kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

দুই বাংলাদেশির গেজ

সম্প্রতি ‘প্রডাক্ট অব দ্য উইক’ হিসেবে গেজকে স্বীকৃতি দেয় বিশ্বের নামকরা পণ্য রিভিউ প্রতিষ্ঠান ‘প্রডাক্ট হান্ট’। গেজ স্টার্টআপের মূলে রয়েছেন দুই বাংলাদেশি তাউস নূর ও মোতাসিম রহমান। এ বছর ফোর্বস ম্যাগাজিনের ‘৩০ আন্ডার ৩০’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন তাঁরা। গেজ এবং এটির প্রতিষ্ঠাতাদের গল্প বলেছেন, নাদিম মজিদ

৯ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দুই বাংলাদেশির গেজ

বাঁ থেকে মোতাসিম রহমান ও তাউস নূর

২০০৯ সাল। সবেমাত্র কৈশোরে পা দিয়েছেন তাউস নূর। পড়ছেন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল ঢাকায় সপ্তম শ্রেণিতে। নেটওয়ার্কিং করতে পছন্দ করেন। ভালো লাগে প্রগ্রামিং। একদিন ইয়াহু মেসেঞ্জারে পরিচয় হয় মোতাসিম রহমানের সঙ্গে। ঢাকার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মোতাসিম রহমানের ধ্যান-জ্ঞানও প্রগ্রামিং। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তিনি তৈরি করেছিলেন বাংলাদেশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাইট ‘নগরবালক’। ট্রাফিকও ছিল বেশ।

মোতাসিম রহমান বয়সে তাউসের দুই বছর বড় হলেও তাঁদের বন্ধুত্বটা কিন্তু জমে যায়। কৈশোরেই তাঁরা হাতে নেন কয়েকটি উদ্যোগ। তথ্য-প্রযুক্তি ভিত্তিক বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের হ্যাকাথনে তাঁরা যোগও দিতেন। পরিচয় লুকিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার জন্য ‘ইনকগনিটো’ নামের একটি উদ্যোগেও কাজ করেছিলেন। ২০১৪ সালের নভেম্বরে আয়োজন করেছিলেন ন্যাশনাল অলিম্পিয়াড অব সফটওয়্যার ইনোভেশনের।

এরই মধ্যে মালয়েশিয়ার মাল্টিমিডিয়া ইউনিভার্সিটিতে আন্ডারগ্রেডে ভর্তি হন মোতাসিম রহমান। অন্যদিকে কানাডার বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলম্বিয়া (ইউবিসি) তাউস নূরকে আন্ডারগ্রেডে ভর্তির জন্য নির্বাচন করে এবং প্রদান করে আইলট অ্যাওয়ার্ড।

দুই বন্ধু বিশ্বের দুই প্রান্তে বাস করলেও যোগাযোগ থাকে অব্যাহত। পাশাপাশি তাঁরা নিজেদের দক্ষতাও বাড়াতে থাকেন। তাউস নূর নিজের দক্ষতাকে সমৃদ্ধ করতে একেক বছর একেক প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করতে থাকেন। ২০১৬ সালে ইন্টার্নশিপ করেন অনলাইন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ‘সাইট পিরাটি’কে। প্রতিষ্ঠানটি পরে আরেক নামকরা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সাইট ‘ইভেন্টবাইট’ কিনে নেয়।

২০১৭ সালে আইবিএমের গবেষণা শাখার সেলফ ড্রাইভিং কার প্রজেক্টে ইন্টার্নশিপ করেন। ২০১৮ সালে ইন্টার্নশিপ করেন নামকরা গ্রাফিকস চিপ কম্পানি এনভিডিয়ায়।

মোতাসিম রহমানও ২০১৭ সালে ইন্টার্নশিপ করার জন্য বেছে নেন কানাডার ফায়ারআউট নামের প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আগুন নেভানোর যন্ত্র নিয়ে কাজ করছিল। ফলে মালয়েশিয়া ছেড়ে কানাডায় পাড়ি জমান মোতাসিম। এখানে কাজ করার সময় তাউস নূরের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হতে থাকে।

কিছুদিন পর তাঁদের মাথায় আসে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক স্টার্টআপ করার। বিভিন্ন বিষয়ে প্রটোটাইপ তৈরির কাজও চলতে থাকে।

২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠান ‘গেজ’ শুরু করেন। শুরুতে গেজ কাজ করত ফেস রিকগনিশন নিয়ে। পরে নিজেদের এ কাজকে আরো সমৃদ্ধ করতে তারা উদ্যোগ নেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর। সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজ মনিটর করে তাদের সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বলে দিতে পারত, কোন কোন গাড়ি, কোথায় কোথায় ট্রাফিক সিগন্যাল ভেঙেছে। গুলশানের ল অ্যান্ড অর্ডার কো-অর্ডিনেশন কমিটির (এলওসি) সঙ্গে গুলশান এলাকায় এ প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করা হয়েছিল।

কানাডার কেভিন পিএরসের সঙ্গে তাউসের পরিচয় হয়েছিল ২০১৬ সালে পিরাটিকে ইন্টার্নশিপ করার সময়। সে প্রতিষ্ঠানে সিটিও (চিফ টেকনোলজি অফিসার)  হিসেবে কাজ করতেন কেভিন। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি চাকরি করে আসছেন।

বাংলাদেশে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি চালু করার সময় তাউস ও মোতাসিম ভাবতে থাকেন, তাঁদের একজন অভিজ্ঞ সিটিও দরকার, যিনি কোনো প্রডাক্ট নিয়ে আরো গভীর পর্যন্ত কাজ করতে পারবেন। তাঁরা অবশেষে কেভিনকে গেজের সহপ্রতিষ্ঠাতা করার প্রস্তাব দেন। তিনি রাজি হয়ে যান। কেভিনের ২১ বছরের পেশাগত অভিজ্ঞতা তাঁদের প্রতিষ্ঠানের জন্য খুবই কাজে লাগে।

 

ইনস্ট্যান্ট চেকআউটের ধারণা

এক গবেষণায় তাঁরা দেখতে পান, চেকআউট পদ্ধতি কয়েক ধাপের হওয়ার কারণে

ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ৭০ শতাংশ অর্ডার হারায়। এ সমস্যার সমাধান  নিয়ে কাজ শুরু করে গেজ। তারা নিয়ে আসে এক ক্লিকেই চেকআউটের ধারণা। গ্রাহক তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য আগেই দিয়ে রাখবেন। শুধু

ই-কমার্স সাইটে ঢুকে চেকআউট বাটনে চাপ দিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চেকআউট হয়ে যাবে। কোনো পিসিতে একবার তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে রাখলে পরে আর নতুন করে দেওয়া লাগবে না।

প্রডাক্টটি নিয়ে তাঁরা ২০২০ সালের ডিসেম্বর মাসে কাজ শুরু করেন। আন্তর্জাতিক পেমেন্ট সিস্টেম ‘স্ট্রাইপ’কে নিজেদের সিস্টেমে অন্তর্ভুক্ত করেছেন ইতিমধ্যে। পেপালকেও ইন্টিগ্রেটেড করার কাজ করছেন। এরই মধ্যে ২০টি প্রতিষ্ঠান তাঁদের এ পণ্য ব্যবহার করছে। এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে বিশ্বের নামকরা পণ্য রিভিউ প্রতিষ্ঠান ‘প্রডাক্ট হান্ট’ তাদের ইনস্ট্যান্ট ক্লিককে ‘প্রডাক্ট অব দি উইক’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

 

ফোর্বস ম্যাগাজিনের স্বীকৃতি

বিশ্বের নামকরা সাময়িকী ফোর্বস ম্যাগাজিন। প্রতিবছর তারা বিভিন্ন সেক্টরে ৩০ জন অনুপ্রেরণাদায়ী তরুণের নাম ঘোষণা করে। এই তরুণদের বয়স হতে হয় ত্রিশের নিচে। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে ফোর্বস ম্যাগাজিন থেকে তাউস নূরের কাছে ই-মেইল আসে। তাঁদের কার্যক্রম এবং আরেক সহপ্রতিষ্ঠাতা মোতাসিম রহমানসহ যৌথ ছবি চেয়ে নেয়। তাউস ও মোতাসিম নিজেদের কাজের ব্যস্ততায় বিষয়টা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন। দেড় মাস পর তাউসের হোয়াটসঅ্যাপে আবার যোগাযোগ করে ফোর্বস ম্যাগাজিনের কর্মী ডেভিড। তাউসদের সম্পর্কে কিছু তথ্য যাচাই করেন তিনি। তখনো অবশ্য তাঁরা নিশ্চিত হতে পারেননি যে তাঁদের নাম ফোর্বসের তালিকায় থাকছে কি না। 

অবশেষে ১৯ এপ্রিল তাঁরা জানতে পারেন ফোর্বস ম্যাগাজিনের স্বীকৃতির কথা। তাঁদের নির্বাচিত করেছে ‘৩০ আন্ডার ৩০ ইন এশিয়া’ হিসেবে।

সহপ্রতিষ্ঠাতা মোতাসিম রহমান বলেন, ‘ফোর্বসে এ স্বীকৃতি আমাদের জন্য এক বড় অর্জন। এটা আমাদের অনেক প্রেরণা জোগাবে। কাজের প্রতি দায়িত্বশীল করবে।’

 

৯ জনের টিম

আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক মিলিয়ে চার বছর ধরে কাজ করছে গেজ। বাংলাদেশের পাশাপাশি সিঙ্গাপুর ও কানাডায় এটি নিবন্ধিত কম্পানি। তথ্য-প্রযুক্তি ঠিকমতো ব্যবহার করতে জানলে অনেক বড় কাজও কমসংখ্যক লোক দিয়ে করা যায়—তা প্রমাণ করছে তাদের টিম। বর্তমানে গেজ টিমে কাজ করছেন ৯ জন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী তাউস নূরের নেতৃত্বে চারজন কানাডায়, চিফ অপারেশন অফিসার (সিওও) মোতাসিম রহমানের নেতৃত্বে চারজন বাংলাদেশে এবং একজন সদস্য অস্ট্রেলিয়ায় বসে কাজ করছেন।

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

গেজের পরিকল্পনা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী সিইও তাউস নূর বলেন, ‘চলতি বছরের মধ্যে আমাদের ইনস্ট্যান্ট চেকআউটের গ্রাহক সংখ্যা ১০০ জনে রূপান্তর করতে চাই। আরো বাড়াতে চাই আমাদের রেভিনিউ।’