kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

ইউআরসিতে সেরা মঙ্গল বারতা

বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন রোবটিকস চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জে প্রথম হয়েছে বাংলাদেশের মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী দল ‘মঙ্গল বারতা’। দলটির সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানাচ্ছেন জুবায়ের আহম্মেদ

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ইউআরসিতে সেরা মঙ্গল বারতা

নিজেদের বানানো রোভার ‘ফিনিক্স’ নিয়ে মঙ্গল বারতা

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন রোবোটিকস প্রতিযোগিতা ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জ (ইউআরসি)। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার অঙ্গসংগঠন মার্স রোভার সোসাইটি প্রতিবছরই যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের মরুভূমির বিশেষ পরিমণ্ডলে এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। কিন্তু করোনার এই মহামারির কারণে এবারের প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয় অনলাইনে। এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮৮টি দল আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত এসএআর বা প্রাথমিক পর্বে নির্বাচিত হয় ৩৬টি দল। শেষ পর্যন্ত ফাইনালে অংশ নেয় ১৫টি দল। আর বাংলাদেশের হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দুটি দল। একটি মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ‘মঙ্গল বারতা’, অন্যটি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ব্র্যাকইউ মঙ্গলতরী’। প্রতিযোগিতাটিতে সবচেয়ে বেশি পয়েন্ট পেয়ে প্রথম হয় এমআইএসটির মঙ্গল বারতা এবং চতুর্থ হয় ‘ব্র্যাকইউ মঙ্গলতরী’।

শুরুটা যেমন ছিল

গত বছরের সেপ্টেম্বরে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের প্রজেক্টে নিয়োগ করার মধ্য দিয়ে পুরোদমে কাজ শুরু হয় টিম মঙ্গল বারতার। ইউআরসিকে সামনে রেখেই ‘ফিনিক্স’ নামে রোভার বানানোর কাজ শুরু করেন তাঁরা। যেহেতু তাঁদের জন্য এটি একটি বড় মাপের প্রজেক্ট, তাই বাড়ানো হয় সদস্যসংখ্যাও। এরপর শুরু হয় পরিকল্পনা এবং খোঁজখবর নেওয়া- কোথায় কোন যন্ত্রপাতি পাওয়া যাবে, ফ্যাব্রিকেশনের (যন্ত্রাংশের সংযোজন, একত্রীকরণ প্রভৃতি) কাজ কোথায় ভালো হবে? আর এসব কিছুর জন্য সুপরিকল্পিত বাজেটও পরিকল্পনা করা হয়। তাঁদের রোভারটি তৈরিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও বেশ সাহায্য করেছে। এ ছাড়া কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই স্পন্সরশিপও পেয়েছেন তাঁরা। তাঁদের এই জয়যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল করোনা মহামারির মধ্যে কাজ চালিয়ে যাওয়া। ইউআরসির ইতিহাসে এ বছর প্রথম ভার্চুয়াল প্রতিযোগিতা হওয়ার কারণে স্বল্প সময়ে বিশেষ কিছু প্রস্তুতি নিতে হয়েছে টিম মঙ্গল বারতাকে।

লকডাউনে প্রতিকূল পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং ইউআরসি কর্তৃপক্ষ থেকে প্রদত্ত নিয়মাবলির সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য নানা রকম কর্মকৌশল অবলম্বন করতে হয়েছে।

বাংলাদেশে রোবোটিকসের জিনিসপত্র তেমন সুলভ নয়। ফলে এ ধরনের বড় মাপের রোবোটিকস চ্যালেঞ্জের জন্য যেসব যন্ত্র প্রয়োজন, সেগুলো বাইরের দেশ থেকে আনা এবং দেশে ফ্যাব্রিকেশন থেকে শুরু করে অন্য সব কাজ করা একটা বড়সড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তাঁদের রোভারকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করা যায়। একটি বডি এবং অন্যটি আর্ম বা বাহু। ফিনিক্স রোভারে বডির চলাচলের জন্য ডিফারেনশিয়াল মুভমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে। মূলত মঙ্গল গ্রহের উঁচু-নিচু আঁঁকাবাঁকা পথে ভারসাম্য রক্ষা করে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এই কৌশল ব্যবহার করা হয়েছে। ৬ ডিগ্রি অব ফ্রিডম আর্ম বা বাহু ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে কোনো একটি বস্তুকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিতে পারবে। এ ছাড়া অটোনোমাস নেভিগেশন বা জেড ও লাইটার নামে দুটি সেন্সর ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বাংলাদেশে বসে যদি মঙ্গল গ্রহের জিপিএস লোকেশনে কোনো স্থান নির্দেশ করে দেওয়া হয়, তবে রোভারটি ওইটুকু পথ নিজে থেকেই পাড়ি দেবে। মঙ্গল বারতার সদস্যরা হলেন যন্ত্রকৌশল বিভাগের শাহ মো. আহসান সিদ্দিক, শাদমান তাজওয়ার, ওহিউল্লাহ সামির, মুশফিকুল ইসলাম, আসিফ মাহমুদ রায়হান, সাফওয়ান ও মারুফ মোরশেদ এবং কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আকিব জামান, শাফায়েতুল ইসলাম, ইশরাক হাসান, শোয়েব আহমেদ তানজিম, ফারদিন আশরাফ রত্ন ও নাঈম ইবনে খাদেম।

 

রোভারের নাম ফিনিক্স

মঙ্গল গ্রহে জীবিত কোনো প্রাণী আছে কি না বা সেখানে কোনো গাছপালা আছে কি না সেটা শনাক্ত করতে পারবে মঙ্গল বারতার রোভার ‘ফিনিক্স’। এ ছাড়া সেখানকার মাটির ধরনও শনাক্ত করতে সক্ষম রোভারটি। মঙ্গলের মাটির উঁচু-নিচু জায়গায়ও ঘুরতে পারবে এটি। এ ছাড়া আগে পাঠানো নাসার দুটি রোবটের কোনো সমস্যা হলে সেটির সংকেত পাঠানোর পাশাপাশি সমস্যা সমাধানে কাজও করতে পারবে ফিনিক্স। ফিনিক্স রোভারটি বানাতে তাঁদের মোট সময় লেগেছে ছয় মাস। ল্যাব সুবিধা কেমন পেয়েছেন জানতে চাইলে টিম মঙ্গল বারতার দলনেতা আকিব জামান বলেন, ‘রোভারটি বানানোর জন্য ল্যাব সম্পর্কিত যত রকম সুবিধা আশা করেছিলাম, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় তার থেকেও আরো বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে। এ ছাড়া পরবর্তী সময়ে প্রতিযোগিতার জন্য আরো উন্নতমানের যন্ত্রপাতি দেওয়ার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেছে আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।’

 

ইউআরসির ফাইনালে ফিনিক্সের জয়

ইউআরসিতে মোট তিনটি পর্ব। পিডিআর, এসএআর ও ফাইনাল। প্রথম দুই পর্ব শেষে ১-৫ জুন অনলাইনে অনুষ্ঠিত হয় ইউনিভার্সিটি রোভার চ্যালেঞ্জের (ইউআরসি) ফাইনাল। চ্যালেঞ্জে অংশ নেওয়া দলগুলোকে তিনটি মিশন দেওয়া হয়। প্রথমে ইকুইপমেন্ট সার্ভিসিং মিশন। এতে রোভার দিয়ে মানুষের জন্য নির্মিত যন্ত্রপাতি নিয়ন্ত্রণ করানো হয়। এই মিশনে একটি ড্রয়ার খোলা, একটি টুলবক্স নিয়ে সেই ড্রয়ারে রাখা, কি-বোর্ডে নির্দিষ্ট কমান্ড চাপা এবং একটি স্ক্রু টাইট করার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়। অটোনোমাস নেভিগেশন মিশনে রোভারকে মানুষের নিয়ন্ত্রণ বা সাহায্য ছাড়াই নির্দিষ্ট একটি পথ পাড়ি দিতে হয়। এ ছাড়া ছিল এক্সট্রিম রিট্রিভাল অ্যান্ড ডেলিভারি মিশন। এই মিশনে রোভারকে মঙ্গলের মতো রুক্ষ ও চ্যালেঞ্জিং ভূপৃষ্ঠে ছেড়ে দেওয়া হয়। ভার্চুয়াল পরিসরে মিশনটি পুরোপুরিভাবে পরীক্ষার সুযোগ না থাকায় ছোট ছোট বিকল্প কিছু মিশনের মাধ্যমে রোবোটের সক্ষমতা যাচাই করা হয়। সব কয়টি মিশন শেষে ফাইনালে ১৮০ পয়েন্ট নিয়ে প্রথম হয় মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির দল ‘মঙ্গল বারতা’। দলটির সহদলনেতা শাহ মো. আহসান সিদ্দিক বলেন, ‘গত বছরের সেপ্টেম্বরে যখন কাজ শুরু করেছিলাম তখনো আমরা ভাবতে পারিনি আমাদের স্বপ্নের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে পারব। সবার কঠোর পরিশ্রমে সেটা সম্ভব হয়েছে। নিজের দেশকে পরিচিত করাতে পেরেছি বিশ্ব দরবারে।’

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

টিম মঙ্গল বারতা তাদের রোভারকে আরো উন্নত করতে চায়। আরো বেশি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে দেশের নাম উজ্জ্বল করতে চায়। সেই সঙ্গে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য রোবোটিকসের ওপর বিভিন্ন কর্মশালা করার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। ইন্সপায়ারিং দ্য মার্স জেনারেশন অব বাংলাদেশ—এই ট্যাগলাইনে কাজ করে বাংলাদেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য রোবট বিষয়ে অত্যাধুনিক ও যুগোপযোগী একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে চান তাঁরা।



সাতদিনের সেরা