kalerkantho

শনিবার । ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১৬ রবিউস সানি               

প্রথমবারেই স্বর্ণ

দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক রোবট ডি চ্যালেঞ্জে’ প্রথমবার অংশ নিয়েই একটি স্বর্ণসহ ছয়টি পদক জিতেছে বাংলাদেশি তিন কিশোর। তাদের সব অভিজ্ঞতা ও আয়োজন নিয়ে জানাচ্ছেন ইমরান হোসেন মিলন

১২ অক্টোবর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রথমবারেই স্বর্ণ

ডান দিক থেকে কাজী মোস্তাহিদ লাবিব, তাফসির তাহরিম এবং রাফিহাত সালেহ চৌধুরী

বাংলাদেশে রোবটিকসের ইতিহাস খুব বেশিদিনের নয়; এমনকি দেশে এখনো প্রাতিষ্ঠানিক তেমন শিক্ষাও শুরু হয়নি রোবটিকস নিয়ে। এই তো বছর কয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন বিভাগ হিসেবে চালু হয়েছে ‘রোবটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং’। এর বাইরে সরকারি-বেসরকারি কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছু ক্লাব গড়ে উঠেছে। ঢাকার বাইরে স্কুলপর্যায়েও খুব একটা কার্যক্রম দেখা যায় না।

২০১৮ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো রোবট অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখান থেকে আট সদস্যের একটি দল নির্বাচন করে পাঠানো হয়েছিল ২০তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে। আর প্রথমবার অংশ নিয়েই করেছে বাজিমাত। জিতে একটি স্বর্ণসহ কয়েকটি সম্মাননা। সেই দলেরই তিন সদস্য—কাজী মোস্তাহিদ লাবিব, রাফিহাত সালেহ চৌধুরী এবং তাসফির তাহরিম। গত মাসের মতো আরো একটি প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক রোবট ডি চ্যালেঞ্জে অংশ নিয়ে জিতেছে স্বর্ণসহ ছয় পদক।

 

আন্তর্জাতিক রোবট ডি চ্যালেঞ্জ কী?

‘আন্তর্জাতিক রোবট ডি চ্যালেঞ্জ’ দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বড় রোবটিকস প্রতিযোগিতা। যেখানে দেশটির রোবটিকস নিয়ে কাজ করা শিশু-কিশোররা অংশ নেয়। এত দিন প্রতিযোগিতাটিতে শুধু দক্ষিণ কোরিয়ার শিশু-কিশোররাই অংশ নিতে পারত। কিন্তু চলতি বছর থেকে প্রতিযোগিতাটিতে আরো পাঁচটি দেশের প্রতিযোগীদের সুযোগ করে দিয়েছে আয়োজকরা। এটি আয়োজন করে আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডের একটি সহকমিটি।

এটিকে বিশ্ব রোবটিকস প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় বৃহত্তম আয়োজন বলা হচ্ছে এখন। যেখানে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো অংশ নিয়েছে। দুই দিনব্যাপী ওই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় ২৮ ও ২৯ সেপ্টেম্বর।

 

বাংলাদেশ দলের অর্জন

আন্তর্জাতিক রোবট ডি চ্যালেঞ্জ প্রতিযোগিতাটির তিনটি বিভাগে অংশ নেয় বাংলাদেশ দলের এই তিন সদস্য। রাফিহাত সালেহ চৌধুরী বলে, ‘আমাদের দুটি অপশন ছিল। আমরা চাইলে যেকোনো বিভাগে এককভাবে অংশ নিতে পারতাম, আবার দলগতভাবেও করা যেত। পরে আমরা সবাই বসে ঠিক করলাম আমরা দুভাবেই অংশ নেব প্রতি বিভাগে।’ সে আরো বলে, ‘আমাদের এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বেশি পুরস্কার পাওয়ার সুযোগ তৈরি করা।’

 

রোবো স্কলার

প্রথম দিনে অনুষ্ঠিত ‘রোবো স্কলার’ বিভাগে তারা অংশ নেয় এককভাবে। সেই বিভাগে মূলত তাদের একটি রোবট তৈরি করতে দেওয়া হয়। সে জন্য প্রয়োজনীয় সব যন্ত্রপাতি আগেই সরবরাহ করা হয়। আর আয়োজকদের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী রোবট তৈরি করার পর তা প্রদর্শন করতে হয়।

সেই নির্দেশনায় পাঁচটি বিষয় দেওয়া হয়েছিল। বিষয় পাঁচটি হলো—খাদ্যাভ্যাস, চিকিৎসাবিষয়ক সাহায্য, শিক্ষাব্যবস্থা, অগ্নিদুর্যোগ এবং অ্যারোস্পেস।

নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর কাজ করে প্রেজেন্টেশন দিতে হয়েছে। তার পরও রোবো স্কলারে স্বর্ণ জেতে রাফিহাত সালেহ চৌধুরী। আর অন্য দুজন জেতে টেকনিক্যাল অ্যাওয়ার্ড।

 

মিশন চ্যালেঞ্জ

আয়োজনের শেষ দিনে আরো দুটি বিভাগে অংশ নেয় বাংলাদেশের প্রতিযোগীরা। সেদিন ‘মিশন চ্যালেঞ্জ’ বিভাগে অংশ নেয় রাফিহাত সালেহ চৌধুরী। সে বলে, ‘মিশন চ্যালেঞ্জ মূলত ক্রিয়েটিভ ক্যাটাগরি। সেখানে নিজেদের রোবট বানাতে হয়। রোবট তৈরির সব সরঞ্জাম মজুদ থাকে। শুধু কয়েকটি টুল সরবরাহ করা হয় আমাদের।’

তারা সেখানে কিছু নির্দেশনা দেয়, সে অনুযায়ী রোবট তৈরি করে পরিচালনা করতে হয়। সেই বিভাগেও বাংলাদেশ দলের হয়ে টেকনিক্যাল পুরস্কার জেতে রাফিহাত।

অন্যদিকে ‘রোবট ইন মুভি’তে অংশ নেয় কাজী মোস্তাহিদ লাবিব এবং তাফসির তাহরিম। তারা দুজন সেই বিভাগে জিতে নেয় একটি ব্রোঞ্জ ও একটি টেকনিক্যাল পুরস্কার।

 

শুরু থেকেই বাধা ছিল

মাত্র ছয় মাসের চেষ্টায়ই প্রথম স্বর্ণ এনে দিয়েছে এই কিশোররা। বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার আগে রোবট নিয়ে তেমন কোনো ধারণা তাদের ছিল না। রাফিহাত বলে, ‘আমাদের বাড়ি সিলেট শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেই। সেখানকার কয়েকজন খুব কাছের বড় ভাইয়ের কাছ থেকে প্রথম রোবটিকস সম্পর্কে জানি। তার পরই এসব নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী হই। এরপর সুযোগ হয় বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার।’

অন্যদিকে লাবিব ও তাফসির সহপাঠী। তারা রোবট নিয়ে খুব একটা কিছু না জানলেও বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াডে অংশ নেওয়ার পরই রোবট সম্পর্কে তাদের জ্ঞানচর্চা শুরু হয়। এরপর সব মিলিয়ে মাত্র তিন মাসের মতো অনুশীলন চলেছে। সেই ধারাবাহিকতায় নির্বাচিত হয়ে অংশ নিয়েছে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে।

তারা বলে, ‘প্রথম বাধা হচ্ছে এটি শেখার মতো তেমন কোনো প্ল্যাটফর্ম পাচ্ছি না। আমাদের দেশে কোনো টুল নেই, রোবটের কোনো কিট নেই। এ অবস্থায় তো কোনো কিছুই করা সম্ভব নয়।’

 

আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডেও জিতেছিল প্রথম স্বর্ণ

বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের হাত ধরেই রোবটিকস প্রতিযোগিতায় প্রথম স্বর্ণটি আসে গত বছরের ডিসেম্বরে। ফিলিপাইনে অনুষ্ঠিত ২০তম আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে। তাতে প্রথমবারের মতো অংশ নেয় আট সদস্যের বাংলাদেশ দল। একটি বিভাগে তিন সদস্যের দল অংশ নিয়ে জেতে একটি স্বর্ণপদক। এ ছাড়া সেবার কয়েকটি বিশেষ সম্মাননা পদকও পায় বাংলাদেশ দল। সেই স্বর্ণজয়ী তিনজনের দলেও ছিল কাজী মোস্তাহিদ লাবিব ও তাফসির তাহরিম।

 

চাওয়া অল্প প্রত্যাশা বেশি

অল্প কিছু সহায়তা পেলে রোবটিকসে বিশ্বে ভালো একটা অবস্থান তৈরি করতে পারবে বলে মনে করে এই কিশোররা। তারা দৃঢ়ভাবে জানায়, যদি রোবট তৈরির প্রয়োজনীয় টুল, কিট এবং মানসম্মত ল্যাব পাওয়া যায় তবে দেশের শিল্প খাতে কাজ করার মতো রোবট তৈরি করা যাবে। এমনকি বিদেশে যেমন বিমানবন্দরে রোবট পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, তেমন রোবটও তৈরি করা যাবে।

 

উৎসাহ দিচ্ছে বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াড

‘বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াড’-এর সভাপতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবটিকস অ্যান্ড মেকাট্রনিকস বিভাগের অধ্যাপক লাফিফা জামাল বলেন, ‘দেশে রোবটিকস শিক্ষায় গত কয়েক বছর থেকে কাজ করে যাচ্ছি। অন্যান্য দেশের মতো আমাদের এখানে উন্নত ল্যাব নেই, রোবটিকস করতে প্রগ্রামিং প্রয়োজন, সেটা তবু একটু হচ্ছে। কিন্তু কিট, টুল না পেলে তো চর্চাটা করা সম্ভব হয় না।’

তবে অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ রোবট অলিম্পিয়াড কমিটি সফলভাবে দুটি রোবট অলিম্পিয়াড আয়োজন করেছে। এখন চলছে দ্বিতীয়বারের মতো আন্তর্জাতিক রোবট অলিম্পিয়াডে দল পাঠানোর জন্য চূড়ান্ত নির্বাচন।

লাফিফা জামাল বলেন, ‘প্রথমবার স্বর্ণ জয়ের পর আমরা আরো বড় পরিসরে নজর দিচ্ছি। তারই ধারাবাহিকতায় এবার ছেলেরা দক্ষিণ কোরিয়া থেকেও স্বর্ণ জিতেছে।  সামনের রোবট অলিম্পিয়াডেও অনেক ভালো করবে বলে আমাদের প্রত্যাশা।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা