kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৮ জুলাই ২০১৯। ৩ শ্রাবণ ১৪২৬। ১৪ জিলকদ ১৪৪০

আসছে ব্লকচেইন

২০১৯-২০ অর্থবছর থেকেই পরীক্ষামূলকভাবে ‘ব্লকচেইন’ প্রযুক্তি চালুর ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। বাংলাদেশের জন্য নতুন এই প্রযুক্তি সম্পর্কে জানাচ্ছেন এস এম তাহমিদ

২২ জুন, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আসছে ব্লকচেইন

২০১৭-১৮ সালে বিটকয়েনের মূল্য হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়ার পর গণম্যাধ্যমে বিটকয়েন ও ব্লকচেইনের সংবাদ আসতে শুরু করে। এরপর নানাবিধ কাজে ব্লকচেইন প্রযুক্তি কাজে লাগানো হচ্ছে বা হবে—এমন ঘোষণাও দেখা গেছে। অথচ ব্লকচেইন কী, বিটকয়েনের সঙ্গে এর সম্পর্ক কী বা কেনই বা ব্লকচেইন দুনিয়া বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে, অনেকের কাছেই তা পরিষ্কার নয়।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, বিটকয়েন আর ব্লকচেইন এক নয়। ব্লকচেইন একধরনের তথ্য সংরক্ষণ এবং লেনদেনের লেজার, যা ব্যবহার করে বিটকয়েন লেনদেনের হিসাব রাখা হয়। বিটকয়েন ছাড়াও অন্যান্য তথ্য সংরক্ষণ, বিশেষ করে লেনদেনের তথ্য রেকর্ড করার এক অনন্য প্রযুক্তি ব্লকচেইন। ২০১৮ সালে ভোট গ্রহণের কাজেও ব্লকচেইন কাজে লাগিয়েছিল আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিয়ন।

 

যেভাবে কাজ করে ব্লকচেইন

অন্যান্য ডাটা বেইসের মতো ব্লকচেইনেও রেকর্ড হিসেবে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিটি রেকর্ডকে বলা হয় ব্লক। প্রতিটি ব্লকে তথ্যের সঙ্গে পূর্ববর্তী ব্লকের ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ এবং টাইম স্টাম্প যুক্ত করা থাকে, পাশাপাশি আরো থাকে ট্রানজেকশন ডাটা। ‘ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ’ হচ্ছে, একটি ব্লক তৈরির পর তার বিশেষত্বগুলো নিয়ে তৈরি করা একটি কোড। কোনো কারণে যদি ব্লকটিতে পরিবর্তন করা হয়, তাহলে তার ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশও বদলে যায়। ব্লকে থাকা রেকর্ড কোন ব্যক্তি কখন যুক্ত বা পরিবর্তন করেছেন তা দেওয়া থাকে টাইম স্টাম্প এবং ট্রানজেকশন ডাটায়। আর ব্লকগুলো পরস্পরের সঙ্গে মিলে তৈরি হয় ‘ব্লকচেইন’। তথ্যের পরিমাণ যত বাড়বে, চেইনে তত বেশি ব্লক যুক্ত হবে। চেইনে প্রয়োজনে অসীম সংখ্যক ব্লকও যুক্ত করা সম্ভব।

যখন ব্লকচেইনের তথ্য কোনো ব্যবহারকারী দেখবেন বা পরিবর্তন করতে চাইবেন, তখন তাঁর কাছে পুরো চেইনটিই পাঠানো হবে। এভাবে কোনো কেন্দ্রীয় সার্ভার ছাড়া শুধু ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে অগণিত কপি সংরক্ষণের মাধ্যমে ব্লকচেইন টিকে থাকতে পারে। এ ধরনের সার্ভারবিহীন তথ্য সংরক্ষণ ও আদান-প্রদানের উপায়কে বলা হয় ‘পিয়ার টু পিয়ার নেটওয়ার্কিং’।

পুরো চেইনের প্রতিটি কপি যে ডিভাইসগুলোতে আছে, তাকে বলা হয় ‘নোড’। প্রতিবার নতুন ব্লক যুক্ত বা পরিবর্তন হলে প্রতিটি নোডেই সঙ্গে সঙ্গে তা আপডেট করা হবে। ফলে নতুন তথ্য প্রত্যেক ব্যবহারকারীর কাছে পৌঁছে যাবে নিমেষেই।

 

ব্লকচেইনের মূল শক্তি ও দুর্বলতা

ব্লকচেইন এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যে এর মধ্যে থাকা কোনো তথ্য গোপনে পরিবর্তন করা যায় না। প্রতিটি পরিবর্তনে ব্লকের ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ বদলে যাবে। ফলে চেইনে থাকা অন্য ব্লকে সংরক্ষিত হ্যাশের সঙ্গে তা মিলবে না। এ ছাড়া ব্লকে পরিবর্তন করলেই সেটি কে কবে কখন কোন ডিভাইস থেকে করেছে, তার পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড ব্লকে রাখতেই হবে। কোনো ব্লক ডিলিট করে দিলে চেইনটি পুরোটাই অকার্যকর হয়ে যাবে। ফলে ভুয়া তথ্য বা কোনো ধরনের জালিয়াতি ব্লকচেইনে করা সম্ভব নয়।

আবার যেহেতু ব্লকচেইনের কোনো অংশ আলাদা করে দেখার উপায় নেই, দেখতে হলে ব্যবহারকারীকে পুরো চেইন ডাউনলোড করতে হয়, তাই বাকি চেইনে কোথায় কী তথ্য আছে, তা সহজেই দেখা সম্ভব। চাইলেও তাই ব্লকচেইনে কোনো লুকানো তথ্য রাখা যায় না। যে কারণে ভোটের তথ্য, ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের তথ্য বা সবার জন্য উন্মুক্ত তথ্যভাণ্ডার তৈরি করার জন্য ব্লকচেইন এক আদর্শ প্রযুক্তি।

ঠিক একই কারণে ব্লকচেইনের বেশ কিছু দুর্বলতাও আছে। যেহেতু চেইনগুলো প্রত্যেক ব্যবহারকারীর জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত, তাই তথ্যের গোপনীয়তা বজায় রাখতে হলে খুব বাছাই করে ব্যবহারকারীদের প্রবেশাধিকার দিতে হয়। এ ছাড়া তথ্য প্রবেশ করানো, পরিবর্তন বা মুছে ফেলার সঠিক রেকর্ড ব্লকচেইন রাখলেও ব্যবহারকারীর লগইন পাসওয়ার্ড চুরি করে যে কেউ ভুল তথ্য প্রবেশ করাতে পারবে। তাই ব্লকচেইন ব্যবহারকারীদের নিজেদের ডিভাইস ও লগইন নিয়ে বেশ সতর্ক থাকতেই হবে।

 

ক্রিপ্টোকারেন্সি কী

‘ক্রিপ্টোকারেন্সি’ সহজ ভাষায় ‘ডিজিটাল মুদ্রা’। বাজারে চালু প্রতিটি ক্রিপ্টোকারেন্সি মূলত একেকটি গাণিতিক সংকেত। ক্রিপ্টোকারেন্সি চাইলেও নকল করা যায় না।

এক ব্যবহারকারী যখন ক্রিপ্টোকারেন্সি তাঁর ওয়ালেটে রাখবেন, তখন সে ডাটাটুকু শুধু তাঁর ওয়ালেটেই থাকবে। ফলে অন্য কোনো ব্যক্তি চাইলেও কারেন্সি লেনদেনে একই ডাটা ব্যবহার করতে পারবেন না।

‘বিটকয়েন’ বিশ্বের প্রথম জনপ্রিয় ক্রিপ্টোকারেন্সি। এ ছাড়া ‘মনেরো’, ‘লাইটকয়েন’ এবং অন্য আরো অনেক ক্রিপ্টোকারেন্সিও বর্তমানে লেনদেনে ব্যবহার হচ্ছে। ক্রিপ্টোকারেন্সি যেহেতু কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে না, তাই তার মূল্য সরাসরি বাজারের চাহিদা এবং সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল। আবার কোনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক না থাকায় ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজারে কেউ চাইলেও হস্তক্ষেপ করতে পারে না।

 

ব্লকচেইন ও ক্রিপ্টোকারেন্সি

বিটকয়েনের সঙ্গে ব্লকচেইন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বিটকয়েন লেনদেনের হিসাব রাখার জন্যই ব্লকচেইন প্রযুক্তি তৈরি করা হয়েছিল। অন্য ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবস্থাগুলোও ব্লকচেইনের মাধ্যমেই ট্রানজেকশনের হিসাব রাখে। কিন্তু ব্লকচেইন আর ক্রিপ্টোকারেন্সি এক নয়।

 

দেশি ব্যবহার

নতুন বাজেটে ডিজিটাল মুদ্রাব্যবস্থা ও ব্লকচেইন প্রযুক্তি চালু করার ঘোষণা এসেছে। আগামী ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রযুক্তিটির ব্যবহার পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করার কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল।

বিশ্বজুড়ে তথ্য আদান-প্রদানের অপরিবর্তনীয় ও নিরাপদ মাধ্যম হয়ে উঠেছে ব্লকচেইন। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশেও ব্লকচেইন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করার সময় এসেছে।

ব্লকচেইন নিয়ে অনেক দিন ধরেই কাজ করছে দেশীয় প্রতিষ্ঠান ‘ই-জেনারেশন’। কম্পানিটির চেয়ারম্যান শামীম আহসান বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক প্রযুক্তিতে ব্লকচেইন একটি উন্নয়নশীল জাতির অর্থনৈতিক অবস্থা পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে।’

দুই বছর আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে এই ব্লকচেইন সেবা দিয়ে আসছে ই-জেনারেশন। এ ছাড়া অল্পসংখ্যক আরো কিছু প্রতিষ্ঠানও রয়েছে, যারা ব্লকচেইনের ওপর দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলছে। 

 

ভবিষ্যৎ

বিটকয়েন, লাইটকয়েন বা মনেরো—কোনো ক্রিপ্টোকারেন্সিই অর্থনৈতিক মূলধারায় প্রবেশ করতে পারেনি। সেটি সামনে বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা ফেইসবুকের মতো বড় প্রতিষ্ঠানও এবার ক্রিপ্টোকারেন্সির বাজারে প্রবেশ করতে চাচ্ছে। তাদের কারেন্সি বিশ্বের বড়সড় প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করার জন্য এর মধ্যেই রাজিও হয়েছে। ব্লকচেইন বিশ্বের সব ডাটা বেইসে ব্যবহার করার জন্য প্রস্তাবনা করা হয়েছে।

ব্লকচেইনের সবচেয়ে বড় শক্তি, ডাটা বেইসে টেম্পারিং সম্ভব নয়। সেটি ব্যবহার করে সাধারণ নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে খোদ যুক্তরাষ্ট্র। তাদের দাবি, ব্লকচেইনের নিরাপত্তায় ভোট নেওয়া যাবে ফোন থেকেও। আর সে ভোট চুরিও করা যাবে না। আগামী দিনগুলোতে ব্লকচেইন বদলে দেবে অনেক কিছুই। সরকারি ডাটা বেইস, ব্যাংকের লেনদেন থেকে শুরু করে কোনো কিছুই আর নাগালের বাইরে থাকবে না এর কল্যাণে। ফলে কমবে দুর্নীতি, তথ্য গোপন করে বা ডাটা বেইস টেম্পার করে তথ্য জালিয়াতি করা যাবে না।

ব্লকচেইনের মাধ্যমে লেনদেন করা হলে প্রয়োজন হবে না বাড়তি কোনো ফি। ফলে ব্যাংকিং খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ও যাবে অনেক কমে।

মন্তব্য