kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

আনন্দযজ্ঞ ভুবনজুড়ে

ড. কালিদাস ভক্ত

৪ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আনন্দযজ্ঞ ভুবনজুড়ে

শরতের আগমনে প্রকৃতি নানা বৈচিত্র্যে সাজে। মাঠে মাঠে ঘাসে ঘাসে শিশিরের নরম আলপনা। শিউলি ফুল ঝরঝর করে পড়ে শরতের আঙিনায়। ধানের ক্ষেতে কোমলতা-সরলতার প্রতীক হয়ে দামাল হাওয়া দোল খেয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

আকাশে মেঘের ভেলা উড়ে উড়ে চলে। অতি সুনীল আকাশের সাদা মেঘের ভেলার ছায়া পড়ে শান্ত-স্নিগ্ধ প্রকৃতিতে। তটিনীর তটে বিকশিত শুভ্র প্রাণের নয়নাভিরাম কাশফুল শুভ্রতার প্রতীক হয়ে চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। বনে বনে বিহগকুল আনন্দে-কলকাকলিতে মুখরিত করে। ভ্রমরেরা আলোর বন্যায় মেতে বেড়ায়। আকাশে বলাকা বেঁধে রাজহংসের দল শাঁইশাঁই আওয়াজ তুলে উড়ে চলে মানস সরোবরের পানে। বাংলার এই সৌন্দর্যময়  পরিবেশে, মায়াময় ক্ষণে নিশ্চয়ই কোনো শুভবার্তা শোনা যাবে। আমাদের প্রাণের দেবী মহামায়া এই মহাতিথিতে মর্তে অবতরণ করে করুণার আঁখি উন্মিলন করেছেন। তিনি সর্বশক্তিমান মাতৃরূপী দুর্গা। তবে তিনি নিরাকার হয়েও যেকোনো আকার ধারণ করতে পারেন। তিনি বিশ্বকার্যের জন্য অপ্রপঞ্চ থেকে প্রপঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি চিন্ময় জগৎ থেকে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের জন্য স্বেচ্ছায় সাকাররূপে পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছেন। তিনি শক্তির দেবী। মাতৃরূপী আদ্যাশক্তি মহামায়া। তিনি মহাজাগতিক শক্তির অধীশ্বরী। তিনি দুর্গতি নাশ করেন বলে তাঁকে দুর্গা বলা হয়। আবার তিনি দুর্গম নামের অসুরকে বিনাশ করেছেন, তাই তাঁর নাম দুর্গা। মার্কেণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত ‘শ্রীশ্রী চণ্ডী’ নামের গ্রন্থে দুর্গার আবির্ভাবের কাহিনি ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করা হয়েছে। পৃথিবীতে যখন খুব খারাপ অবস্থা বিরাজ করে, অশুভ শক্তির কাছে শুভ শক্তি পরাস্ত, সমাজে বিরাজ করে চরম বিশৃঙ্খলা, তখন দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালনের জন্য সব অশান্তি অরাজকতা দূর করে দেবী মহামায়া শান্তির আবাস নির্মাণ করেন।

সনাতন শাস্ত্রানুসারে দেবী দুর্গার আগমন ও গমনের বাহনের ওপর নির্ভর করে পৃথিবীবাসীর সুখ-শান্তি, দুঃখ-কষ্টের মাত্রা। এবার দেবী আসবেন গজে চড়ে। গজে করে আগমনের ফলে ফল-ফসলে ভরে যায় ধরণি। তবে মা যাবেন নৌকায় চড়ে। যার ফল খুব একটা ভালো হয় না। গত বছর দেবী ঘোড়ায় আগমনের ফলে পৃথিবীজুড়ে করোনার মতো রোগ মহামারি আকার ধারণ করেছে। আবার দোলায় গমনের ফলও ভালো হয়নি। এভাবে সঠিক বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করা গেছে। তবে তিনি মাতৃরূপা পরম দয়ালু। জগতের কল্যাণের জন্য, সন্তানের মঙ্গলের জন্য দুঃখ-ব্যথা লাঘব করবেন। তবে সে জন্য তাঁর পূজায়, তাঁর আরাধনায় রত হতে হয়। তাঁর আবির্ভাবের কাহিনিতে শ্রীশ্রী চণ্ডীতে এ রকম দৃষ্টান্ত প্রতিভাত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, সম্রাট আকবরের সময়ে ষোড়শ শতকের শেষের দিকে বর্তমান রূপের শারদীয় দুর্গাপূজা প্রচলিত হয়। বাংলায় দুর্গাপূজা সূচিত হয় উত্তরবঙ্গের রাজশাহী অঞ্চলের রাজা কংস নারায়ণের সময়ে। এ পূজা প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ব্রাহ্মণ পণ্ডিত রমেশ শান্ত্রী রাজাকে বলেছেন—‘কলির যুগে মহাযজ্ঞ হচ্ছে দুর্গোৎসব। এ অনুষ্ঠানে সকল যজ্ঞের ফল লাভ হয়। তাই আপনি দুর্গাপূজা করুন। ’ বেদে দেবী দুর্গার উল্লেখ আছে। রামায়ণে রামচন্দ্র ১০৮টি নীল পদ্ম দিয়ে দুর্গা দেবীর পূজার আয়োজন করেছিলেন এবং মহাভারতের ভীষ্ম পর্বে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে যুদ্ধারম্ভের পূর্বে জয়ের জন্য দুর্গাপূজার উপদেশ দিয়েছিলেন। সর্বপ্রথমে বসন্তকালে বাসন্তী দুর্গাপূজা হতো। রাজা সুরথ ও সমাধি বৈশ্য বসন্তকালে দুর্গাপূজা করেছিলেন।

দেবী দুর্গার আবাহনের মধ্য দিয়ে ধরামাঝে নারীর শক্তি প্রকাশ পায়। মনীষীরা দুর্গারূপেই নারীকে কল্পনার কথা বলেছেন। তাঁর পূজার মাধ্যমে নারীর ভূমিকাকে আরো বড় করে দেখানো হয়েছে। দেবী দুর্গাকে জগজ্জননীরূপে বন্দনা করার মাধ্যমে নারীকেও মাতৃরূপে রূপায়িত করা হয়েছে। দুর্গা মহিষাসুর বধকারী হিসেবে মহাশক্তি দিয়ে অপশক্তি অপসারিত করেছেন। এমনিভাবে দেবী দুর্গা সৃষ্টির প্রতীক, সমৃদ্ধির প্রতীক, সুরক্ষার প্রতীক। নারীও মাতৃরূপে সৃষ্টির প্রতীক, সন্তান জন্ম দিয়ে সন্তানের মুখে আহার তুলে দিয়ে সন্তানকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন। মহামহিমাময় নারী জগৎ সংসারে ভালোবাসা দিয়ে, প্রেরণা দিয়ে, শক্তি দিয়ে বিজয়ী করে পরিত্রাণ করছেন। এই মাতৃসম নারী যেন  বঞ্চনার শিকার না হন। সেই সঙ্গে খারাপ প্রবৃত্তির আক্রোশে শিকার হয়ে নারীরা যেন কলঙ্কিত না হন।

মহামায়া দেবী মহালক্ষ্মী, মহাসরস্বতী ও মহাকালী—এই তিন রূপে প্রকাশিতা। এভাবে দুর্গার অনেক নাম অনেক রূপ—মহিষাসুরমর্দিনী, মহামায়া, জয়দুর্গা, জগদ্ধাত্রী, শূলিনী, গন্ধেশ্বরী, কালী, তারা, ভুবনেশ্বরী, ভৈরবী, শাকম্ভরী, বনদুর্গা, কাত্যায়নী, বিপদনাশিনী ইত্যাদি রূপেও দুর্গা ভক্তজনের কাছে পূজিত হন। বছরে দুইবার দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। শরৎকালে ও বসন্তকালে। শরৎকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে দুর্গাপূজাকে শারদীয় দুর্গাপূজা বলে। বসন্তকালে অনুষ্ঠিত হয় বলে দুর্গাপূজাকে বাসন্তী দুর্গাপূজা বলে। তবে শারদীয় দুর্গাপূজা প্রসিদ্ধ। শারদীয় দুর্গাপূজা আশ্বিন মাসের  শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠী, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী ও দশমী পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী  অনুষ্ঠিত হয়। এ পূজা হিন্দুদের সবচেয়ে বড় পূজা এবং বড় ধর্মীয় উৎসব। এ সময় প্রকৃতি ও মানব মনে আনন্দের সাড়া পড়ে যায়। দুর্গাপূজার সময় মেলা অনুষ্ঠিত হয়। তবে ব্যাপকভাবে দশমীর দিনে ‘দশহরা’ নামে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবাই এই সর্বজনীন উৎসবে অংশগ্রহণ করে থাকেন। অন্যদিকে মহিষাসুর বধের মাধ্যমে সুরশক্তির বিজয় সূচিত হয় বলে দশমী বিজয়ের দিন। অন্যায়কে প্রতিহত করে ন্যায় প্রতিষ্ঠার দিন। সম্মিলিত শক্তির প্রকাশের মাধ্যমে ঐক্যের আহ্বানের দিন। মহত্তম গুণ প্রকাশে ধরাকে আনন্দধাম প্রকাশের দিন। সর্বোপরি মায়ের আবাহন হোক—অশুভ শুক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির প্রকাশ; বৈশ্বিক দুর্যোগ থেকে পরিত্রাণের উপায়; শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিপালনের আহ্বান; অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের প্রকাশ; সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অসাম্প্রদায়িকতার মেলবন্ধন; আত্মকেন্দ্রিকতা থেকে উদার ধারণার উন্মেষ; অসুরশক্তির বিরুদ্ধে সুরশক্তির জয়গান; দুঃখ-কষ্ট থেকে আনন্দের প্রকাশ—আজকের দিনে মায়ের সকাশে আকুল চিত্তের এই ব্যাকুল প্রার্থনা।

 

 লেখক : সহকারী অধ্যাপক, সংস্কৃত বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা