kalerkantho

বুধবার । ১৬ অক্টোবর ২০১৯। ১ কাতির্ক ১৪২৬। ১৬ সফর ১৪৪১       

ছবি সম্পাদনা করে কোটিপতি

ফ্রিল্যান্সিংয়ের প্রেমে পড়ে নিজের তিন-তিনটি ফটো স্টুডিও বন্ধ করে দিলেন শরীফ মুহাম্মদ শাহজাহান। এই প্রেম তাঁকে ডোবায়নি, মাত্র আট বছরেই বানিয়েছে মিলিয়নেয়ার। অনলাইন মার্কেটপ্লেস ‘আপওয়ার্কে’ একক প্রফাইলে এক মিলিয়ন ডলার অর্জনকারী প্রথম বাংলাদেশি তিনি। তাঁর সাফল্যের গল্প শুনলেন আল আমীন দেওয়ান

২৩ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ছবি সম্পাদনা করে কোটিপতি

২০০১ সালে সাভারের পল্লী বিদ্যুৎ বাজারে একটি দোকান দিয়ে মাইক্রোসফট অফিস, ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর, ভিডিও সম্পাদনার প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু করেন শরীফ। এরপর ২০০৩ সালে শুরু করেন ডিজিটাল স্টুডিওর ব্যবসা। ছবি তুলে মাত্র তিন-চার মিনিটে ছবি ডেলিভারি দেওয়াই ছিল মূল কাজ। বিষয়টি নতুন হওয়ায় প্রথম দুই বছর কোনো ব্যবসাই হয়নি।

২০০৫ সালে এসে জমতে শুরু করল ব্যবসা, ২০০৭ পর্যন্ত চলল বেশ। এরপর সবাই নেমে গেল এই ব্যবসায়। এবার তিনি খুঁজতে থাকেন নতুন কোনো ব্যবসা।

এভাবে ২০০৯ সাল যায় যায়। খবর পান, তাঁর এক বন্ধু অনলাইনে কাজ করেন। বন্ধুর কাছে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বন্ধু শেখাবেন বলে আশ্বাস দেন, তবে কিছুদিন সময় চান।

কিন্তু বসে থাকেননি তিনি। গুগলে নিজেই সার্চ দিলেন। বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেস দেখে শেষে ওডেস্কে গিয়ে নিয়ম-কানুন দেখলেন সপ্তাহখানেক। অ্যাকাউন্ট খুললেন। এরপর পরীক্ষাও দিয়ে ফেলেন। এই পরীক্ষার জন্য কারো কোনো সাহায্য নেননি। মার্কেটপ্লেসের প্রশ্ন-উত্তর ভালো করে পড়েই পরীক্ষা দিয়েছেন।

জানাচ্ছিলেন, ওডেস্কের এই পরীক্ষা আসলে প্ল্যাটফর্মটির জন্য প্রস্তুতির টেস্ট। এটি আসলে ওডেস্কের নিয়ম-কানুন ফ্রিল্যান্সার ঠিকমতো পড়ছে কি না, ক্রেতার সঙ্গে কী ব্যবহার করা যাবে আর কী করা যাবে না, এখানে ফ্রিল্যান্সারের কী অধিকার, ক্রেতার কী অধিকার আর সাইটের কী অধিকার—এসব যাচাইয়ের একটা পদ্ধতি।

ব্যস, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নেমে পড়লেন ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজের সন্ধানে।

 

প্রথমেই ছক্কা

বাসায় তখন তাঁর ইন্টারনেট ছিল না। ওই পল্লী বিদ্যুৎ বাজারে নিজের ফটো স্টুডিওর দোকানে বসে বসে সকাল ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত ওডেস্কে কাজ সার্চ করতে থাকলেন শরীফ।

কিন্তু নিজের বিভাগ অনুয়ায়ী কাজের সন্ধান আর পান না। এভাবে এক দিন, দুই দিন, ১৫ দিন খুঁজেও ফটো সম্পাদনা বিভাগে কোনো কাজ মিলল না।

আবার সেই গুগল। খুঁজতে থাকলেন আর কী কী মার্কেটপ্লেস আছে। সন্ধান পেলেন ফ্রিল্যান্সার ডটকমের। ২০০৯ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সেখানে অ্যাকাউন্ট খুলে ফেললেন।

এখানেও দিন যায় কিন্তু কাজ আর পান না। শেষে ১৯তম দিনে এক ক্রেতার মেসেজ পান তিন। যুক্তরাষ্ট্রের সেই ক্রেতার নাম ছিল অ্যান মেরি অলিভারি। ওই ক্রেতা নিজে একজন ফ্রিল্যান্সার।

ওই ক্রেতার যে ছবি সম্পাদনার কাজ ছিল তার জন্য তিনি ১০০ ডলার রেখেছিলেন। কাজের পুরোটা না পড়েই ৩০ ডলারে বিট করেছিলেন শরীফ।   মেসেজে ক্রেতা জানাতে চান, ‘এই কাজ ৩০ ডলারে কিভাবে সম্ভব?’

‘নতুন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে এখানে আমার জন্য টাকা কোনো বিষয় নয়। কাজটি করতে চাই’—উত্তর দেন শরীফ। আরো আলাপের শেষে কাজটি পেয়ে যান তিনি।

পরদিন কাজ দেওয়ার কথা হলো। ৪৮ বা ৫০ মেগাবাইটের কিছু ছবির ফাইল। রাত ফুরালে সকাল ৬টায় তিনি স্টুডিওতে চলে আসেন। কারণ ওই সময় ইন্টারনেটের গতি ভালো থাকে। এই ভালো বলতে ৬৪ বা ১২৮ কেবিপিএস।

ইউ সেন্ড ইটে ওই ফাইল পাঠিয়েছিলেন ক্রেতা। ডাউনলোডে কিছুক্ষণ পজ দিয়ে স্টার্ট দিলে কয়েক কিলোবাইট নামে। এভাবে সারা দিন শেষে বিকেলে ওই ফাইল ডাউনলোড করতে পারেন তিনি।

এরপর দুই দিনের মধ্যে তাঁর স্টুডিও ব্যাবসায়িক পার্টনারের ছোট ভাই নয়নকে নিয়ে কাজ শেষ করলেন। এবার  দ্বিতীয়বার, তৃতীয়বারের মতো তাঁকে কাজ দেন ওই ক্রেতাই। সব করে দেন দুজন মিলে। এর মধ্যে কিছু সংশোধনী দিয়েছিলেন ক্রেতা, সেটাও করে দেন।

এক মাসে প্রথম আয় হয় ৫৮০ ডলার।

‘তখন আমার ওডেস্কে কাজ না পাওয়ার আক্ষেপটা আর থাকল না। কারণ সেখানে অনেক বড় পেশাদারদের প্রথম কাজটা হয়ে থাকে ১ ডলার বা ২০ সেন্টের। বা দু-তিন মাস বা ছয় মাস লাগে ৫০০ ডলার আয় করতে,’ বলছিলেন শরীফ।

 

মিলিয়নেয়ারের মিশন

ফ্রিল্যান্সার ডটকমে প্রথম কাজে এই সাফল্যের পর এখানে কাজ করার চেষ্টা করতে থাকলেন তিনি। একসময় নিজের ফ্রিল্যান্সিং ভুবনের প্রথম অ্যাকাউন্ট যে ওডেস্কে, সে কথাও গেলেন ভুলে।

এর মধ্যে ফ্রিল্যান্সিংয়ে আসার পরামর্শদাতা ওই বন্ধু তাঁকে ইল্যান্সের সন্ধান দেন। খোলা হলো ইল্যান্সে অ্যাকাউন্ট। তবে হুট করেই ঝাঁপিয়ে পড়েননি। অন্যদের কাজ করা দেখলেন, প্রফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করলেন। সব কিছুই করলেন নিজে নিজে।

শুরু হলো ইল্যান্সের যাত্রা। এখানে সদস্যপদ ছাড়া ফ্রি বিট করতে পারতেন তিনটি কাজে। কাজ পেলেন তিন মাস পর। ইল্যান্সে তাঁর প্রথম ক্রেতা টানা এক বছর এবং আরেক ক্লায়েন্ট দুই বছর কাজ দিতে থাকেন। তাঁদের কাজ শুরু করার তিন মাসের মধ্যে অনেক ফাইভ স্টার রেটিং পেতে থাকেন শরীফ। এবার তিনি ফ্রিল্যান্সার ডটকমকেও ভুলে যান।

পুরোদমে মনোযোগী হন ইল্যান্সে। কাজের জন্য টিমে একজন-দুজন করে সদস্য যুক্ত করতে থাকেন। হয়ে গেলেন ফুল টাইম ফ্রিল্যান্সার। ২০১০ সালের মাঝামাঝি সময়ে বন্ধ করে দিলেন নিজের স্টুডিও ব্যবসা। এখানকার কর্মীদের যুক্ত করে নিলেন ফ্রিল্যান্সিং টিমে।

ইল্যান্সে তাঁর জয়জয়কার চলতে থাকল। ২০১২ সাল থেকে ইল্যান্স ওডেস্কের সঙ্গে এক হয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত টানা কয়েক বছর ডিজাইন অ্যান্ড মাল্টিমিডিয়া বিভাগে তাঁর টিম পৃথিবীর মধ্যে টপ র‌্যাঙ্কে ছিল। এ জন্য তিনি ইল্যান্সের প্রধান নির্বাহীর কাছ থেকে স্বীকৃতির সনদ পেয়েছিলেন।

পরে ইল্যান্স-ওডেস্ক এক হয়ে আপওয়ার্ক হয়ে যাওয়ার পর আপওয়ার্কে কাজ করতে থাকলেন। ইল্যান্সের প্রফাইলও এলো আপওয়ার্কে।

২০১৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১টায় তাঁর আপওয়ার্ক প্রফাইলের আয় এক মিলিয়ন ডলার স্পর্শ করে, যা বিশ্বখ্যাত মার্কেটপ্লেসটির একক প্রফাইলে বাংলাদেশি হিসেবে প্রথম।

আপওয়ার্কে তাঁর প্রফাইল ব্যক্তিগত হলেও ১৫ জনের একটি দল নিয়ে তিনি কাজ করছেন।

২০১০ সাল থেকে ২০১৮, মাত্র আট বছরে অনলাইনে ফটো সম্পাদনা করেই আয় করে ফেললেন এক মিলিয়ন ডলার।

আর কম কাজ করা ফ্রিল্যান্সার ডটকমেও পৌনে দুই লাখ ডলারের মতো আয় তাঁর। আরেকটি পিপল পার আওয়ারে কাজ করেন মাঝেমধ্যে, সেখানে আয় ৩৫ হাজার ডলার।

 

নতুনদের জন্য পরামর্শ

এই পেশায় দেখেশুনে আসতে হবে, হুজুগে নয়। ফ্রিল্যান্সিংয়ের জন্য প্যাশন ও ধৈর্য থাকতে হবে।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের রিসোর্সগুলো দেখতে হবে, ভালো করে জানতে হবে।

প্রফাইল খোলার আগে দেখেশুনে শিখে নিতে হবে। এরপর কাজ করতে করতে শেখার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে, মানে উন্নতি করতে হবে। যে যেই কাজটি ভালো পারে তাকে সেই বিভাগ ঠিক করে নিতে হবে।

না জানা, না বোঝার কারণে ক্রেতাকে ভালো সেবা দিতে না পারলে ক্রেতা নেতিবাচক মতামত দেবে। আর শুরুর দিকে একজন বা দুজন ক্রেতা যদি নেতিবাচক মতামত দেয় তাহলে অনেক প্ল্যাটফর্মে শুরুতেই নিষিদ্ধ করে দেবে অ্যাকাউন্ট। তার মানে সেখানে তাঁর ক্যারিয়ারই শেষ, একটি প্ল্যাটফর্ম হারিয়ে গেল।

পোর্টফোলিওর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। যে ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মে যাবেন সেই প্ল্যাটফর্মে যাঁরা ভালো করছেন তাঁদের পোর্টফোলিওগুলো দেখতে হবে। সে অনুযায়ী পোর্টফোলিও সাজানোর চেষ্টা করতে হবে। এতে যদি ছয় মাসও লাগে তা নিয়েই পোর্টফোলিও করতে হবে। কিছু নিজের সেরা কাজের নমুনা দিতে হবে। কোথাও কোনো মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া যাবে না। এতে একসময় ধরা পড়তেই হবে, সময়ের ব্যাপার মাত্র।

কখনো ক্রেতার কাছে এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে না, যা করা যাবে না। ক্রেতা কাজ দিলে তা করার পর অতিরিক্ত যদি কিছু করার সুযোগ থাকে তখন সেটা করে দেওয়া যেতে পারে। এতে ক্রেতা চমকে যাবে, খুশি হবে। ফলে রেটিংও ভালো হবে। এই ক্রেতাটির সূত্র ধরেই হয়তো নতুন কোনো ক্রেতার কাছে কাজ পাওয়া যেতে পারে। আর ক্রেতা সন্তুষ্ট হলে দীর্ঘ বিরতির পরও আপনাকে নতুন কাজের জন্য ঠিকই খুঁজে নেবে।

 

ছবি : তানভীর ইসলাম

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা