kalerkantho

শুক্রবার । ১৯ আষাঢ় ১৪২৭। ৩ জুলাই ২০২০। ১১ জিলকদ  ১৪৪১

সাইবার বুলিং মোকাবেলায় সাইবার টিনস

৩১ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সাইবার বুলিং মোকাবেলায় সাইবার টিনস

মডেল : জাকিয়া, ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

সাইবার বুলিংয়ের শিকার হওয়া কিশোর-কিশোরীদের সাহায্যে এগিয়ে আসে ‘সাইবার টিনস নড়াইল’। তাদের ওয়েবসাইট এবং অ্যাপে করা যায় অভিযোগ। বিস্তারিত জুবায়ের আহম্মেদের কাছে

 গত বছরের ৩০ আগস্ট সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় পিরোজপুর ভাণ্ডারিয়ার সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রোকাইয়া রূপা। তামিম খান নামে এক বখাটে যুবক রোকাইয়াকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে আসছিল। এতে রূপা রাজি না হওয়ায় তার ছবি ফটোশপের মাধ্যমে সম্পাদনা করে বিভিন্ন গ্রুপে দিয়ে ভাইরাল করা হয়। নিজের সেই আপত্তিকর ছবি দেখে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় মেয়েটি।

এ রকম বাংলাদেশে প্রায় প্রতিদিনই ঘটে থাকে। এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ৪৯ শতাংশ কিশোর-কিশোরী এ রকম সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। কিন্তু নিজেদের এ সমস্যা কাউকে বলতে পারে না তারা। পুলিশ তো দূরের কথা, অনেকেই নিজের মা-বাবাকেও এ ব্যাপারে কিছু জানায় না। ফলে অনেক সাইবার বুলিংয়ের শিকার ব্যক্তি আত্মহত্যাও করে থাকে।

 

সাইবার বুলিং

ইন্টারনেট যেমন আমাদের সব কাজকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে, ঠিক তেমনি এর অপব্যবহারে হতে পারে নানা অপরাধ। ছবি বিকৃত করে ভয়ভীতি দেখানো, অশ্লীল কথা বলা, মেসেজ দিয়ে ভয়ভীতি দেখানো সাইবার বুলিংয়ের মধ্যে পড়ে। প্রতিনিয়ত অনলাইনে কাউকে উত্ত্যক্ত করাও সাইবার বুলিং।

 

সাইবার টিনস

অনলাইনে প্রতিনিয়ত নিপীড়নের শিকার হওয়া বেশির ভাগ কিশোর-কিশোরীরা বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করে। ফলে তারা হীনম্মন্যতায় ভোগে, পড়ালেখা থেকে মন উঠে যায়, আসক্ত হয় মাদকে, সব সময় নিজেকে অপরাধী মনে করে। এ সমস্যার সমাধান খুঁজতে থাকে ‘নড়াইল ভলান্টিয়ারস’ সংগঠনের তরুণরা। একসময় তারা সিদ্ধান্ত নেয় এমন কিছু করার, যার মাধ্যমে সহজেই নিজের সমস্যা কথা বলতে পারবে ভুক্তভোগী কিশোর-কিশোরীরা। সাইবার টিনস-এর প্রতিষ্ঠাতা সাদাত রহমান সাকিব বলেন, “আমরা একটু গবেষণা করে করে বুঝতে পারলাম কিশোর-কিশোরীরা পুলিশ বা প্রশাসনকে ভয় পায়। তাই এ ধরনের সমস্যার কথা নিয়ে পুলিশের কাছে যেতে চায় না। নড়াইল জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন পিপিএম (বার)-এর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে বলি, ‘আমরা এমন একটি ওয়েবসাইট বানাতে চাই, যেখানে কোনো কিশোর-কিশোরী সাইবার বুলিংয়ের শিকার হলে অভিযোগ করতে পারবে। সেই অভিযোগের সূত্র ধরে পুলিশও তাদের সাহায্য করতে পারবে।”’

পুলিশ সুপার মহোদয়ের কাছ থেকে সাড়া পাওয়ার পর নড়াইল ভলান্টিয়ার্সের স্বেচ্ছাসেবকরা কাজ শুরু করে দেয়। এর মধ্যে ‘ইয়ুথ ইনোভেশন চ্যালেঞ্জ ২০১৯’ নামে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘অ্যাকশন এইড’। সেখানে সাকিব তাদের আইডিয়াটি পাঠান এবং প্রাথমিকভাবে সেটি নির্বাচিতও হয়। ঢাকায় তাঁদের আইডিয়া উপস্থাপনের জন্য ডাক পড়ে। সেখানে আইডিয়াটি পছন্দ হলে তা বাস্তবায়নের জন্য ফান্ড দেওয়া হয়। সেখান থেকেই আসলে ‘সাইবার টিনস নড়াইল’-এর কার্যক্রম বাস্তবায়ন শুরু।

এদের কার্যক্রম আপাতত শুধু নড়াইলেই সীমাবদ্ধ। তবে তাঁদের ইচ্ছে আছে এটিকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার।

 

প্রথমে ওয়েবসাইট

সাইবার বুলিং সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং অভিযোগ জানানোর জন্য প্রথমেই তৈরি করা হয় ওয়েবসাইট https://cyber-teens.com/। এটি চালু করা হয় গত বছরের ৯ অক্টোবর।

বেশ গোছানো ওয়েবসাইটে প্রথমেই রয়েছে সাইবার বুলিং সম্পর্কে ধারণা, অভিযোগ করার পদ্ধতি এবং সাইবার বুলিংয়ের মতো অপরাধের শাস্তি সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য। পাশাপাশি পাওয়া যাবে ইন্টারনেটে কিভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখা যাবে, সেসব সম্পর্কে তথ্যচিত্র থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় টিপস। এ ছাড়া এই ওয়েবসাইটে ইন্টারনেট বিষয়ক বিভিন্ন লেখা বা ব্লগ পড়া যাবে, পাওয়া যাবে ইন্টারনেট-সংক্রান্ত বিভিন্ন পরামর্শ এবং মিলবে ইন্টারনেটে নিরাপত্তা বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতা ও সেমিনারের খোঁজখবরও।

কিশোর-কিশোরীরা যেহেতু পিসির চেয়ে মোবাইলেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, সেটা মাথায় রেখে কয়েক দিনের মধ্যে চালু করা হয় ‘সাইবার টিনস অ্যাপ’। গুগল প্লেস্টোরের https://urlzs.com/dZF1i ঠিকানা থেকে অ্যাপটি বিনা মূল্যে ডাউনলোড করা যাবে।

অ্যাপটি বাস্তবায়নে সহযোগিতা করছেন নড়াইলের জেলা প্রশাসক আনজুমান আরা এবং নড়াইল জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন পিপিএম (বার)। মূলত ওয়েবসাইটে যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায় সেসব অ্যাপেও পাওয়া যাবে। তবে বাড়তি হিসেবে এতে গুজবের একটি নোটিফিকেশন যুক্ত করা হয়েছে। দেশে কোনো ধরনের গুজব রটে গেলে সেসব বিষয়ে নোটিফিকেশনের মাধ্যমে সচেতন করা হয়।

অ্যাপটি এখনো বেটা সংস্করণে আছে। তবে এপ্রিল-মে নাগাদ এটিকে পূর্ণাঙ্গ আকারে প্রকাশ করা হবে।

‘সাইবার টিনস নড়াইল’-এর যাবতীয় কর্মকাণ্ডের খবর জানা যাবে তাদের ফেসবুক পেজ https://www.facebook.com/cyberTeensBD/ থেকেও। আরো আছে হটলাইন ০১৬১১৮৬০৯৯৯। এই নাম্বারে ফোন করেও মিলবে সেবা।

 

কিভাবে কাজ করে

কিশোর-কিশোরীকে যদি কেউ অনলাইনে বিরক্ত করে বা হুমকি দেয়, তাহলে সে স্কিনশট/কল রেকর্ড কিংবা ভিডিওসহ বিস্তারিত লিখে অভিযোগ করা যায়। আর  সেই অভিযোগটি সরাসরি জেলা পুলিশ সুপারের নিকট চলে যায়। পরে ভুক্তভোগীকে পুলিশ সহযোগিতা করে। ওয়েবসাইট এবং অ্যাপে একইভাবে অভিযোগ করা যায়।

 

প্রথম অভিযোগের সমাধান ১৩ ঘণ্টায়

নড়াইল সরকারি ভিক্টোরিয়া কলেজের দ্বাদশ শ্রেণি পড়ুয়া সাদিয়া (ছদ্মনাম) অভিযোগ করেন যে তাঁকে যশোরের এক যুবক বিরক্ত করছে এবং প্রেমে রাজি হতে জোর করছে। যুবকটি চিত্রশিল্পী। ওই ছাত্রীর একটি অশ্লীল ছবি এঁকে পাঠিয়ে হুমকি দেয়, ‘তার প্রস্তাবে রাজি না হলে নড়াইলে ছাত্রীকে ভাইরাল করে দেওয়া হবে।’ ছাত্রীটি তখন ‘সাইবার টিনস’ অ্যাপসের মাধ্যমে অভিযোগ করেন। রাতে অভিযোগ পাবার পর সাদাত রহমান সাকিব ওই কিশোরীর সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং নড়াইলের পুলিশ সুপারকে বিষয়টি জানান। অপরাধীকে ধরার জন্য নড়াইল ডিবি টিমকে দায়িত্ব দেন তিনি। সেই যুবককে খুঁজে বের করে সাইবার আইনের আওতায় গ্রেপ্তার করা হয়। নড়াইলের পুলিশ সুপার নিজে ভুক্তভোগীর বাবার সঙ্গে দেখা করেন এবং সব ধরনের সহযোগিতা করার আশ্বাস দেন। খবরটি গণমাধ্যমে এলেও ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। অভিযোগের মাত্র ১৩ ঘণ্টার মধ্যে সমাধান করে পান ভুক্তভোগী। এ রকম প্রতিনিয়ত অভিযোগ পাওয়া মাত্রই ভুক্তভোগীকে সাহায্য করতে কাজ করে যাচ্ছে তারা।

 

নড়াইল ভলান্টিয়ার্স

তরুণ-তরুণীদের উদ্ভাবনী চিন্তা কাজে লাগিয়ে নড়াইলের বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা সমাধান করে থাকে ‘নড়াইল ভলান্টািয়ার্স’। ২০১৮ সালে সামাজিক কাজে বিশেষ অবদান রাখার জন্য ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে সংগঠনটি। এটির অধিকাংশ সদস্যই স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। তবে তাঁদের সঙ্গে কিছু তরুণও যুক্ত রয়েছেন। বিভিন্ন সামাজিক ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম করে থাকেন তাঁরা। শীতবস্ত্র বিতরণ, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান, শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন ধরনের সেমিনার, অসহায়দের সহযোগিতা করাসহ নড়াইলে নানা ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। পাশাপাশি তাঁরা নড়াইল পরিবেশ সুরক্ষা, রক্তদান, বাল্যবিবাহ রোধে সচেতনতামূলক ভিডিও তৈরি করে থাকে। 

 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে সাদাত রহমান সাকিব বলেন, ‘সাইবার টিনস অ্যাপটিকে আরো বেশি কার্যকর এবং ফিচার বৃদ্ধি করতে চাই। আপাতত এটির সেবা নড়াইলে চালু থাকলেও ভবিষ্যতে সারা দেশ ছড়িয়ে দিতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। অ্যাপটি ব্যবহারের ফলে পুলিশ প্রশাসন ও কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ তৈরি হবে। আরেকটি বিষয় আমাদের পরিকল্পনায় আছে যে অ্যাপে মনোবিদদের পরামর্শ যুক্ত করা। প্রশাসনিক সাহায্যের পাশাপাশি যদি মানসিকভাবে সাহায্য করা যায়, তাহলে অপরাধের সঙ্গে আত্মহত্যা—দুটোই কমে আসবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে একটি করা ‘ডিজিটাল লিটারেচি ক্লাব গঠন’ করতে চাই। রোকাইয়া রূপার মতো আর কোনো মেয়ে যেন সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে আত্মহত্যা না করে—এটাই আমাদের চাওয়া।’

মন্তব্য