর থাকে। কেবল অপারেটরের স্টেশনে বড় বড় ডিশ অ্যান্টেনা থাকে, যেখান থেকে স্যাটেলাইট থেকে ব্রডকাস্ট সিগন্যাল এসে ওই কেবলের মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি টিভিতে অডিও-ভিডিও সম্প্রচারিত হয়।

আইপি টিভি বা ইন্টারনেট প্রটোকল টিভি বা ইন্টারনেট টেলিভিশনের ক্ষেত্রে এই সিগন্যাল ইন্টারনেট দিয়ে আসে। এর জন্য অ্যান্টেনার দরকার হয় না। মানে এখানে কোনো রেডিও সিগন্যালে অডিও-ভিডিও না এসে ইন্টারনেটের মধ্য দিয়ে আসে। যেটি একসঙ্গে ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড হয়ে স্ট্রিমিং বা সম্প্রচারিত হতে থাকে।

 

আইপি টিভির প্রকার

আইপি টিভি সেবার অন্যতম একটি হচ্ছে ভিডিও অন ডিমান্ড বা ভিওডি। নেটফ্লিক্স, আইফ্লিক্স বা এমন ধরনের সেবা হচ্ছে ভিওডি। এতে মুভি, নাটক, টিভি সিরিয়ালসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান বিভিন্ন প্লে লিস্টে দেওয়া থাকে। এখানে গ্রাহক যখন যেটা খুশি দেখে নিতে পারে। দেখা যায় টিভি চ্যানেলগুলোও।

 

চালাতে যা দরকার হবে

ডিশের কেবলে যেভাবে টিভি দেখা যায় এখানেও বিষয়টি খুব একটা ব্যতিক্রম নয়। আইপি টিভি অপারেটররা কেবল অপারেটরদের মতোই সংযোগ দিয়ে যাবে। তবে এখানে ইন্টারনেট লাইনে বা কেবলে আইপি টিভির সেবা পাওয়া যাবে।

এ জন্য ৫ থেকে ১০ এমবিপিএস গতির ইন্টারনেট সংযোগ হলেই হবে। এতে এইচডি ছবিও নিরবচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে। ইন্টারনেট টিভি বা স্মার্ট টিভি হলে সরাসরিই ইন্টারনেট কেবল টিভিতে সংযোগ হবে। আর স্মার্ট টিভি না হলে একটি সেট-টপ বক্স নিতে হবে। এই সেট-টপ বক্স ইন্টারনেট থেকে আসা অডিও-ভিডিওকে ডিকোড করবে এবং টিভি স্ট্রিমিংয়ের উপযুক্ত করবে। এই সেট-টপ বক্স আইপি টিভি অপারেটররা দিয়ে যাবে। চাইলে স্মার্টফোন ও কম্পিউটারে আইপি টিভি দেখা যাবে। সে ক্ষেত্রে শুধু অপারেটরের সংযোগ থাকলেই হবে। 

 

সুবিধা

আইপি টিভির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সুবিধা আপনি আপনার সুবিধাজনক সময়মতো অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন। যেমন—একটি নাটক রাত ৯টায় প্রচারিত হবে। আপনি ওই সময় ব্যস্ত থাকবেন। কিন্তু নাটকটিও মিস করতে চান না। আইপি টিভি এই নাটক আপনি যখন দেখতে চান তখনই সম্প্রচার করবে। আইপি টিভি আপনার নির্দেশমতো ওই নাটক স্বয়ংক্রিয়ভাবে রেকর্ড করে রাখবে এবং আপনার সময়ে প্রচার করবে।

এ ছাড়া ছবির মান ভালো হবে, যেমন এইচডি ও ফোরকে রেজল্যুশনে টিভি দেখা যাবে। এক ইন্টারনেট লাইনে আইএসপিদের কাছ থেকে ভয়েস, ডাটা ও আইপি টিভির সেবা নেওয়া যাবে। ফলে ট্রিপল প্লের বিভিন্ন প্যাকেজে গ্রাহকের খরচ বেশ কমবে। 

 

আইপি টিভির প্রকৌশল

একসময় আমরা টিভি দেখতে বাড়ির ছাদে বা বাসার বাইরে উঁচু করে লম্বা মাছের কাঁটার মতো অ্যান্টেনা স্থাপন করতাম। এই অ্যান্টেনার সঙ্গে টিভির সংযোগ করা থাকত একটি চ্যাপ্টা কেবল বা তার দিয়ে। অ্যান্টেনা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে একটা দিকে রাখা হতো, যা দিয়ে রেডিও সিগন্যাল এসে টিভিতে অডিও ও ভিডিও চলত। এতে বিশেষ করে বিটিভি দেখা যেত। পরে ডিশের মতো অ্যান্টেনা এলো। সেই সময়ে বেশ দামি এই অ্যান্টেনায় কিছু বিদেশি চ্যানেল দেখা যেত। এটি এলাকায় দু-একটি বাড়িতে দেখা মিলত।   

টিভি স্টেশন থেকে অনুষ্ঠান বেতার তরঙ্গে রূপান্তরিত করে অ্যান্টেনা দিয়ে বাতাসে ছেড়ে দেওয়া হতো। আমাদের বাসার ছাদে থাকা অ্যান্টেনা সেটি ধরে তরঙ্গ থেকে ইলেকট্রিক্যাল সিগন্যালে রূপান্তর করে টিভিতে দিয়ে দিত। টিভি সেই সিগন্যালকে অডিও-ভিডিওতে রূপান্তর করে দেখাত।

আইপি টিভিতে লাইভ অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে একই সময় অনুষ্ঠানটি রেকর্ড করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পাঠানো হয়ে থাকে। আর অনুষ্ঠানে রেকর্ড করে রেখে বা চ্যানেলের পুরনো অনুষ্ঠান দেখতে গেলে সেটি বেশ ক্ষমতাসম্পন্ন সার্ভার থেকে দেখতে হয়। সার্ভারে অনুষ্ঠানগুলোর  ডিজিটাল ফরম্যাট সংরক্ষিত থাকে, তা অনুষ্ঠান অ্যানালগ রেকর্ড হলেও।

আইপি টিভি প্রথমে আইপি অ্যাড্রেসের মাধ্যমে সার্ভারের সঙ্গে সংযোগ নেয়। এরপর সার্ভার সফটওয়্যার দিয়ে টিভিতে অডিও-ভিডিও পাঠায়। স্মার্ট টিভিতে তা সরাসরি চলে। আর স্মার্ট টিভি না হলে সেট-টপ বক্স লাগে। এই বক্স ইন্টারনেট থেকে আসা অডিও-ভিডিও ডাটা প্যাকেটগুলো নিয়ে তা ডিকোড করে টিভিতে চলার উপযুক্ত করে।

 

বাংলাদেশে আইপি টিভি

এখন বাংলাদেশে কোনো আইপি টিভি নেই। ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর এই সেবা চালুর বিষয়টিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। তখন জাগোবিডি অ্যাপস ডাউনলোড করে টিভি চ্যানেল দেখা, গ্রামীণফোনের বায়স্কোপের মতো কিছু ভিওডি সেবা চালু ছিল। তবে বাংলাদেশে নেটফ্লিক্সের মতো সেবা চলছে। নেটফ্লিক্সের মতো কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ভিওডি সেবা বাংলাদেশের গ্রাহকরা ‘বিভিন্ন মাধ্যমে’ পেমেন্ট করে নিয়ে থাকে।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (আইএসপি) জন্য বাংলাদেশে স্ট্রিমিং সেবা, আইপি টিভি ও ভিওডি সেবা দেওয়ার পথ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বিটিআরসি জানায়, এই সেবা দেওয়ার জন্য আইএসপিগুলোকে বাড়তি লাইসেন্স নিতে হবে না।

বাংলাদেশ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এ হাকিম জানান, নিয়ন্ত্রণ সংস্থার অনুমতি পাওয়া গেছে। ডিসেম্বরের শেষ দিকে সংস্থাটির সঙ্গে বৈঠকে এ সেবার বিভিন্ন নীতিগত ও পরিচালনাগত বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। শিগগিরই এ বিষয়ে একটি নীতিমালা আসবে। ফেব্রুয়ারির শুরুতে গ্রাহকরা সেবা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

দেশে এখন পাঁচটি আইপি টিভি সার্ভিস প্রভাইডার আসতে পারে। ৩০০ চ্যানেলের একটি আইটি টিভি সার্ভিস প্রভাইডারকে কমপক্ষে ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে হবে।

 

খরচ আর নীতিমালা কেমন হবে?

বিটিআরসির সঙ্গে বৈঠকে আইপি টিভির সেবার জন্য সর্বোচ্চ ৬০০ টাকা সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছে আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন। তবে এই সেবার বিভিন্ন ধরন অনুযায়ী ৩০০, ৪০০ ও ৫০০ টাকার বিভিন্ন ধাপে পাওয়া যাবে। কত টাকায় কতটি পে চ্যানেল থাকবে এসব ঠিক করে দেবে বিটিআরসি। স্মার্ট টিভি না হলে সেট-টপ বক্সের জন্য মানভেদে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা খরচ করতে হতে পারে গ্রাহককে।

এম এ হাকিম বলেন, প্রতিযোগিতায় হয়তো এখানে ভতুর্কিও দেওয়া হতে পারে। সে ক্ষেত্রে বক্সের দাম আরো কমবে। হয়তো একসময় ফ্রিও দেওয়া হতে পারে। একটি নেটওয়ার্কের আইপি টিভি যেন অন্য নেটওয়ার্কেও চলতে দেওয়া হয় বিটিআরসির কাছে এমন দাবি করেছে আইএসপি অ্যাসোসিয়েশন।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা