kalerkantho

শনিবার  । ১৯ অক্টোবর ২০১৯। ৩ কাতির্ক ১৪২৬। ১৯ সফর ১৪৪১                     

লেখার ফন্ট তৈরির গল্প

কম্পিউটারের নিজস্ব ভাষা তো আছেই। কিন্তু কম্পিউটারে লেখার জন্য আছে আলাদা ভাষা। লেখার ফন্ট তৈরি করার জন্য আছে কায়দা-কানুন। কিভাবে বানানো হয় কম্পিউটারে লেখালেখির ফন্ট। বিস্তারিত এস এম তাহমিদের কাছে

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



লেখার ফন্ট তৈরির গল্প

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

ফন্ট তৈরির প্রয়োজনীয়তা

হাতের লেখার মতো একটি ফন্ট হতে পারে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয়ের মাধ্যম। প্রতিটি প্রকাশনা চেষ্টা করে তাদের নিজস্ব ফন্ট ব্যবহার করতে, অনেক বিখ্যাত লেখকও তাঁদের লেখার জন্য বিশেষ ফন্ট ব্যবহার করে থাকেন। ফন্টের আদল বলে দেয় লেখার উদ্দেশ্য। যেমন—রাউন্ডেড, বেশ স্পেসসমৃদ্ধ ফন্ট ব্যবহার করা হয় দৈনন্দিন লেখার জন্য, জ্যামিতিক ফন্ট ব্যবহৃত হয় লোগো বা ট্রেডমার্ক প্রিন্টের জন্য, মনোস্পেস সুন্দর মানিয়ে যায় কম রেজল্যুশনের ডিসপ্লেতে। কমিক স্যানস যেখানে ছোটদের স্কুলের কাজের বাইরে ব্যবহার বেমানান, সেখানে টাইমস নিউ রোমান ছাড়া প্রফেশনাল অফিস ডকুমেন্ট চিন্তাই করা যায় না। ভাষার অন্যতম অঙ্গ হরেক রকম ফন্ট।

 

কেমন হবে ফন্ট?

প্রতিটি ফন্টের রয়েছে নিজস্ব কিছু ব্যবহার, সেটিকে সেটা মাথায় রেখে নকশা নির্ধারিত হয়ে থাকে। অনেক ফন্ট ব্যবহার হয় আবেগ বোঝানোর জন্য, কিছু ফন্ট পেশাদারি কাজে, আবার কিছু ফন্ট শুধুই লোগোতে ব্যবহারের জন্য নকশা করা হয়ে থাকে। অতএব ফন্ট কী কাজের জন্য ব্যবহৃত হবে তার ওপর নির্ভর করেই শুরু হয় ফন্ট নকশা করার কাজ। এরপর নির্ধারণ করা হয় ফন্টটি কী ঘরানার হবে, বড় বড় অক্ষরে লেখা শিরোনামের জন্য, নাকি লম্বা লেখার কাজে? তার ওপর ফন্টের মূল চেহারার পুরোটাই নির্ভর করে। কিংবা হাতের লেখা বা আঁকা ছবির মতো হবে, নাকি কম্পিউটারে নকশা করা জ্যামিতিক আকার দেওয়া হবে ফন্টের। এসব শুরুতেই নির্ধারণ করা হয়।

 

ডিজাইনের শুরু

ফন্ট ডিজাইনের শুরু কাগজে-কলমে। গ্রাফপেপার বা ট্রেসিং পেপার ব্যবহার করে অনুপাত ধরে রেখে একটি একটি করে অক্ষরের ডিজাইন বা নকশা কাগজে করা হয়ে থাকে। প্রতিটি অক্ষর আলাদাভাবে নকশা না করলেও চলে, অল্প কিছু মূল অক্ষর নকশা করা হয়ে গেলে সেগুলোর ওপর ভিত্তি করে বাকি অক্ষরের নকশা সরাসরি পিসির সফটওয়্যারেই করা সম্ভব। তবে এ পর্যায়ের নকশার সঙ্গে সর্বশেষ নকশার তেমন মিল না-ও থাকতে পারে। হাতে-কলমে ডিজাইন শেষ করার পর সেটি স্ক্যান করে বা ডিজিটাল পেন-ট্যাবলেটের মাধ্যমে পিসিতে সেটির ডিজিটাল সংস্করণ তৈরি করা হয়। বাকি কাজ সরাসরি পিসিতে ডিজাইন সফটওয়্যারের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে।

 

সফটওয়্যার বাছাই

বেশির ভাগ গ্রাফিক ডিজাইনের মতো ফন্ট ডিজাইনও সহজেই এডোবি ইলাস্ট্রেটর বা ইন-ডিজাইনে করা সম্ভব। তবে ফন্ট ডিজাইনের জন্য বিশেষ ধরনের সফটওয়্যার ব্যবহার করাই সুবিধাজনক। যেমন গ্লিফস, ফন্টল্যাব স্টুডিও বা রোবোফন্ট। এসব সফটওয়্যার ব্যবহার করে শুধু ফন্ট ডিজাইন করাই নয়, ফন্ট সরাসরি লেখালেখির কাজে ব্যবহার করে পরীক্ষা করার সুবিধাও দেওয়া হয়েছে। ফন্ট ডিজাইনের অন্যতম চ্যালেঞ্জ, প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে অন্যান্য অক্ষরের সামঞ্জস্য ঠিক রাখা। এ ছাড়া ফন্ট যাতে বোল্ড, ইটালিক বা বিভিন্ন সাইজে ব্যবহারের সময়ও অক্ষরগুলোর মধ্যে দূরত্ব সঠিক থাকে, সেটিও ডিজাইন পর্যায়ে ঠিক করতে হয়। সে ক্ষেত্রে প্রতিটি অক্ষর ডিজাইনের সময়ই পরীক্ষা করা খুবই জরুরি।

 

ডিজাইন পরীক্ষা

প্রাথমিকভাবে কিছু মূল অক্ষর ডিজাইন করার পরের ধাপ সেটি পরীক্ষা করে দেখা। এ ক্ষেত্রে ফন্ট ডিজাইন সফটওয়্যারের পাশাপাশি এডোবি ইনডিজাইনও বেশ কাজের। বিশেষ করে টেক্সট ফ্রেম ফিচার ব্যবহার করে প্রতিটি অক্ষর ও অন্যান্য চিহ্নের মধ্যে সামঞ্জস্য ঠিক আছে কি না তা সহজেই যাচাই করা সম্ভব। আলাদা আলাদা অক্ষর ডিজাইনের সময় সেগুলো সুন্দর লাগলেও, অনেক সময় অক্ষরগুলো মিলিয়ে শব্দ তৈরি করলে বা লাইনের পর লাইন লেখার সময় সেটি বেমানানও লাগতে পারে। বিশেষ করে শব্দের মধ্যে দূরত্ব, লাইনের মধ্যকার স্পেস ঠিক করা খুবই সময়সাপেক্ষ কাজ, যা করার জন্য ইনডিজাইনের প্রয়োজন। এ পর্যায়ে অন্যান্য ফন্টের সঙ্গে মিলিয়ে পরীক্ষা করা হয়, যাতে কোনোভাবেই নতুন ফন্টটির মধ্যে বেমিল বা উঁচু-নিচু অক্ষরের অবস্থান না থাকে।

 

প্রিন্ট করে দেখা

কম্পিউটার মনিটরে ফন্ট দেখতে যেমন, প্রিন্টের পর কাগজে তা সম্পূর্ণ অন্য রকম দেখাতে পারে। তাই প্রিন্ট করে দেখাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ছোটখাটো অসামঞ্জস্য সহজেই প্রিন্ট করা কাগজ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ধরা সম্ভব। বিশেষ করে অনেকগুলো লাইন একসঙ্গে প্রিন্ট করার পর তা দূর থেকে দেখে আন্দাজ করা সম্ভব, সেটি দেখতে পলিশ করা লাগছে কি না। এ ছাড়া ফন্ট তৈরির প্রতিটি পর্যায়ের একটি করে ডিজাইন প্রিন্ট সঙ্গে থাকলে ফন্টের ডিজাইন বিবর্তন সহজেই ফুটিয়ে তোলাও সম্ভব।

 

বিভিন্ন স্টাইল পরীক্ষা

একটি ফন্ট বেশ কয়েক প্রকারে ব্যবহার হতে পারে। শেরিফ, স্যান্স শেরিফ, মনোস্পেস, মডার্ন বা ওল্ড স্টাইল—প্রতিটি ক্ষেত্রে একই ফন্টের মধ্যে অক্ষর মোটা বা চিকন, আরো জ্যামিতিক ডিজাইন বা কিছুটা রাউন্ডেড করে বিভিন্ন অবস্থায় সেটি ব্যবহার হতে পারে। সাধারণত ফন্ট ডিজাইনের সময় প্রতিটি স্টাইলের জন্য আলাদা করে ফন্ট ডিজাইনের প্রয়োজন হয়, বারবার পরীক্ষার মাধ্যমেই সেটি সঠিক আকৃতিতে নিয়ে আসা সম্ভব।

 

অন্যান্য ভাষা ও চিহ্ন ব্যবহার

ইউনিকোডের কল্যাণে প্রতিটি ফন্ট একাধিক ভাষা সমর্থন করতে পারে। লাতিন ভাষার বাইরেও আরেকটি ফন্টকে রুশ এলাকার সিরিলিক কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার দেবনগরী স্টাইলও সমর্থন করতে হয়। প্রচুর ইংরেজি ফন্টের মধ্যেই দেওয়া থাকে তার বাংলা সংস্করণ। সেটিও ফন্ট ডিজাইন পর্যায়েই করতে হয়, অন্যান্য ভাষার অক্ষরের আকৃতি অনুযায়ী ডিজাইনটির নতুন রূপ তৈরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার নানা প্রকার চিহ্নও ফন্টের মধ্যেই রাখতে হবে, যাতে লেখার সময় সামঞ্জস্য কোনোভাবেই নষ্ট না হয়ে যায়।

 

প্রকাশ

ফন্ট তৈরির সফটওয়্যারে সব কাজ শেষ হওয়ার পর তা ট্রু-টাইপ ফন্ট বা টিটিএফ আকারে প্রকাশ করা হয়ে থাকে। কী ধরনের কাজে ফন্টটি ব্যবহার হবে, তার ওপর নির্ভর করে তার এনকোডিং ঠিক করা যেতে পারে। আগে অ্যানসি বা আইএসও এনকোডিং ব্যবহার করে ফন্ট প্রকাশ করা হতো, যার মধ্যে শুধু লাতিন গোত্রের ভাষা আর অল্প কিছু চিহ্ন ছাড়া কোনো অক্ষর যুক্ত করার উপায় ছিল না। এখনো পুরনো ডিভাইসের জন্য অ্যানসি ফন্টের প্রয়োজন হয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ফন্ট প্রকাশ করা হয় ইউনিকোড ইউটিএফ-৮ এনকোডিং ব্যবহার করে, যার মধ্যে বিশ্বের প্রায় সব ভাষার সমর্থন পূর্ণাঙ্গভাবে দেওয়া হয়ে থাকে।

 

বাংলা ফন্ট নিয়ে যারা কাজ করছে

বাংলা ভাষার জন্য বিভিন্ন ফন্ট তৈরি নিয়ে কাজ করে বেশ নাম কামিয়েছে একুশে প্রজেক্ট এবং অমিক্রন ল্যাবস। অমিক্রন ল্যাবস ইউনিকোডে বাংলা লেখার অনবদ্য সফটওয়্যার অভ্রের সঙ্গে ব্যবহারের জন্য বেশ কিছু ইউনিকোড ফন্ট যুক্ত করে দেয়। এসবের বেশির ভাগ তৈরি হয় একুশে প্রজেক্টের মাধ্যমে। এ ছাড়া ম্যাকে বাংলা লেখার জন্য একটি ফরম্যাটের ফন্ট নিয়ে কাজ করেছে অঙ্কুর প্রজেক্ট।

ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাংলা ফন্ট নিয়ে গবেষণা ও চর্চা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাফিক ডিজাইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও ‘যায়যায়দিন’ ফন্টের উদ্ভাবক মাকসুদুর রহমান, ‘রাজন শৈলী’ ফন্টের উদ্ভাবক মো. মুহিববুর রহমান রাজন, ‘রবি’ ফন্টের উদ্ভাবক মোহাম্মদ নাজিম-উদ-দৌলা এবং ‘চারু চন্দন’ ফন্টের উদ্ভাবক চন্দন আচার্য। 

প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিভিন্ন প্রয়োজনে বিনা মূল্যের এবং প্রিমিয়াম বাংলা ফন্ট তৈরির জন্য সাম্প্রতিক সময়ে কাজ করছে বাংলা ফন্ট লাইব্রেরি, বেঙ্গল ফন্টসসহ অন্যান্য প্রজেক্ট। বেশ কিছু পত্রিকা ও অনলাইন পোর্টালও নিজস্ব ফন্ট ব্যবহার করছে শুধু নিজেদের পরিচয় তুলে ধরার জন্যই নয়, পাইরেসি ঠেকানোর জন্যও।

 

মোস্তাফা জব্বারের ‘বিজয়’

কম্পিউটারে বাংলা ভাষার ইতিহাস তৈরি করা বিজয় কি-বোর্ড আর সুতন্বী ফন্টের গল্পের ক্যানভাস অনেক ব্যাপক। দু-একটি কথায় বলে ফেলা মুশকিল।

নানা কার্যক্রম ও ঘটনার পর ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে ফন্ট তৈরিতে হাত দিই। সে মাসেই প্রথম ফন্ট তৈরি হলো ‘আনন্দ’। বাংলার প্রথম মৌলিক ফন্ট। আনন্দপত্রে প্রথম এই ফন্ট ব্যবহার। এরপর দৈনিক আজাদ, দৈনিক দেশ, বাংলার বাণীসহ সবাই ব্যবহার করতে থাকে। ১৯৮৮ সালে এই আনন্দ ফন্ট হয়েছে সুনন্দা, সুনন্দা থেকে সুতন্বী।

প্রায় দুই বছরের গবেষণা ও প্রচেষ্টার পর তৈরি করলাম বাংলা কি-বোর্ড। ১৯৮৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর আত্মপ্রকাশ করল ‘বিজয়’। বাংলা লেখার প্রথম মৌলিক কি-বোর্ড হলো এই ‘বিজয়’।

প্রথমে ৪৫৪টি সিসার হরফে বাংলা লেখা হতো। সেগুলোকে মাত্র ৫৫টি হরফে আনলাম। ঘটল কম্পিউটারে বাংলা টাইপিংয়ের নতুন ইতিহাস। আগে মিনিটে বাংলা অক্ষর টাইপ করা যেত মাত্র ২০টি। বিজয়ের ফলে সেটি ৬০টিতে গিয়ে ঠেকে।

তখন ম্যাকিনটোস কম্পিউটারে পত্রিকা ও ফন্ট করেছিলাম। কেবল কম্পিউটারেই বাংলা ফন্ট তৈরির সুযোগ ছিল। ১৯৯৩ সালে উইন্ডোজ এলে উইন্ডোজের বাংলা সফটওয়্যারও তৈরি করলাম।

 

অনুলিখন

আল আমিন দেওয়ান

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা