kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও এখন বাংলা লিখবেন

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ‘ব্রেইল টেক্সট থেকে বাংলা টেক্সট’-এ রূপান্তরের সফটওয়্যার তৈরি করা হয়েছে। এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের লিখিত ব্রেইল টেক্সটকে বাংলায় রূপান্তর করা যাবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথ্য-প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক এটি তৈরি করেছেন। অন্য ভাষায় ‘ব্রেইল থেকে টেক্সট’-এ রূপান্তরের সফটওয়্যার থাকলেও বাংলা টেক্সটে রূপান্তরের এটিই প্রথম সফটওয়্যার। জানাচ্ছেন মানজুরুল হোছাইন মাহির

২ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরাও এখন বাংলা লিখবেন

ব্রেইল পদ্ধতিতে লিখছেন একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী

তাফসিরুল্লাহ একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। পড়াশোনা করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ সেমিস্টারে। পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, টার্ম পেপার—সব কিছুই তাঁকে লিখতে হয় একজন শ্রুতি লেখকের সাহায্যে। এ জন্য বিভিন্ন সময় তাঁকে পড়তে হয় নানা সমস্যায়।

বিজ্ঞাপন

তাফসিরুল্লাহ মনে করেন, তিনি যদি ব্রেইল পদ্ধতিতে তাঁর একাডেমিক থেকে সব কিছু লিখতে পারতেন, তাহলে পড়াশোনাসহ সব জায়গায় আরো ভালো করতে পারতেন। শুধু তাফসিরুল্লাহই নন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ভাবনাও এমন। তাঁরা মনে করেন, পরীক্ষাসহ একাডেমিক কাজে যদি তাঁরা নিজেদের লিখন পদ্ধতি ব্রেইলে লিখতে পারতেন, তাহলে তাঁরা আরো ভালো করতে পারতেন। আর এই শিক্ষার্থীদের বিষয়টি মাথায় রেখেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের একদল গবেষক তৈরি করেছেন এমন একটি সফটওয়্যার, যা কিনা বাংলা ভাষায় প্রথম কোনো সফটওয়্যার, যা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের হাতে লেখা ব্রেইল লেখাকে বাংলায় রূপান্তর করতে পারে। এই গবেষকদলের মধ্যে রয়েছেন তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মুহাম্মদ শোয়াইব, সহকারী অধ্যাপক আহমেদুল কবির, শিক্ষার্থী মিনহাস কামাল, আতিক আহমেদ, মো. আরমান হোসেন ও সাদিকুল হক সাদি।

 

শুরুটা যেভাবে

তথ্য প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের প্রত্যেক শিক্ষার্থীকেই প্রতি শিক্ষাবর্ষে একটি করে প্রজেক্ট জমা দিতে হয়। ছয়-সাত বছর আগে অধ্যাপক মুহাম্মদ শোয়াইব দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের লিখন পদ্ধতির বিষয়টি মাথায় রেখে তাঁরই শিক্ষার্থী মিনহাস কামালকে এবিষয়ক একটি প্রজেক্ট তৈরি করার নির্দেশনা দেন। সেই থেকে শুরু হয় ব্রেইল থেকে বাংলা ভাষায় রূপান্তরের সফটওয়্যার তৈরির কাজ। এরপর এই প্রজেক্টে আরো যুক্ত হন গবেষকদলের অন্য সদস্যরা।

 

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ গবেষণা

মিনহাস কামাল সফটওয়্যারটি নিয়ে কাজ শুরু করার পর থেকে মোট চারজন শিক্ষার্থী অক্লান্ত পরিশ্রম করে বর্তমান অবস্থায় সফটওয়্যারটিকে নিয়ে এসেছেন। এই দীর্ঘ সময়ে অধ্যাপক মুহাম্মদ শোয়াইব ও সহকারী অধ্যাপক আহমেদুল কবিরের দিকনির্দেশনায় শিক্ষার্থীরা ক্রমান্বয়ে কাজ করেছেন সফটওয়্যার তৈরিতে। শিক্ষকদের নির্দেশনায় তাঁরা বিভিন্ন সময় তথ্য সংগ্রহ, কোডিং থেকে যাবতীয় কাজ করেছেন। এই গবেষণায় তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারের আইসিটি ডিভিশন থেকে অর্থ সহায়তাও পেয়েছেন।

 

পরীক্ষামূলকভাবে চালু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে সফটওয়্যারটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হবে। ওই ইনস্টিটিউটের চলমান শিক্ষাবর্ষে শুরু হতে যাওয়া নতুন সেমিস্টারে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাসহ একাডেমিক কাজে এই সফটওয়্যার ব্যবহার করা হবে। ব্যবহার করে সফটওয়্যারটি কত ভাগ সফলভাবে ব্রেইল লিপি থেকে বাংলায় রূপান্তর করতে পারবে, তা দেখা হবে। ফলাফল অনুসারে এরপর সফটওয়্যারটি প্রাথমিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর জন্য ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়া হবে।

দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের লেখা পড়তে পারবে সবাই

গবেষকরা আশা করছেন, সফটওয়্যারটি সম্পূর্ণভাবে চালু হলে এটি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের সঙ্গে স্বাভাবিক দৃষ্টির শিক্ষার্থীদের লিখিত যোগাযোগের দূরত্ব অনেকাংশে কমাতে সক্ষম হবে। এটি ব্যবহার করে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি তাঁর যেকোনো মনের ভাব লিখিতভাবে ব্রেইলে এবং বাংলা ভাষায় লিখিত আকারে প্রকাশ করতে পারবেন। বর্তমানে যাঁরা শুধু ব্রেইলে লেখেন, তাঁদের সেই লেখা যাঁরা ব্রেইলে পারদর্শী, তাঁরাই পাঠ করতে পারেন। কিন্তু এই সফটওয়্যারটির মাধ্যমে ব্রেইলে পারদর্শী না হয়েও ব্রেইল লেখাগুলো বাংলা ভাষায় রূপান্তর করার মাধ্যমে সবাই পাঠ করতে পারবেন। সে কারণে যদি কোনো দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তি চান তাঁর কোনো লেখা বই আকারে প্রকাশ করতে, তাহলে তিনি কোনো শ্রুতি লেখকের সাহায্য ছাড়া সেটি করতে পারবেন। নিজেই ব্রেইলে লিখে তা এই সফটওয়্যারটির মাধ্যমে বাংলায় রূপান্তর করে বই আকারে প্রকাশ করতে পারবেন।

 

যেভাবে সফটওয়্যারটি কাজ করে

প্রতিটি বর্ণ বা ক্যারেক্টার লেখার জন্য ছয়টি ডটের বিন্যাস করা হয় ব্রেইল পদ্ধতিতে। এভাবে ৬৪ ক্যারেক্টারের সমন্বয়ে বাংলা ভাষা, সংখ্যা, চিহ্ন, যুক্তাক্ষর প্রকাশ করা হয় বাংলা ব্রেইল লিখন পদ্ধতিতে। প্রাথমিকভাবে এ সফটওয়্যারে ৯৪.৮১ শতাংশ নির্ভুল ফলাফল পাওয়া যাচ্ছে বলে গবেষকদের দাবি। এটিতে কোনো ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা বাংলা ভাষায় রূপান্তর করতে হলে কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করতে হবে। প্রথমেই ব্রেইল লিপিতে লেখা কাগজটি স্ক্যান করে সফটওয়্যারটিতে নিতে হবে। পরে স্ক্যান করা পেপারটি কম্পিউটারে ওই সফটওয়্যারে কনভার্ট করতে হবে। কনভার্ট করলে সেই ব্রেইল লিপিতে লেখাগুলো বাংলায় চলে আসবে। সফটওয়্যারটি একসঙ্গে একাধিক স্ক্যান করা পাতা থেকে ব্রেইল ডকুমেন্ট একসঙ্গে রূপান্তর করতে পারবে বাংলায়। এরপর সেই বাংলা ডকুমেন্টগুলোকে বক্স ও পিডিএফ আকারে সংরক্ষণ করা যাবে এই সফটওয়্যারটি দিয়েই। এটি মূলত ডেস্কটপ সফটওয়্যার। পরবর্তী সময় মোবাইল সংস্করণ আনারও পরিকল্পনা রয়েছে গবেষকদলের। সফটওয়্যারটি ব্যবহার করতে হলে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে সাধারণ দক্ষতা থাকলেই এটি ব্যবহার করা যাবে বলে গবেষকরা দাবি করেন।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

প্রাতিষ্ঠানিক এবং ব্যক্তি পর্যায়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সবার দোরগোড়ায় এই সেবা পৌঁছে দিতে চান গবেষকদল। আর সে জন্য সফটওয়্যারটির পেটেন্ট, বাজারজাতকরণসহ যাবতীয় বিষয় দেখবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান।



সাতদিনের সেরা