kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

শারদীয় দুর্গোৎসবের এক বর্ণাঢ্য পর্ব কুমারীপূজা

তারাপদ আচার্য্য

৩ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শারদীয় দুর্গোৎসবের এক বর্ণাঢ্য পর্ব কুমারীপূজা

সনাতন ধর্মের অন্যতম গ্রন্থ বেদ, পুরাণতন্ত্র ও ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক শাস্ত্রগ্রন্থগুলোয় যত প্রকার সাধনা, অনুভব ও অভিজ্ঞতা আছে; হিন্দু ধর্ম তার যুগ-যুগান্তরব্যাপী তত্ত্বান্বেষণের সুমহান ইতিহাসে যত দেব-দেবীর সাধনার প্রবর্তন করেছে দুর্গাপূজায় তার পূর্ণ সমন্বয় ঘটেছে। এই সমন্বিত দুর্গাপূজার অঙ্গপূজারূপে কুমারীপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বী ভক্তদের কাছে এক গভীর তত্ত্বের দ্বারোদঘাটন করেছে। দুর্গাপূজা, কালীপূজা, জগদ্ধাত্রীপূজা, অন্নপূর্ণাপূজা এবং কামাখ্যাদি শক্তিক্ষেত্রেও কুমারীপূজার প্রচলন আছে।

কুমারীপূজা শারদীয় দুর্গোৎসবের এক বর্ণাঢ্য পর্ব।

বিজ্ঞাপন

তান্ত্রিক মতে, কুমারীপূজা চলে আসছে স্মরণাতীত কাল থেকে। কিন্তু এই পূজার ব্যাপক পরিচিতি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছিল না। স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৮ সালের অক্টোবর মাসে ক্ষীরভবানীতে কুমারীপূজা করেন। ক্ষীরভবানী কাশ্মীরের এক অতি প্রাচীন দেবীপীঠ। যদিও স্বামীজির কাশ্মীর ভ্রমণে তাঁর সহযাত্রীদের মধ্যে মানসকন্যা নিবেদিতা ও শিষ্যা মিস ম্যাকলাউড ছিলেন, আর ছিলেন দুজন গুরুভাই। কিন্তু স্বামীজি এই সময় প্রায় একাকীই থাকতেন এবং ক্ষীরভবানীর প্রথা অনুযায়ী পূজা করে ‘পায়েস’ নিবেদন করতেন। সেই সঙ্গে প্রতিবারই একজন ব্রাহ্মণ শিশুকন্যাকে কুমারীজ্ঞানে পূজা করতেন। ভারতের অন্যতম শক্তিপীঠ কামাখ্যায় গিয়েও স্বামীজির কুমারীপূজা করার কথা জানা যায় সেখানকার পাণ্ডাদের পুরনো খাতা থেকে।

দেবী ভগবতী কুমারীরূপেই আখ্যায়িত। তাঁর কুমারীত্ব মানবীভাব বোঝা খুবই কঠিন। কারণ তিনি দেবতাদের তেজ থেকে সৃষ্টি। শিবের ঘরনি হয়েও তিনি কুমারী।

পণ্ডিত যোগেশচন্দ্র বিদ্যানিধি লেখেন, যুগাবতার শ্রীরামকৃষ্ণ কুমারীকে ভগবতীর অংশ বলেছেন। শ্রীমা সারদাদেবীকে ষোড়শীরূপে পূজা করা সেই ভাবেরই অংশ এবং এভাবে সাধনার শেষে শ্রীরামকৃষ্ণ ষোড়শীরূপিণী জগন্মাতার শ্রীচরণে তার সর্ববিধ সাধনার ফল সমর্পণ করেন। শক্তিসাধনার অন্যতম অঙ্গ কুমারীপূজা। ঋগ্বেদের দেবীসূক্তের ঋষি অম্ভৃণ-কন্যা বাক্ ছিলেন কুমারী। তিনি আদ্যাশক্তির সঙ্গে নিজেকে অভিন্ন উপলব্ধি করে ঘোষণা করেছিলেন, তিনি সমগ্র জগতের ঈশ্বরী এবং সমগ্র জগতের পিতারও প্রসবিতা। কুমারী কন্যা বাকের এই অসাধারণ উক্তি শক্তিসাধনার ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যবাহী। এই ধারারই আরেকটি অসাধারণ তাৎপর্যবাহী মন্ত্র তৈত্তিরীয় আরণ্যকের (১০। ২) দুর্গা-গায়ত্রী, যেখানে দুর্গাকে কন্যাকুমারীরূপে স্তুতি করা হয়েছে। তারপর চণ্ডীতে (দ্বিতীয় অধ্যায়ে) পেলাম মহিষাসুরমর্দিনীকে। মহিষাসুরমর্দিনী সব দেবতার তেজোসম্ভূতা। কাত্যায়নী দেবীও কুমারী। এই কন্যাকুমারী দুর্গাই প্রবল পরাক্রান্ত মহিষাসুরকে বধ করেন। ১৯০১ খ্রি. বেলুড়মঠে প্রথম দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং স্বামী বিবেকানন্দ ৯ জন কিশোরীকে কুমারীরূপে পূজা করেছিলেন।

কুমারী সম্পর্কে এসব প্রশস্তির দ্বারা এটাই বোঝা যায়, কুমারী দেবী ভগবতীর অতি সাত্ত্বিক রূপ। জগন্মাতা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্ত্রী হয়েও চিরকুমারী। সে জন্য প্রত্যেক শক্তিপীঠেই কুমারীপূজার রীতি প্রচলিত।

বর্তমানে রামকৃষ্ণ মিশনের দেশ-বিদেশের অনেক শাখায় শারদীয় দুর্গোৎসবে কুমারীপূজা হয়। শাস্ত্রীয় বিধান মতে, এক বছর বয়সী থেকে শুরু করে রজঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন বয়সী কুমারীকে দেবীরূপে পূজা করা হয়। আমাদের দেশে একজনকে একাধিকবার কুমারীপূজা করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। একেক বছর মেয়েদের একেক নামে পূজা করার বিধান রয়েছে। যেমন—এক বছরের কন্যার নাম সন্ধ্যা, দুই বছরের কন্যার নাম সরস্বতী, তিন বছরের কন্যার নাম ত্রিধামূর্তি, চার বছরের কন্যার নাম কালিকা, পাঁচ বছরের কন্যার নাম সুভাগা, ছয় বছরের কন্যার নাম উমা, সাত বছরের কন্যার নাম মালিনী, আট বছরের কন্যার নাম কুব্জিকা, ৯ বছরের কন্যার নাম কালসন্দর্ভা, ১০ বছরের কন্যার নাম অপরাজিতা, ১১ বছরের কন্যার নাম রূদ্রাণী, ১২ বছরের কন্যার নাম ভৈরবী, ১৩ বছরের কন্যার নাম মহালক্ষ্মী, ১৪ বছরের কন্যার নাম পীঠনায়িকা, ১৫ বছরের কন্যার নাম ক্ষেত্রজ্ঞা ও ১৬ বছরের কন্যার নাম অম্বিকা।

পূজার দিন সকালে পূজার জন্য নির্দিষ্ট কুমারীকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয় এবং ফুলের গয়না ও নানা ধরনের অলংকারে তাকে সাজানো হয়। পা ধুয়ে পরানো হয় আলতা, কপালে এঁকে দেওয়া হয় সিঁদুরের তিলক, হাতে দেওয়া হয় মনোরম পুষ্প। কুমারীকে মণ্ডপে সুসজ্জিত আসনে বসিয়ে তার পায়ের কাছে রাখা হয় বেলপাতা, ফুল, জল, নৈবেদ্য ও পূজার নানা উপাচার। তারপর কুমারীর ধ্যান করতে হয়। সাধারণত দুর্গাদেবীর মহাষ্টমী পূজা শেষে কুমারীপূজা হয়ে থাকে। অনেকের মতে, নবমী পূজার দিন হোমের পর কুমারীপূজা করার নিয়ম আছে। যাগ-যজ্ঞ-হোম—সবই কুমারীপূজা ছাড়া সম্পূর্ণ ফলদায়ী নয়। কুমারীপূজায় দৈব-ফল কোটি গুণ লাভ হয়। কুমারী পুষ্প দ্বারা পূজিতা হলে তার ফল পর্বতসমান। যিনি কুমারীকে ভোজন করান তাঁর দ্বারা ত্রিলোকেরই তৃপ্তি হয়। দেবী পুরাণ মতে, দেবীর পূজার পর উপযুক্ত উপাচারে কুমারীদের ভোজনে তৃপ্ত করাতে হবে।

মানুষ সাধারণত কামনার বশবর্তী, ভেদবুদ্ধিসম্পন্ন। এই দুর্জয় কামনাকে জয় করতে সর্বত্র মাতৃদর্শন ভাব অর্জন করতে প্রত্যেক নর-নারীর হৃদয়ে সব কুমারীতে দেবীবুদ্ধির জাগরণ হওয়া একান্ত আবশ্যক। পূজার আসনে উপবিষ্টা কন্যা বা কুমারী বিশ্বকন্যারই প্রতীক। মানবীয় কন্যাত্ব বা Universal Maidenhood-এর মধ্যে জগজ্জননীর পূর্ণতম অধিষ্ঠানের অনুভব মানবকল্যাণকামী ঋষিদের এক অভিনব অবদান।

 

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, সাধু নাগ মহাশয় আশ্রম, দেওভোগ, নারায়ণগঞ্জ



সাতদিনের সেরা