kalerkantho

শনিবার । ২৫ জানুয়ারি ২০২০। ১১ মাঘ ১৪২৬। ২৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

ক্রিপ্টোকুইনের ভোজবাজি

নিজেকে ‘ক্রিপ্টোকুইন’ হিসেবে পরিচয় দিতেন রুজা ইগনাতোভা। বিটকয়েনের বিকল্প এক ক্রিপ্টোকারেন্সি তৈরি করেছেন বলে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার পুঁজিও জোগাড় করে ফেলেন একসময়। এরপর হঠাৎ একদিন উধাও হয়ে যান রুজা। জানাচ্ছেন কাজী ফারহান হোসেন পূর্ব

৮ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ক্রিপ্টোকুইনের ভোজবাজি

টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার ঘটনা নেহাত কম নয়। তবে বছর দুয়েক আগে প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে কেটে পড়া এবং চোরের হদিস না মেলা এখনো এক বিরাট রহস্য! লাখ লাখ মানুষের সরল বিশ্বাস এবং সহজ অর্থপ্রাপ্তির লোভকে কাজে লাগিয়ে এই লোমহর্ষক অর্থ আত্মসাতের ঘটনা হয়তো পৃথিবীর যেকোনো চুরিকেই হার মানাবে।

 

বিটকয়েনের প্রতিদ্বন্দ্বী ওয়ান কয়েন

২০১৬ সালের জুনে ৩৬ বছর বয়সী রুজা ইগনাতোভা তাঁর হাজারো ভক্তের উদ্দেশে ঘোষণা দেন, ওয়ান কয়েন অচিরেই বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও দামি মুদ্রা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে! ভুয়া পরিসংখ্যান দেখিয়ে তিনি বলেন, আর দুই বছর পর বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও সম্ভাবনাময় মুদ্রা হিসেবে বিটকয়েনের নাম কেউ মুখেই নেবে না। সুতরাং ওয়ান কয়েনে বিনিয়োগ করার এইতো সময়। এ কথা শুনে সবাই সরল বিশ্বাসে আনন্দ-উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। যুক্তরাজ্যের উইম্বলে এর জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চে অক্সফোর্ডের সাবেক শিক্ষার্থী, কনস্টাঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডিপ্রাপ্ত ড. রুজার জাদুকরী মোহের জালে সবাই আচ্ছন্ন হয়ে বিশাল বিনিয়োগের স্বপ্ন দেখা শুরু করে। শুধু তা-ই নয়, দি ইকোনমিস্ট ম্যাগাজিন আয়োজিত সম্মেলনে দেওয়া তাঁর বক্তব্য আরো বিশ্বস্ততা নিয়ে আসে। এক চুটকিতে ড. রুজা সবার মন জয় করে নেন। সবার পকেট থেকে খসতে থাকে বিপুল অঙ্কের টাকা!

 

গণহারে বিনিয়োগ!

বিশ্বের বাঘা বাঘা বিনিয়োগকারী তখন বিটকয়েনের উঠতি দেখে হতবাক। এক বিটকয়েনের মূল্য কয়েক পয়সা থেকে কয়েক লাখ টাকায় লাফিয়ে উঠার ব্যাপারটা অনেকের মনেই লোভ ও সহজ অর্থপ্রাপ্তির বিশাল এক আকাঙ্ক্ষা  তৈরি করে। বিটকয়েনের দাম অনেকের আওতার বাইরে চলে যাওয়ায় তাঁরা নতুন কোনো আশা খুঁজছিলেন, যেখানে বিনিয়োগ করে দ্রুত টাকা পাওয়া যাবে। সেই আশার আলো হয়ে আসে ড. রুজার ‘ওয়ান কয়েন’। বিবিসির তথ্য মতে, ২০১৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ব্রিটিশরাই প্রায় ৩৩১ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। প্রথম সপ্তাহেই তাদের কাছ থেকে বিনিয়োগ হিসেবে পাওয়া যায় ২২ কোটি টাকা! ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে ২০১৭ সালের মার্চ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশ থেকে ৪৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়। পাকিস্তান থেকে ব্রাজিল, হংকং থেকে নরওয়ে, কানাডা থেকে ইয়েমেন, এমনকি ফিলিস্তিন থেকেও বিনিয়োগকারী পাওয়া যায়!

 

গাড়ি, বাড়ি এবং কোটি টাকার চাকরি!

ব্লকচেইন বিশেষজ্ঞ জন জার্কে ২০১৬ সালের অক্টোবরে আচমকা একটি অদ্ভুত চাকরির প্রস্তাব পান। বুলগেরিয়ার একটি ক্রিপ্টোকারেন্সি স্টার্ট আপ কম্পানির সেই প্রস্তাবে ছিল একটি অ্যাপার্টমেন্ট, একটি গাড়ি এবং প্রায় দুই কোটি ৭৬ লাখ টাকার বাৎসরিক বেতন! হঠাৎ এমন প্রস্তাবে অবাক হয়ে জন জার্কে নিজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজ সম্পর্কে জানতে চান। উত্তরে জানানো হয়, ক্রিপ্টোকারেন্সি কম্পানির ব্লকচেইন প্রযুক্তি বানিয়ে দিতে হবে। ক্রিপ্টোকারেন্সির মূল ভিত্তিই হলো ব্লকচেইন। এটা ছাড়া এত দিন সেই কম্পানি কিভাবে চলল, তার সদুত্তর না পাওয়ায় জন জার্কে প্রস্তাবটি নাকচ করেন। ব্লকচেইন প্রযুক্তিবিহীন সেই ক্রিপ্টোকারেন্সি কম্পানিটির নাম ছিল ‘ওয়ান কয়েন’!

 

জেনের মাথায় হাত

ড. রুজার বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বিশ্বাস করে এক লাখ ১০ হাজার টাকার ওয়ান কয়েন কেনেন জেন ম্যাক অ্যাডাম। এটি পর্যাপ্ত বিনিয়োগ মনে না হওয়ায় এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি আরো পাঁচ লাখ ৫০ হাজার টাকার বিশেষ প্যাকেজ কেনেন। শেষ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১০ লাখ টাকার ওয়ান কয়েন কিনে তবেই তিনি শান্ত হন। যখন তাঁর লাভ ১০ গুণ হয় তখন তিনি শপিং ও ভ্রমণের স্বপ্ন দেখা শুরু করেন! কিন্তু হঠাৎ তাঁর সঙ্গে একজন ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশেষজ্ঞ টিমোথি কারির অনলাইনে যোগাযোগ হয়। তিনি বিভিন্ন প্রমাণ দিয়ে জেনকে বোঝাতে সক্ষম হন যে ওয়ান কয়েন পুরোপুরি ভুয়া! ক্রেতাদের যে লাভ দেখানো হচ্ছে, সেটা শুধু কম্পিউটারের কারসাজি! তিনি জন জার্কের সঙ্গেও তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেন। যখন জেন সব বুঝতে পারেন, ততক্ষণে সব শেষ!

 

ড. রুজা উধাও!

জেন ম্যাক অ্যাডামসহ আরো অনেকে ড. রুজার জোচ্চুরি ধরে ফেললেও তিনি বেশ দাপটের সঙ্গেই ম্যাকাও থেকে দুবাই, দুবাই থেকে সিঙ্গাপুরে ঘুরে ঘুরে নিজের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। ২০১৭ সালের অক্টোবরে পর্তুগালে একটি সভায় ড. রুজার আসার কথা ঠিক হয়। কিন্তু সেই দিন সময়ের ব্যাপারে খুবই সচেতন রুজার টিকিটির দেখাও মেলে না। ফোনের পর ফোন, বার্তার পর বার্তা! না, রুজা কোথাও নেই। এভাবেই একজন চতুর মহিলা হঠাৎ করে উধাও হয়ে যান।

 

শেষ দর্শন

ড. রুজার অন্তর্ধানের পর অনেকেই বলে, তাঁকে শত্রুতা করে মেরে ফেলা হয়েছে। অনেকে এটাও বলে, তিনি গাঢাকা দিয়েছেন। এফবিআইয়ের রেকর্ড অনুযায়ী ২০১৭ সালের ২৫ অক্টোবর অর্থাৎ তাঁর অন্তর্ধানের দুই সপ্তাহ পর তাঁকে সোফিয়া থেকে এথেন্সে রায়ানেয়ার ফ্লাইটের মাধ্যমে যেতে দেখা গেছে। আর একেবারে রাডারের বাইরে যাওয়ার আগে এটাই ছিল তাঁর শেষ দর্শন!

 

ক্রিপ্টোকারেন্সি কী?

ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত একটি অনলাইন মুদ্রা, যার কোনো শারীরিক অস্তিত্ব নেই। এর বড় সুবিধা হলো হাতে হাতে হস্তান্তর করা ছাড়াই কম্পিউটার থেকে কম্পিউটারে কিংবা মোবাইল থেকে মোবাইলে এটি লেনদেন করা যায়। তা ছাড়া ব্লকচেইন ডাটা বেইসের মাধ্যমে লেখা হয়ে যায় মুদ্রা লেনদেনের সব ইতিহাস। ফলে এখানে লেনদেনের নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয় শতভাগ। এমনই একটা ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো ‘বিটকয়েন’। শুরুর দিকে একটি বিটকয়েনের মূল্য কয়েক পয়সা থেকে এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ছয় লাখ টাকায়! স্বভাবতই বিনিয়োগের জন্য বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ক্রিপ্টোকারেন্সির প্রতি ঝোঁক অনেক বেশি।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা