kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৮ জানুয়ারি ২০২০। ১৪ মাঘ ১৪২৬। ২ জমাদিউস সানি ১৪৪১     

নারী উদ্যোক্তাদের গৃহবধূ

শুধু দেশের নারী উদ্যোক্তাদের জন্য মার্কেটপ্লেস গৃহবধূডটকম যাত্রা করেছে গত মাসে। প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার করে নিজেদের তৈরি পণ্য বিক্রি করতে পারছেন দেশ-বিদেশে নারী উদ্যোক্তারা। বিস্তারিত ইমরান হোসেন মিলনের কাছে

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নারী উদ্যোক্তাদের গৃহবধূ

গৃহবধূডটকমে পণ্য বিক্রি করা যাবে ঘরে বসেও মডেল : পিউলি, ছবি : কাকলী প্রধান

দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য নারী নানা ধরনের কাজ করে থাকেন। অনেকেই আবার অবসর সময়ে নানা ধরনের পণ্য তৈরি করেন। সেসব পণ্য সহজেই যেন দেশের মানুষ কিনতে পারে, এমনকি বিদেশ থেকেও যেন বাংলাদেশের নারীদের তৈরি এসব পণ্য কিনতে পারে সে জন্য একটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছেন এক নারী উদ্যোক্তা সাহেদা তাজনিয়া। তাঁর সেই উদ্যোগটির নাম ‘গৃহবধূডটকম’ (grihobodhu.com)।

 

উদ্যোক্তা শুধু নারীই

উদ্যোক্তা সাহেদা তাজনিয়া দেশের নারীদের নিজ কর্মসংস্থানে উদ্বুদ্ধ করতেই এমন উদ্যোগ নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বাংলার নারীদের নিজ কর্মদক্ষতা ও ব্যবসাক্ষেত্রে স্বাবলম্বী করে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। এখন তো পৃথিবীর সব উন্নয়নশীল কর্মে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি রাখছেন সমান অবদান। পিছিয়ে নেই বাংলার নারীরাও। তাঁদের রয়েছে কাজের প্রতি অসীম আগ্রহ ও উদ্দীপনা। আর নারীদের এই উদ্দীপনাকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের কর্মক্ষমতা ও আগ্রহকে ব্যাবসায়িক রূপ দান করে সফলতার চূড়ায় পৌঁছে দেওয়াই আমাদের মূল লক্ষ্য।’

বাংলাদেশের জনসংখ্যার অর্ধেকই নারী। তাই নারীকে বাদ দিয়ে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। প্রযুক্তি ব্যবহার করে নারীরা চাইলেই ঘরে বসেও ব্যবসার মাধ্যমে নিজেকে এবং নিজ পরিবারকে স্বাবলম্বী করতে পারেন। এই চিন্তাভাবনা থেকে তাঁদের ব্যবসার প্রতি আগ্রহী করে তোলা এবং ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য ২০১৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি থেকেই ‘গৃহবধূ’র পথচলা। তবে প্রতিষ্ঠানটির আনুষ্ঠানিক পথচলা শুরু হয়েছে এ বছরের নভেম্বরে।

 

যেসব পণ্য পাওয়া যায়

গৃহবধূডটকমে শুধু নারীরাই তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন। তবে কিনতে পারেন যে কেউ। এই ই-কমার্স মার্কেটপ্লেসে দেশের অভ্যন্তরের নারীদের তৈরি নানা ধরনের পণ্য পাওয়া যায়। এসবের মধ্যে রয়েছে পোশাক, আসবাবপত্র, শোপিস, বিভিন্ন অ্যাকসেসরিজ, বিউটি পণ্য, ছেলেদের পোশাক, শিশুদের বিভিন্ন ধরনের পণ্যও বিক্রি হয় গৃহবধূডটকমে। এ ছাড়া ক্যাটাগরিভিত্তিক শাড়ি, গয়না, কসমেটিকস, ব্যাগ ও পার্স, পাট ও শতরঞ্জি, লেদার, গ্রোসারি ও খাদ্যসামগ্রী, গৃহস্থালি ও কিচেনসামগ্রী, ওষুধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা পণ্য, জুতা-স্যান্ডেলসহ নানা ধরনের পণ্যও রয়েছে এই মার্কেটপ্লেসে।

 

মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খুলতে

আগেই বলা হয়েছে, গৃহবধূডটকমে মার্চেন্ট হিসেবে শুধু নারীরাই নিবন্ধন করতে পারবেন। সে জন্য ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে রেজিস্ট্রেশন অপশনে ক্লিক করে প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে হবে। পরে গৃহবধূর অ্যাডমিন প্যানেল থেকে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করা হবে এবং সব কিছু ঠিক থাকলে তাঁদের মার্চেন্ট হিসেবে নিবন্ধন দেওয়া হবে।

এরপর সেই মার্চেন্টকে গৃহবধূর কাছ থেকে ই-মেইলের মাধ্যমে একটি ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দেওয়া হবে। সেই আইডি পাসওয়ার্ড পরবর্তী সময়ে ব্যবহার করে মার্চেন্টরা ওয়েবসাইটে সাইন ইন করতে পারবেন। গৃহবধূতে নিবন্ধিত মার্চেন্ট হওয়ার পর তাঁরা নিজস্ব অ্যাকাউন্ট থেকে পণ্যের ছবি আপলোড করা থেকে শুরু করে পণ্যের বিবরণ দিতে পারবেন।

মার্চেন্টদের পণ্যের ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সব সময় সচেতন থাকে গৃহবধূ। নিবন্ধন করার পর যখন পণ্যের তালিকা যুক্ত করেন মার্চেন্টরা তখন তাঁদের পণ্যের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে গৃহবধূ প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন প্রমোশনাল টুল ব্যবহার করে থাকে, যাতে ক্রেতাদের সম্ভাব্য সব ধরনের তথ্য দেওয়া যায়।

 

রয়েছে পণ্য পরিবর্তন সুবিধাও

ক্রেতা কোনো পণ্য কেনার পর সেটি যদি ভাঙা, ছেঁড়া, ছবির সঙ্গে মিল না থাকার মতো পরিস্থিতি কিংবা মাপে সঠিক না হয়, সে ক্ষেত্রে তা পরিবর্তনের বা বদলানোর সুবিধা রয়েছে। কোনো ক্রেতা যদি তাঁর পণ্য পরিবর্তন করতে চান তাহলে তাঁকে পণ্য হাতে পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে অভিযোগ করতে হবে। এরপর গৃহবধূ থেকে ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে পণ্য পরিবর্তনের জন্য সব ধরনের সহায়তা করবে। অন্যদিকে ঢাকার বাইরে হলে সাত দিনের মধ্যে তা পরিবর্তনের সুবিধা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গৃহবধূ তাদের ক্রেতাদের কাছে অনুরোধ করে তাদের একটি সচল মোবাইল নম্বর দিতে।

 

উদ্দেশ্য প্রান্তিক নারীর ক্ষমতায়ন

গৃহবধূডটকমের যাত্রার অন্যতম উদ্দেশ্য দেশের প্রান্তিক নারীদের ক্ষমতায়ন। যাঁরা ঘরে বসেই কাজ করতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য এটা একটা উল্লেখযোগ্যে প্ল্যাটফর্ম হতে পারে বলে জানান গৃহবধূডটকমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাহেদা তাজনিয়া। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি অনেক নারী গ্রামে বসে সুন্দর সব পণ্য তৈরি করেন। তাঁরা সেসব পণ্য ব্যাবসায়িকভাবেও তৈরি করতে পারেন, তবে তাঁদের জন্য দরকার হয় একটা প্ল্যাটফর্ম। যেটা আমরা করে দিচ্ছি গৃহবধূর মাধ্যমে।’

তিনি আরো জানান, এমন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্রেতারাও স্বল্প মূল্যে পণ্য পেতে পারেন। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা কাজ শুরু করার পর দেখলাম অনেক পণ্য বিভিন্ন নামিদামি প্রতিষ্ঠান যে দামে বিক্রি করে প্রকৃত দাম তার চেয়ে কয়েক গুণ কম। প্রান্তিক নারীরা তাঁদের প্রকৃত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাই মধ্যস্বত্বভোগীদের দূর করে প্রান্তিক নারীদের ক্ষমতায়নেই জোর দিচ্ছি আমরা।’

 

সঙ্গে আছে দুই শতাধিক নারী উদ্যোক্তা

এরই মধ্যে গৃহবধূডটকমে মার্চেন্ট হিসেবে দুই শতাধিক উদ্যোক্তা যুক্ত হয়েছেন বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক নাসরিন জাহান লুনা। তিনি বলেন, ‘দেশের নারীদের জন্য এখানে মার্চেন্ট হতে নানা সুবিধা দিচ্ছি। ফলে মার্চেন্টের সংখ্যা দিনকে দিন বাড়ছেই। মার্চেন্টদের পণ্য যাতে খুব সহজেই ক্রেতার হাতে পৌঁছতে পারে সে জন্য গৃহবধূ তাদের কর্মীদের নিয়ে সব সময় সচেষ্ট রয়েছে। তাঁদের সুবিধা-অসুবিধা দেখার কাজটিও তারা খুব সতর্কতার সঙ্গে করে।’

অর্ডার পাওয়ার পর মার্চেন্টদের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজ গৃহবধূডটকম নিজস্ব তত্ত্বাবধানেই করে থাকে। আর এ জন্য পণ্যের বিক্রীত মূল্যের ১০ শতাংশ তারা নিয়ে থাকে। তবে নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রচারণার জন্য মার্চেন্টদের এখন বিনা মূল্যেই এই সেবা দেওয়া হচ্ছে।    

 

পরিকল্পনায় আছে আরো অনেক কিছু

এই ই-কমার্স মার্কেটপ্লেস নিয়ে বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে গৃহবধূর। সাহেদা তাজনিয়া বলেন, ‘ভবিষ্যতে মার্চেন্টদের প্রশিক্ষণের আওতায় এনে তাঁদের দক্ষতা আরো বাড়াতে চাই। নারীদের উদ্যোগ হিসেবে এই প্ল্যাটফর্মটিকে শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও সুপরিচিত করাতে চাই। এ ছাড়া বিদেশে যেন নারীরা তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে পারেন সে জন্য এখন কাজ করছি। আশা করছি অল্প সময়ের মধ্যে সেটিও সম্ভব হবে।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা