kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

সংবাদজগতে কিভাবে এত ক্ষমতাধর হয়ে উঠল ফেসবুক

৭ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



সংবাদজগতে কিভাবে এত ক্ষমতাধর হয়ে উঠল ফেসবুক

কোনো ধরনের সতর্কবার্তা না দিয়ে এক রাতের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় সংবাদপত্রের পেজগুলোর কার্যক্রম ব্লক করে দেয় ফেসবুক। এর পর থেকে দেশটির গণমাধ্যমকর্মীরা নিজেদের পেজে আর কোনো নিউজ শেয়ার করতে পারছিলেন না। সংবাদজগতে ফেসবুকের ক্ষমতা কতখানি সেটি এই ঘটনায় আরো স্পষ্ট হয়েছে। সংবাদজগতে ফেসবুক কিভাবে এত ক্ষমতাধর হয়ে উঠল সেটাই জানাচ্ছেন এ এম তাহমিদ

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে পথচলা শুরু করেও আজ ফেসবুক পরিণত হয়েছে এক অনলাইন মিলনমেলায়, যার মাধ্যমে শুধু প্রিয়জনের সঙ্গে ব্যবহারকারীরা যোগাযোগই করছেন না, বরং সেটি সংবাদমাধ্যমের বাহক হিসেবেও কাজ শুরু করেছে। এ অবস্থায় ফেসবুকের ওপর নজরদারি এবং সংবাদ নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে ভাবছে প্রায় প্রতিটি দেশ। এর মধ্যে প্রথম ধাপটি নিয়েছে বলা যায় অস্ট্রেলিয়ার সরকার।

অস্ট্রেলিয়ায় সংবাদ প্রচারের জন্য ব্যয় হওয়া অর্থের প্রায় ৮১ শতাংশই পেয়ে থাকে ফেসবুক ও গুগল। অন্য সব গণমাধ্যমের চেয়ে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা আরো অনেক বেশি হওয়ায় বেশির ভাগ সংবাদমাধ্যমই ফেসবুকে স্পনসর্ড পোস্ট আকারে তাদের সংবাদ ও অন্যান্য কনটেন্ট প্রকাশ করছেন। সে হিসেবে অস্ট্রেলীয় সরকারের দাবি, ফেসবুককেও অন্যান্য গণমাধ্যমের মতো প্রতিটি সংবাদ কনটেন্ট থেকে প্রাপ্ত আয়ের কিছু অংশ সরকারকে দিতে হবে। অন্যদিকে ফেসবুকের দাবি, কনটেন্ট নিয়ে সব ধরনের হিসাব-নিকাশ সরকার ও গণমাধ্যমের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। এ অবস্থায় ফেসবুকের ওপর বসানো চার্জের বিল পাস হওয়ার আগেই তারা অস্ট্রেলিয়ার সব সংবাদ তাদের সেবা থেকে বাদ দিয়েছে। সাধারণ ব্যবহারকারীরা চাইলেও অস্ট্রেলীয় কোনো সংবাদ ফেসবুকে পোস্ট করতে পারেননি। এই পদক্ষেপের ফলে চরম খেপেছেন সে দেশের সব নাগরিক; কিন্তু ফেসবুক সহজে হাল ছাড়তে নারাজ। ফলে মিডিয়াগুলোকে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে কনটেন্ট পৌঁছে দিতে।

মিডিয়ার আয়ে ভাগ বসানোর চেয়েও বড় অভিযোগ, ফেসবুকের কারণে বদলে যাচ্ছে সংবাদ ও রিপোর্টের ধরন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই চটকদার গুজবভিত্তিক সংবাদের ওপরই ব্যবহারকারীরা ক্লিক করছেন বেশি, ফেসবুকও তাদের অ্যালগরিদম সেভাবেই ঠিক করে দিচ্ছে, যাতে যেসব খবরে বেশি ক্লিক পড়ে সেগুলোও যেন ব্যবহারকারীদের নিউজফিডে বেশি বেশি করে পৌঁছায়। দিন শেষে সব গণমাধ্যমেরই আয় নির্ভর করে তাদের কনটেন্টের কাটতির ওপর। না চাইলেও ফেসবুকের অ্যালগরিদম যাতে ব্যবহারকারীদের কাছে কনটেন্ট পৌঁছে দেয় সেভাবেই খবর সাজাতে হচ্ছে তাদের। এর একটা বিশাল খারাপ দিক হচ্ছে, অনেক ‘মুখরোচক নয় কিন্তু অত্যন্ত জরুরি’ খবর চাপা পড়ে যাচ্ছে। শুধু যে সেসব কনটেন্টই ব্যবহারকারীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না তা-ই নয়, গণমাধ্যমগুলো সেসব খবর রিপোর্টিং ও ফলোআপের ক্ষেত্রেও দেখাচ্ছে অনীহা। ফেসবুক ও অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর চাপে ধীরে ধীরে সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা কমছে, আবার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে গুজবও। ফেসবুক ভুয়া খবর বন্ধ করার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ নিলেও দিন শেষে তার কার্যকারিতা সামান্যই।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা বনাম সংবাদের সত্যতা যাচাই ও গুরুত্বের পরিমাপ—এই বিতর্কের শেষ নেই। ইন্টারনেট যুগের আগেও এ সমস্যা যে একেবারেই ছিল না তা নয়; কিন্তু সবার হাতে ইন্টারনেট ও যোগাযোগের প্ল্যাটফর্ম পৌঁছে যাওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে জটিলতা।

ফেসবুকের প্রবল ক্ষমতার উৎস এর কোটি কোটি ব্যবহারকারী। তাদের প্ল্যাটফর্ম আজ এতই বড় যে সব ধরনের কনটেন্ট—হোক সেটা সংবাদ, কোনো বিজ্ঞাপন, শিল্পকলা, এমনকি নাটক বা সিনেমা—সব কিছুর মার্কেটিংয়ের জন্য ফেসবুকের ওপরই নির্ভরশীল হতে হচ্ছে। যেহেতু সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্ম এখনো বেশ নতুন, ফলে তার ওপর কর আরোপের সংবিধান বা ধারা এখনো বেশির ভাগ দেশে স্পষ্ট করে লেখা হয়নি। তবে আগামী দিনগুলোতে অস্ট্রেলীয় সরকারের মতো বিল অন্যান্য দেশেও দেখা যেতে পারে।

ফেসবুকে বা অনলাইন যোগাযোগ মাধ্যমগুলোয় সেন্সর বোর্ড বা সম্পাদক নেই। এসব মাধ্যমে কনটেন্টের ভাইরাল হওয়ার যোগ্যতাকেই একমাত্র মানদণ্ড বানিয়ে সম্প্রচার অ্যালগরিদম বানানোর ফলে যে পক্ষপাতদুষ্ট পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে তাতে সামনের দিনগুলোতে এই প্ল্যাটফর্মের ওপর হস্তক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা দিন দিনই বাড়বে, কমবে না। এই বিশাল ‘মনোপলি’ যদি ভেঙে না দেওয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আর কোনো ইন্ডাস্ট্রিই ফেসবুক ছাড়া টিকতে পারবে না। ফলে সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মগুলোই আড়াল থেকে বিশ্বের প্রায় সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করবে।

মন্তব্য