kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

ভিডিও সম্পাদনায় যা চাই

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হোক কিংবা ইউটিউব চ্যানেলের জন্যই হোক অনেকেই এখন ঝুঁকছে ভিডিও সম্পাদনার দিকে। উচ্চমানের ভিডিও সম্পাদনার জন্য দরকার ভালো মানের সফটওয়্যার। এসব সফটওয়্যার চালানোর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী কম্পিউটার। কিন্তু সেই শক্তিশালী কম্পিউটার কেমন হতে পারে? কী কী যন্ত্রাংশ থাকা উচিত এতে? উত্তর খুঁজেছেন এস এম তাহমিদ

১৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ভিডিও সম্পাদনায় যা চাই

ইউটিউব, ফেসবুক বা টিকটকের জন্য কনটেন্ট তৈরির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, নানা ফুটেজ একত্র করে ভিডিও তৈরি করা। মানসম্মত ভিডিও তৈরিতে প্রয়োজন অন্তত ফুল এইচডি রেজল্যুশনের ফুটেজ, সঙ্গে পরিষ্কার অডিও এবং বেশ কিছু ইফেক্টের মিশ্রণ। ফুটেজে প্রয়োজন কালার গ্রেডিং, সঠিক কাট ও জয়েনিং, ট্রানজিশন। আর পুরো কাজ করার জন্য অবশ্যই এডিটিং ডিভাইস হতে হবে যথেষ্ট শক্তিশালী।

বিজ্ঞাপন

 

এডিটিং পিসিতে যা চাই

অনেকের ধারণা, কয়েক লাখ টাকা খরচ না করে এডিটিং পিসি তৈরি সম্ভব নয়। বিষয়টি সঠিক নয়। যাদের প্রতিনিয়ত ভিডিও নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে তাদের ক্ষেত্রে সেটা সত্যি হলেও শখের বশে চালানো ভ্লগ চ্যানেলের জন্য সেটা প্রয়োজন নেই।

ভিডিও এডিট করার জন্য তিনটি জিনিস থাকতেই হবে। বড়সড় ধারণক্ষমতার এসএসডি, কেননা হার্ডডিস্কের গতি ফুল এইচডি বা ততোধিক মানের ভিডিওর জন্য জুতসই নয়। এসএসডি যদি এনভিএমই প্রযুক্তির কেনা সম্ভব হয়, তাহলে ভালো। তা না হলে সাটা এসএসডিও কেনা যেতে পারে, কিন্তু সে ক্ষেত্রে ফোর-কে রেজল্যুশনের ফুটেজ নিয়ে কাজ করা হবে কঠিন। এরপর প্রয়োজন অন্তত ১৬ গিগাবাইট র‌্যাম। কেননা সম্পাদনা করার সময় প্রচুর তথ্য র‌্যামেই জমা থাকবে। কাজের আর প্রয়োজন অন্তত চারটি কোরসমৃদ্ধ মাঝারি মানের সিপিইউ। প্রচলিত ধারণা রয়েছে, শক্তিশালী জিপিইউ না থাকলে ভিডিও নিয়ে কাজ করা যায় না। সেটা অবশ্য সত্যি নয়, বর্তমানে বাজারে থাকা ষষ্ঠ প্রজন্ম পর্যন্ত যেসব সিপিইউ রয়েছে সেসবের মধ্যকার বিল্টইন জিপিইউ দিয়েই কাজ করা যায় যথেষ্ট। অতএব, অন্তত ইন্টেল কোর আই৫ অষ্টম প্রজন্মের সিপিইউ বা এএমডি রাইজেন ৫ ১৬০০, ১৬ গিগাবাইট র‌্যাম এবং ৫১২ গিগাবাইট এসএসডির পিসি হওয়া উচিত সর্বনিম্ন এডিটিং পিসি। বাজেট হতে হবে অন্তত ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা। তবে অনায়াসে ব্যবহৃত পিসি কিনে এর অর্ধেক দামেও পিসি তৈরি সম্ভব।

তবে যারা ভিডিও সম্পাদনাকে পেশা হিসেবে নিতে চাইছেন তাঁদের জন্য পিসি হতে হবে অন্তত ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস, লাইভ ক্যাপচার এবং দ্রুত রেন্ডার করার মতো শক্তিশালী। সে জন্য সিপিইউ হওয়া উচিত অন্তত ইন্টেল নবম প্রজন্মের কোর আই৭ বা এএমডি রাইজেন ৭ ৩৭০০এক্স, র‌্যাম ৩২ বা ৬৪ গিগাবাইট, এসএসডি হতে হবে অবশ্যই এনভিএমই প্রযুক্তির, ১ বা ২ টেরাবাইট। একাধিক এসএসডি থাকা উচিত, যাতে মূল ফুটেজ, চলমান সম্পাদনার ফাইল এবং সম্পাদনা শেষে এক্সপোর্ট করা ফাইল আলাদা ড্রাইভে রেখে কাজ করা যায়। দ্রুত রেন্ডারিং এবং ভিজ্যুয়াল ইফেক্টসের পাশাপাশি লাইভ ভিডিও ক্যাপচারের জন্য চাই বেশ শক্তিশালী জিপিইউ। এএমডির চেয়ে এনভিডিওর জিপিইউগুলো ভিডিও এনকোডিংয়ের দিক থেকে এগিয়ে, তবে সেই পার্থক্য খুব বেশি নয়। অন্তত মাঝারি মূল্যের মডেলগুলো, যেমন লেখার সময় এনভিডিয়ার আরটিএক্স ৩০৬০ বা এএমডির ৬৭৫০ এক্স সিরিজের জিপিইউ সিস্টেমে থাকা শ্রেয়। সে ক্ষেত্রে বাজেট দেড় থেকে দুই লাখ টাকা হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

প্রফেশনাল মনিটর কিনলেও উন্নতমানের নির্ভুল কালারের মনিটরই কিনতে হবে। বাজারে ফিলিপস, আসুস, ডেল ও বেনকিউয়ের বেশ কিছু মনিটর রয়েছে, যা বিশেষত কালার অ্যাকুরেসি মাথায় রেখেই তৈরি। গেমিং মনিটর কেনা একেবারেই এ ক্ষেত্রে অনুচিত। বাজেট অন্তত ২৭ হাজার টাকা রাখতে হবে, তবে খরচ বাঁচাতে অফিসের জন্য তৈরি প্রায় অ্যাকুরেট মনিটরও কেনা যেতে পারে, বিশেষ করে প্রফেশনাল কাজ না করলে। পেশাগতভাবে কাজ করতে চাইলে মনিটরের পেছনেই আরো এক লাখ টাকা বা ততোধিক খরচ হবে।

 

চলার পথে সম্পাদনা করতে চাইলে

মূলত ভ্লগারদেরই চাহিদা, চলার পথেই ফুটেজ সম্পাদনা করে আপলোড করার সুবিধা। বর্তমানে এ কাজের জন্য অ্যাপলের ম্যাকবুক ও আইপ্যাডকে হারানো অত্যন্ত কঠিন। তাদের এম১ বা এম১ প্রো সিপিইউসমৃদ্ধ ডিভাইসগুলোতে ঝামেলাহীনভাবে দ্রুত ভিডিও সম্পাদনা করা যাচ্ছে। তবে যারা উইন্ডোজ ও অ্যাডোবি সফটওয়্যার চাচ্ছেন তাঁদের জন্য শক্তিশালী কিন্তু গেমিং নয় এমন ল্যাপটপ হতে পারে কাজের। যেমন—ডেলের প্রিসিশন বা ল্যাটিচিউড সিরিজ, এইচপির এলিটবুক বা লেনোভোর থিংকপ্যাড। হার্ডওয়্যার অন্তত চার বা ছয়টি কোরের ইন্টেল কোর আই ৭ বা এএমডি রাইজেন সিপিইউ, ১৬ গিগাবাইট ডুয়াল চ্যানেল র‌্যাম এবং বড়সড় এসএসডি থাকতে হবে। গেমিং সিরিজের ল্যাপটপে এ হার্ডওয়্যার পাওয়া গেলেও সেগুলোর ডিসপ্লের কালার ব্যালান্স ঠিক থাকে না, তাই ভিডিও নিয়ে কাজ করার জন্য কাজের নয়।

আইপ্যাড বা অ্যানড্রয়েড ফোনে ভিডিও এডিট করা পিসি বা ল্যাপটপের মতো ফিচারসমৃদ্ধ নয়, কিন্তু যারা অ্যাকশন ক্যামের মাধ্যমে ভিডিও তৈরি করে তারা দ্রুত কাজ সেরে ফেলার জন্য এ ডিভাইসগুলো বেছে নেয়। আইপ্যাড বা আইফোনের ক্ষেত্রে অন্তত গত চার বছরের মধ্যে বাজারে আসা মডেলগুলোই ভিডিও নিয়ে কাজ করার জন্য কার্যকর। আর অ্যানড্রয়েডের ক্ষেত্রে অন্তত কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন ৮৪৫ বা ততোধিক মডেলের সিপিইউ, ৬ থেকে ৮ গিগাবাইট র‌্যাম এবং বড়সড় ব্যাটারি থাকা চাই।

 

এডিটিং সফটওয়্যার

ভিডিও তৈরিতে সবচেয়ে প্রচলিত সফটওয়্যার অ্যাডোবি প্রিমিয়ার প্রো ও অ্যাডোবি আফটার ইফেক্টস। সফটওয়্যার দুটির অনেক সমস্যা থাকলেও পেশাদার কাজের জন্য এর চেয়ে বেশি কাজের সফটওয়্যার আর নেই। প্রিমিয়ার প্রোর মাধ্যমে সব ধরনের ভিডিও এডিট এবং আফটার ইফেক্টসের মাধ্যমে করা যায় ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস বা ভিএফএক্সের কাজ। তবে এগুলো চালাতে প্রয়োজন শক্তিশালী উইন্ডোজ ল্যাপটপ বা পিসি। যারা অ্যাপল ডিভাইস নিয়ে কাজ করে তাদের জন্য আদর্শ ফাইনাল কাট প্রো এবং অ্যাপল মোশন। অ্যাপলের নিজস্ব এ সফটওয়্যার দুটি তাদের ডিভাইসের জন্যই বিশেষায়িত করে তৈরি করায় পারফরম্যান্সে অনেক ক্ষেত্রে প্রিমিয়ার প্রোকে হারিয়ে দিতে পারে। তবে ফিচারের দিক থেকে কিছুটা পিছিয়ে অ্যাডোবির সফটওয়্যারের তুলনায়।

ফ্রি কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার হচ্ছে দ্য ভিঞ্চি রিসলভ। অপেশাদার কাজের জন্য বৈধভাবেই সফটওয়্যারটি ব্যবহার করা যাবে। ফলে যারা শৌখিন কাজ করে তাদের জন্য আদর্শ। বিশেষ করে এইচডিআর ভিডিও নিয়ে যারা কাজ করে তাদের জন্য রিসলভের কালার গ্রেডিং সিস্টেম আদর্শ।

 

বাদ যাবে না স্মার্টফোনও

স্মার্টফোনে ব্যবহারের জন্য কিনেমাস্টার ও ইনশট সবচেয়ে জনপ্রিয়। এর সঙ্গে আছে সাইবারলিংক পাওয়ার ডিরেক্টরও। এ ছাড়া অ্যাকশন ক্যামেরাগুলোরও আছে নিজস্ব সফটওয়্যার। তবে টিকটকের জাম্পকাট ফরম্যাটের জনপ্রিয়তা ইনশটকে কিনেমাস্টারের থেকে এগিয়ে রেখেছে। আর এগুলো চালানোর জন্য স্মার্টফোনগুলোতে থাকতে হবে অ্যানড্রয়েড ৬-উর্ধ্ব অপারেটিং সিস্টেম।

 

অন্যান্য হার্ডওয়্যার

ভিডিও তৈরিতে অবশ্যই ধারা বর্ণনা যুক্ত করার প্রয়োজন আছে। সে জন্য ক্যামেরা বা হেডফোনের মাইক্রোফোনের ওপর নির্ভর না করে মানসম্মত ইউএসবি বা এক্সএলআর মাইক্রোফোন কেনা উচিত। অন্তত চার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত সেটাতে খরচ হতে পারে। এ ছাড়া রেকর্ড করার স্থানটি হতে হবে যতটা সম্ভব বাইরের আওয়াজমুক্ত। ডিএসএলআর ক্যামেরাকে পিসির সঙ্গে যুক্ত করে ভ্লগ করার জন্য পিসিতে ক্যাপচার কার্ড লাগানো যেতে পারে, যেগুলোর মূল্য পাঁচ-ছয় হাজার থেকে হতে পারে ৩০ হাজার টাকারও বেশি। এ ছাড়া ভিডিও নিয়ে কাজ করলে ফুটেজের ব্যাকআপ রাখা অত্যন্ত জরুরি। তার জন্য বড়সড় হার্ডডিস্কই ভরসা আর সেগুলো মূল পিসির সঙ্গে রাখা উচিত নয়। একাধিক মনিটর ভিডিও তৈরির কাজকে করবে সহজ, সঙ্গে মানসম্মত হেডসেট থাকলে অডিও মিক্সিং বুঝতে সহজ হবে। এ ছাড়া যারা ভিডিও স্ট্রিম করে তাদের জন্য বিশেষায়িত প্রগ্রাম করা যায় এমন বাটনসমৃদ্ধ স্ট্রিমিং ডেক কার্যকর।



সাতদিনের সেরা