kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জুন ২০২২ । ১৪ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৭ জিলকদ ১৪৪৩

আইপড যুগের অবসান

অবশেষে থেমে গেছে আইপডের যাত্রা। নতুন আইপড তৈরি বন্ধের ঘোষণার মাধ্যমে আইপড যুগের অবসান টানল অ্যাপল। খুবই সাধারণ একটি গান শোনার যন্ত্র যেভাবে বদলে দিয়েছিল টেক দুনিয়া, সেটি সত্যি বিস্ময়কর। বলা যেতে পারে, আজকের স্মার্টফোনের পেছনে সরাসরি আইপডেরই অবদান। জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

২২ মে, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আইপড যুগের অবসান

স্টিভ জবস আর আইপড—উভয়ই আজ অতীত

সূচনা জবসের হাত ধরে

সময়টা ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর। অ্যাপল কম্পিউারের অবস্থা করুণ, স্টিভ জবস ফিরেছেন মাত্রই। এর আগে ১৯৯৯ সালের শেষে নতুন ডিজাইনের আইম্যাক ও আইবুক বাজারে এনে ধীরে ধীরে অ্যাপল চেষ্টা করছে নিজের হারানো সাম্রাজ্য ফিরে পাওয়ার। ইন্টারনেট, বিশেষ করে ব্রডব্যান্ড মাত্রই ব্যক্তি পর্যায়ে জনপ্রিয় হচ্ছে, গানকে সিডি বা ক্যাসেটের বদলে ডিজিটাল ফাইল হিসেবে সংগ্রহ করা এবং বাজানোর দিকে ঝুঁকছেন ক্রেতারা।

বিজ্ঞাপন

বাজারে কিছু ডিজিটাল অডিও প্লেয়ার বা এমপিথ্রি প্লেয়ার এরই মধ্যে হাজিরও হয়েছে, কিন্তু সেগুলোর ধারণক্ষমতা মাত্র ১৬ থেকে ৩২ মেগাবাইট অথবা সর্বোচ্চ ১০টি গান। একই সময় তোশিবা অত্যন্ত ক্ষুদ্র হার্ডডিস্ক নিয়ে কাজ করছে, সেগুলো ব্যবহার করে কিছু কম্পানি প্লেয়ার তৈরিও করেছে। কিন্তু সেগুলোর ছিল চড়া মূল্য, ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তি পর্যায়ের গান শোনা নয়, বরং ডিজেদের প্লেলিস্ট তৈরি।

এমন সময় স্টিভ জবস যেন বোমা ফাটালেন। তাসের কার্ডের সমান একটি ডিভাইস, যার ধারণক্ষমতা ৫ গিগাবাইট। সিডি আর ক্যাসেটের যুগে জিবির হিসাব বলা অর্থহীন, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। সবাইকে বললেন, এতে রাখা যাবে এক হাজার গান। ইন্টারফেসও অত্যন্ত সহজ, একটি ডায়াল আর চারটি বাটনেই সব কাজ করা যাবে। গান কেনা এবং লোড করার জন্য থাকছে আইটিউনস মার্কেট এবং সিংক সফটওয়্যার, প্রতিটি গান কেনা যাবে মাত্র ৯৯ সেন্ট দামে। দাম মাত্র ৩৯৯ ডলার—যে দামে বাকি সব নির্মাতা ৩২ মেগাবাইটের প্লেয়ার বিক্রি করছেন। এই কাজটির জন্য অ্যাপল ব্যবহার করে তোশিবার সেই ক্ষুদ্র হার্ডডিস্ক। বাজারে সবই ছিল হাজির, শুধু অন্য নির্মাতারা সেটি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারেননি।

 

শুরু হলো জয়যাত্রা

বাজারে আসার পর আর অ্যাপলকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। আইপড শুরুতেই অডিও প্লেয়ার বাজারের একেবারে ওপরে তার স্থান দখল করে নেয়। এরপর ধীরে ধীরে যুক্ত হয় উইন্ডোজ পিসিতেও ব্যবহারের সুবিধা। মাঝখানের মেকানিক্যাল ডায়ালের বদলে আসে টাচ ডায়াল। ডিসপ্লের আকৃতি হয়ে ওঠে বড়, সাদাকালোর বদলে কালার। এরপর হাজির হয় হার্ডডিস্কের বদলে ফ্ল্যাশ মেমোরিসমৃদ্ধ অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকৃতির আইপড ন্যানো।   একসময় একেবারে হালকা এবং সবচেয়ে কম দামের মডেল হিসেবে বাজারে হাজির হয় আইপড শাফল। আইপডে যুক্ত হয় ভিডিও দেখার সুবিধা। ন্যানো মডেলে দেওয়া হয় ক্যামেরা।

আইপডের সফলতার সুযোগে অন্য নির্মাতারাও প্রচুর এমপিথ্রি প্লেয়ার বিক্রি করা শুরু করেন, যার প্রভাব আমাদের দেশেও দেখা গেছে। এ দেশের বাজারে আইপডের জনপ্রিয়তা কম হলেও স্বল্পমূল্যের এমপিথ্রি ও এমপি৪ প্লেয়ারের অভাব ছিল না।

 

স্মার্টফোনের পূর্বসূরি

আইপডের বিক্রি থেকে বিপুল পরিমাণ আয়ের ফলেই অ্যাপল একসময় স্মার্টফোন তৈরিতে হাত দেয়। আইপডের সাফল্যের পেছনে ছিল অত্যন্ত সহজ ইন্টারফেস, সেটি অ্যাপলের ডিজাইনাররা বুঝতে পেরেছিলেন। সে কারণেই আইফোনে ছিল মাত্র একটি বাটন, পুরো সিস্টেমই টাচের জন্য ডিজাইন করা। অ্যানড্রয়েডের নির্মাতারা শুরুতে বাটন ফোনের দিকেই আগাচ্ছিলেন, আইফোনের কারণেই আজকের অ্যানড্রয়েড টাচভিত্তিক। তা বলাই যায়, আইপডই আজকের স্মার্টফোনের পূর্বসূরি। আইফোন, আইপ্যাড নামগুলোর পেছনেও আছে আইপডের ব্র্যান্ড ভ্যালু।

 

শিষ্যের কাছে গুরুর পরাজয়

স্মার্টফোনই ধীরে ধীরে আইপডকে করে অপ্রয়োজনীয়। সিম ব্যবহার ছাড়া আইফোনের সব ফিচার দিয়ে অ্যাপল বাজারে আনে আইপড টাচ, তারই আদলে টাচস্ক্রিনসংবলিত আইপড ন্যানোও হাজির হয়। গানের বাজার ডাউনলোড থেকে সরে যায় স্ট্রিমিংয়ের দিকে, সবাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তারহীন হেডফোনে। এর পরও অ্যাপল বহুদিন ঐতিহ্য হিসেবেই ধরে রেখেছিল আইপড। অবশেষে তারা ২১ বছরের আইপড সিরিজের ইতি টানল।  



সাতদিনের সেরা