kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২০ জুন ২০১৯। ৬ আষাঢ় ১৪২৬। ১৬ শাওয়াল ১৪৪০

এক-পের মধ্যে অনেক সেবা

ডিসেম্বরে দেশে চালু হতে যাচ্ছে এটুআই প্রকল্পের তৈরি নতুন পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘এক-পে’। সরকারি সেবার বিল ও নানা ধরনের ফি নেওয়ার ক্ষেত্রে এই ই-পেমেন্ট প্ল্যাটফর্মটি ব্যবহার হবে। শুরুতে সরকারের ১৬ সংস্থা, ৯টি ব্যাংক এবং দুটি মোবাইল লেনদেন সেবা এতে যুক্ত হচ্ছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন আল আমিন দেওয়ান

৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



এক-পের মধ্যে অনেক সেবা

মডেল : হৃদিকা ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

দেশে ব্যক্তিপর্যায়ের বিভিন্ন ধরনের বিল পরিশোধে বার্ষিক প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়। এত বিশাল অঙ্কের লেনদেনের ৯৫ শতাংশ এখনো হয় নগদে। বিভিন্ন বিল পরিশোধে দুর্ভোগ ও ভোগান্তি নাগরিকদের জন্য নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দুর্ভোগ ‘বিদায়’ করার উপায় হবে ‘এক-পে’।

পিটুজি (জনগণ হতে সরকার) পদ্ধতি এক-পেকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশের বৃহত্তম লেনদেনব্যবস্থা। এটি চালু হলে যেকোনো জায়গায় বসে ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট থেকে সরকারের সব সেবার বিল পরিশোধ করা যাবে। একটি মাধ্যমে সরকারের সব সেবার বিল পরিশোধ করা যাবে বলে এর নাম দেওয়া হয়েছে ‘এক-পে’। কেন্দ্রীয় এই ই-পেমেন্ট সিস্টেম ২০১৮ সালের শেষে এসে চালুর পথে।

 

শুরুটা দুই বছর আগে

২০১৬ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কম্পানি বা ডেসকো, ওয়েস্টজোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি, বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি, কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি, ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ, খুলনা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ, চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কম্পানি লিমিটেড, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও সাভার পৌরসভার সঙ্গে এক-পে নিয়ে সমঝোতা করে এটুআই। এরপর এই দুই বছর ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কারিগরি সমন্বয়, গবেষণা, প্ল্যাটফর্ম তৈরি, সফটওয়্যারসহ নানা কাজে ধাপে ধাপে এক-পে তৈরি হয়।

২০১৮ সালের নভেম্বরে ব্যাংক এশিয়া, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক, এনআরবি ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ইস্টার্ন ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, বিকাশ লিমিটেড, কিউ ক্যাশের আইটি কনসালট্যান্ট লিমিটেড, আইপে সিস্টেমসের সঙ্গে সমঝোতা হয়। যার ফলে দেশের সব কার্ড ও পেমেন্ট পদ্ধতি এক-পের সেবার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।

বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, টেলিফোন, সিটি করপোরেশন, শিক্ষা বোর্ড, ভূমি মন্ত্রণালয়, পাসপোর্টসহ সরকারের যত প্রতিষ্ঠানে যত সেবার পেমেন্ট রয়েছে—নাগরিকরা সব এই এক-পে মাধ্যমে দিতে পারবেন। প্রথমে শুরু হচ্ছে বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস দিয়ে। বাকি সেবাগুলো চালু হবে অচিরেই। সড়কপথের টোল থেকে শুরু করে জমির খাজনা, রেলের টিকিটের টাকাও দেওয়া যাবে এই মাধ্যমে।

 

কিভাবে কোথায় মিলবে

সরাসরি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে গিয়ে এক-পেতে বিল দিতে পারবেন। ওয়েবের ঠিকানা .িবশঢ়ধু.মড়া.নফ। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে এই সাইটে সবাই ঢুকতে পারবেন। একইভাবে জানা যাবে ঊশঢ়ধু অ্যাপ ডাউনলোডের ঠিকানাও।

যাঁদের মোবাইল বা কম্পিউটার নেই, তাঁরাও বঞ্চিত হবেন না। কাছের ডিজিটাল এজেন্ট পয়েন্ট অর্থাৎ ডিজিটাল সেন্টার, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা মোবাইল ফিন্যানশিয়াল সেবাকেন্দ্রগুলোতে গিয়ে নিতে পারবেন এ সেবা। গ্রামে-শহরে মোবাইলে ফ্লেক্সি করা, বিকাশ, রকেটসহ বিভিন্ন মাধ্যমের সেবা দেওয়া দোকানগুলোও ডিজিটাল এজেন্ট পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে।

এক-পের সঙ্গে এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক সেবা সহায়তাকারী এজেন্ট, ৫০ হাজারের বেশি সিন্ডিকেটেড এজেন্ট, ১৫-এর বেশি ব্যাংক এবং ৩০-এর বেশি সেবা প্রদানকারী সংস্থা যুক্ত রয়েছে। ব্যাংকের ডেবিট, ক্রেডিট, ভিসা ও মাস্টার কার্ড এবং ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এমেক্স কার্ড, এমএফএস বা বিকাশ রকেটের মতো মাধ্যম, ই-ওয়ালেট এবং ডিজিটাল ক্রেডিট সিস্টেমের মাধ্যমে বিলের টাকা হস্তান্তর করা যাবে।

ভিসা, মাস্টার কার্ড, নেক্সাস, এমেক্স ও কিউক্যাশ—এই পাঁচটি ব্র্যান্ডের কার্ডের মাধ্যমে ৫৭টি ব্যাংকে লেনদেন করা যায়। এই কার্ডগুলো যেসব প্রতিষ্ঠানের সমঝোতায় তাদের নাম রয়েছে। ফলে একজন নাগরিক যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকই হন না কেন, তিনি পেমেন্টে তাঁর অ্যাকাউন্টকে সংযুক্ত করতে পারবেন।

অ্যাপ বা ওয়েবসাইট যে মাধ্যমেই হোক না কেন, মূল তিনটি ধাপে এক-পের মাধ্যমে বিল দেওয়া যাবে।

 

অ্যাপের ক্ষেত্রে : প্লেস্টোর থেকে ঊশঢ়ধু মোবাইলে ইনস্টল করতে হবে। এরপর অ্যাপটি খুললেই দেখা যাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ইত্যাদি কোন প্রকার বিল দিতে চান সেই তালিকা। যে ধরনের বিল দেবেন সেটি নির্বাচন করার পর আসবে আপনি কার বিল দিতে চান। যেমন—আপনি বিদ্যুৎ বিল দিতে চাইলে কোন প্রতিষ্ঠানে বিল দেবেন? পিডিবি, ডেসকো না পল্লী বিদ্যুৎ। শিক্ষাবিষয়ক বিলে শিক্ষা বোর্ড বা অন্য প্রতিষ্ঠান—এমন করে বিলের ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নাম আসবে।

যে প্রতিষ্ঠানে বিল দেওয়া হবে সেটি ক্লিক করার পর তার গ্রাহক আইডি বা আইডেন্টিটি নম্বর চাইবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই সেবাগ্রহীতার গ্রাহক আইডি বা কার্ড নম্বর বা বিলের নম্বর বা অ্যাকাউন্ট কোড রয়েছে। বিদ্যুৎ বিলের ক্ষেত্রে বাড়তি কোন মাসের বিল দেবেন সেটিও নির্বাচন করতে হবে। গ্যাসের ক্ষেত্রে গ্রাহক মিটার না নন-মিটার তা জানানোর পাশাপাশি মোবাইল নম্বর দিতে হবে। বিলসহ বিভিন্ন তথ্য স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলে আসবে গ্রাহকের মোবাইল অ্যাপে। এখান থেকে পেমেন্টে গেলে কোন অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থাৎ ডেবিট-ক্রেডিট কার্ড, বিকাশ-রকেটে, না ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ে বিল দেওয়া হবে, তা নির্বাচন করে দিলেই কাজ শেষ।

 

ওয়েবসাইটের ক্ষেত্রে : .িবশঢ়ধু.মড়া.নফ ঠিকানায় গেলে প্রথমেই ‘আপনার বিলটি দেখুন’ নামের একটি ছক দেখা যাবে। সেখানে কিসের বিল আর কোন প্রতিষ্ঠানের বিল দেবেন সেগুলো নির্বাচন করার পর বাকি পদ্ধতি অ্যাপের মতোই। একজন গ্রাহক অ্যাপ ও ওয়েবসাইট—দুই জায়গায়ই নিবন্ধন করতে পারবেন। দুটির প্রথমে পেজেই এই রেজিস্ট্রারের ছক দেখা যাবে। একবার নিবন্ধন করলেই গ্রাহকের তথ্য জমা থাকবে। বারবার পূরণ করতে হবে না। নিবন্ধন না করলে প্রতিবার ব্যবহারের সময় বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। গ্রাহক যেকোনো সময় বিলের আইডি বা অ্যাকাউন্ট কোড ও মোবাইল নম্বর দিয়ে বিলের বিস্তারিত দেখতে পারবেন। বিল স্টোরি বিভাগ থেকে এগুলো দেখা যাবে।

 

খরচ কেমন?

এই সেবা সম্পূর্ণ বিনা মূল্যের। তবে ব্যাংকসহ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্ড বা অনলাইন লেনদেনের জন্য গ্রাহকের কাছ থেকে মাসুল নেবে। তবে এক-পের জন্য ভিসা, মাস্টার কার্ড, রকেট, কিউক্যাশসহ অন্যান্য কার্ড ও অনলাইন পেমেন্টের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা থাকছে। ই-কমার্স বা যেকোনো বাণিজ্যিক পেমেন্টে যে দুই বা আড়াই শতাংশ ফি দিতে হয়, সেটা এক-পের ক্ষেত্রে অনেক কম হবে।

আসছে কবে?

এটুআই জানিয়েছে, ১৬ ডিসেম্বরে চালু হবে এক-পে। তবে আনুষ্ঠানিক এই উদ্বোধনের পর সীমিত পরিসরে সেবা পাওয়া যাবে। যথাযথ পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর নতুন বছরের শুরুর দিকে চালু হবে পুরোদমে। সেবা নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়লে সহায়তার জন্য গ্রাহকরা ১৩৪৫ নম্বরে কল দিতে পারবেন।

এক-পে উদ্যোগটির প্রধান এটুআইয়ের ডিজিটাল ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের প্রগ্রাম ম্যানেজার মো. তহুরুল হাসান জানান, ‘কারিগরি দিক থেকে চিন্তা করলে কাজটি অনেক জটিল। অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাদের। এখন অপেক্ষা গ্রাহক অভিজ্ঞতার। তবে সরকারি উদ্যোগ হওয়ায় ডিলার, ব্যাংকসহ বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাড়া পাওয়া গেছে।’

এক-পে চালু হলে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন তিনি।

মন্তব্য