kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

অসাম্য ও ঐতিহ্য নির্ভরতায় যে বস্ত্রশিল্পের পতন

সৈকত ইসলাম

২ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



অসাম্য ও ঐতিহ্য নির্ভরতায় যে বস্ত্রশিল্পের পতন

একসময় বলা হতো, ভারতের বাণিজ্যলক্ষ্মী বাংলা। প্রাক-ব্রিটিশ যুগে এ কথায় আসলেই সে রকম কোনো ভুল ছিল না। আঠারো শতকে ভারতীয় পণ্যের অন্যতম আমদানিকারক ওলন্দাজদের আমদানি করা পণ্যের ৪০ শতাংশ যেত বাংলা থেকে। মূল্যের হিসাবে এই আমদানিমূল্য ছিল মোট মূল্যের ৫০ শতাংশেরও বেশি।

বিজ্ঞাপন

ওলন্দাজদের আগেও আরব ব্যবসায়ীদের পণ্যতালিকায় বাংলার পণ্য ছিল পছন্দের শীর্ষে। অথচ ইংরেজরা বাংলার প্রথম বিদেশি প্রভু না। তাদের আগে মোগল, পাঠান, তুর্কি—সবাই ছিল এক হিসেবে বিদেশি। ইংরেজদের ইংল্যান্ডে সম্পদপাচার আর মোগলদের দিল্লিতে সম্পদপাচারের মধ্যে খুব বেশি পার্থক্য তো আর নেই। কিন্তু সম্পদপাচারে পার্থক্য না থাকলেও সম্পদ সংগ্রহের ধরনে পার্থক্য ছিল। বাংলার পণ্য মূলত উৎপাদিত হতো তার গ্রামগুলোতে, বাংলা বারবারই বিদেশি শাসকদের নিয়ন্ত্রণে এলেও সেই শোষণের প্রভাব গ্রামাঞ্চলে সেভাবে পড়েনি, বাংলার গ্রামীণ কারিগররা ছিল বিদেশি প্রভাবমুক্ত। ফলে রাজনৈতিক শাসনের পটপরিবর্তন হলেও পণ্য উৎপাদন বা বহির্বিশ্বের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্য সম্পর্কের পরিবর্তন হয়নি। তাই মোগল বা মোগল-পূর্ব যুগে বাংলা ছিল বিদেশি বণিকদের কাছে স্বর্গরাজ্য।

তবে স্বর্গরাজ্যের চিত্রটাও অনেকটা একপেশে। যে বিদেশি পর্যটকরা এই স্বর্গরাজ্যের ছবি এঁকেছেন, তাঁদের সঙ্গী ছিলেন এ দেশে তাঁদের ব্যবসায়ী সহযোগী, জমিদার বা উচ্চ শ্রেণির সম্পদশালী আমলা। এই বণিক আর পর্যটকদের চোখে বাংলা ছিল তাই সীমাহীন সম্পদের খনি। এ ছাড়া বিদেশি পর্যটকরা লিখেছেন তাঁদের স্বদেশবাসীর জন্য। সেই লেখায় দারিদ্র্য বা সাধারণ মানুষের দুঃখ থাকলে সেটা তাঁদের দেশবাসীকে যতটা আকর্ষণ করবে, সম্পদের বর্ণনা করবে তাঁর চেয়ে বহুগুণ বেশি। আমাদের এখনকার ভ্রমণকাহিনির লেখকরা আমেরিকার স্ট্যাচু অব লিবার্টি বা হলিউডের বর্ণনা যতটা আনেন, নিউ ইয়র্কের কালো মানুষদের জীবন বা টেক্সাসে অবৈধ লাতিন আর মেক্সিকান অভিবাসীদের কথা ততটা না।  

ফলে ভাস্কো দা গামার সহযোগীরা ভেবেছিলেন, ভারতবর্ষে নেমে দেখবেন পথে-প্রান্তরে সোনা ছড়িয়ে আছে, তাঁরা শুধু কুড়িয়ে নেবেন। ঠিক এখন যেভাবে বাংলাদেশের কোনো গ্রামের এক যুবক ভাবেন ইউরোপ-আমেরিকার বাতাসে ডলার, পাউন্ডের ছড়াছড়ি। একবার পৌঁছতে পারলেই শুধু লুফে নিতে বাকি। যাদের ছবি দেখে এই মোহময়তা, তারা অতি ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে অঢেল সম্পদ কখনোই একটি সাম্য, সুষ্ঠু সমাজের প্রতিচ্ছবি নয়। বাংলাও এর ব্যতিক্রম ছিল না। সুলতান, মোগল বা নবাব আমলে বাংলার রাজনৈতিক অবস্থা কখনোই নিরবচ্ছিন্ন এমন পরিবেশ দেয়নি যে সেখানে তীব্র অসমতা হ্রাস পেতে পারে। বরং শাসনব্যবস্থা অসাম্যকেই উৎসাহিত করেছে। মোগল আমলের প্রথম দিকে বাংলা থেকে খাজনা আদায়ের হার ছিল মোট উৎপাদনের তিন ভাগের এক ভাগ, যা পরে দাঁড়ায় অর্ধেক। এ ধরনের খাজনা আদায়ের হার আর যা-ই হোক সাধারণ মানুষের জন্য সমৃদ্ধি আনতে পারে না। এই অসম সমাজে বাংলার পণ্য উৎপাদনের কারিগররা ছিল সমাজের অবহেলিত অংশ।

আজকের পোশাকশিল্পের মতো প্রাক-ব্রিটিশ যুগেও বাংলার প্রধান পণ্য ছিল বস্ত্র। আজকের তৃতীয় বিশ্বের পোশাক কারখানাগুলোকে বলা হয়ে থাকে sweat shop (যেখানে কম মজুরিতে কষ্টসাধ্য পরিবেশে কর্মীরা কাজ করেন)। মোগল বা নবাবি আমলেও বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে জড়িতদের মজুরি ছিল অতি নিম্ন পর্যায়ের, যা মূলত ছিল দৈনিক খোরাকি আর সামান্য কিছু অর্থ। এই নিম্ন মজুরি এখনকার মতো তখনো তৈরি করেছিল নিম্ন বাজারমূল্য। গুণগত মানের সঙ্গে এই নিম্ন বাজারমূল্য বাংলার বস্ত্রশিল্পকে বিশ্বের বাজারে এতই জনপ্রিয় করেছিল যে শুধু ভারত নয়, সতেরো-আঠারো শতকে সমগ্র এশিয়ার রপ্তানি পণ্যের মধ্যে বাংলার বস্ত্র ছিল শীর্ষ পণ্য। অথচ এই বিপুল চাহিদাও গ্রামীণ বস্ত্রশিল্পের সঙ্গে জড়িতদের অবস্থার সে রকম কোনো পরিবর্তন আনেনি বা এ খাতের কোনোরূপ উৎকর্ষও সাধিত হয়নি ।  

ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি যখন এ দেশে ব্যবসা করতে আসে, তখন তারা তাদের নথিপত্রে লিখেছিল, এ অঞ্চলের খাদ্যদ্রব্যের দামের সঙ্গে মসলিনের দাম ওঠানামা করে। কেননা তাঁতিরা কাপড় বিক্রি করে কোনো মতে বেঁচে আছেন এবং খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়লে মসলিনের দাম না বাড়ালে তাঁদের বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। ইবনে বতুতা তাঁর ভ্রমণকাহিনিতে লিখেছিলেন, দুই দিনারে বাংলার সবচেয়ে উত্কৃষ্ট বস্ত্র মসলিন পাওয়া যায়। সেই সময় মসলিন তৈরির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা পেতেন বস্ত্রমূল্যের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ অর্থাৎ এক দিনার, এটি ছিল সর্বোচ্চ মজুরি। কখনো মজুরি এর চেয়ে কমও হতো। এক দিনার বা মূল্যের ৫০ শতাংশ শুনতে ভালো লাগলেও এটি মনে রাখতে হবে, এই মসলিন তৈরি হতো সম্পূর্ণ হাতে। তখন কোনো যন্ত্র ছিল না এবং এই অতি সূক্ষ্ম কাজে দক্ষতার সঙ্গে সময়েরও প্রয়োজন হতো। একখণ্ড সূক্ষ্ম মসলিন তৈরিতে একজন ওস্তাদ তাঁতি, একজন সহকারী, একজন শিক্ষানবিশের প্রায় এক বছর সময় লাগত। অর্থাৎ তিনজন কারিগরের মিলিত আয় ছিল বছরে এক দিনার। ইবনে বতুতা যে সময় বাংলা ভ্রমণ করেছিলেন, তার অনেক পরে অষ্টাদশ শতকে এসেও একজন দক্ষ তাঁতি বছরে ১৫ থেকে ৩০ মণ চাল কেনার সমান অর্থ উপার্জন করতে পারতেন, যদিও সেই সময়ে বাংলার বস্ত্রপণ্যের চাহিদা বহির্বিশ্বে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছিল।    

একটি শিল্পের উৎকর্ষের জন্য সেই শিল্পে বিনিয়োগ প্রয়োজন। বাংলার বস্ত্রশিল্প অত্যন্ত লাভজনক হলেও সেই লাভের কোনো অংশই কখনো ওই শিল্প বা তার কারিগরদের পেছনে ব্যয় হয়নি। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী আর বিদেশি বণিকরা ছাড়া এই লাভের বড় উপকারভোগী ছিল দেশি দালাল-মুতসুদ্দি শ্রেণি, যারা অভূতপূর্ব লাভ করেছিল এই ব্যবসা থেকে। কিন্তু যে সোনা বা রুপা এই বাণিজ্যের মাধ্যমে আসত, তার কিছুই এই শিল্প বা শ্রমিকদের পেছনে ব্যয় তো হয়ইনি, এমনকি বাংলার সাধারণ মানুষও এর থেকে উপকৃত হয়নি। এই সোনা বা রুপার একটি অংশ চলে যেত দিল্লিতে রাজস্ব হিসেবে আর একটি অংশ স্থানীয় নবাব বা তাঁদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি বা দালাল-মুতসুদ্দি শ্রেণির তোশাখানা বা গোপন কুঠরি আর সিন্দুকে জমা হতো। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীও এই শিল্পের কম মজুরির সুবিধা দিয়ে তাদের কোষাগার সমৃদ্ধ করতেই ব্যস্ত ছিল, কিন্তু এই শিল্পের উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করতে আগ্রহী ছিল না। তাই অষ্টাদশ শতাব্দীর ষাটের দশকে বাংলার মসলিন তাঁতিরা যখন বছরে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ মণ চাল কেনার সমপরিমাণ অর্থ আয় করে কায়ক্লেশে জীবন যাপন করছিলেন, তখন ইংল্যান্ডে তুলাজাত শিল্পের বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটছিল, যার ফলাফল ছিল হারগ্রিভস স্পিনিং জেনি (১৭৬৭), ক্রস্পটনের মিউল (১৭৭৫), কার্বাইটের শক্তিচালিত তাঁতের (১৭৮৪) মতো প্রযুক্তি, যা পরের তিন-চার দশকের মধ্যেই ইংল্যান্ডের বস্ত্রশিল্পকে দাঁড় করিয়ে দেয়।    

আঠারো শতকের যে বস্ত্র ছিল ভারতবর্ষের প্রধান রপ্তানি পণ্য, উনিশ শতকে এসে সেই বস্ত্রই ইংল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষে আমদানি শুরু হয়। একটি ছোট পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। আঠারো শতকের শেষভাগেও ভারতবর্ষের রপ্তানি পণ্যের মধ্যে শতকরা ৫০ ভাগ ছিল বাংলার বস্ত্র আর ১৮১৪ সালে ইংল্যান্ড থেকে ভারতবর্ষে বস্ত্রপণ্যের আমদানি ছিল শতকরা ৬ ভাগ, যা ১৮২৮ সালে হয় ৫০ ভাগ এবং ১৮৬৩ সালে দাঁড়ায় ৬৩ ভাগ। অর্থাৎ একটি শীর্ষ রপ্তানি পণ্য কয়েক দশকের মধ্যে হারিয়ে গিয়ে পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে ওঠে। এ জন্য দায় দেওয়া হয় বিদেশি শক্তির দমননীতির, যে দমননীতির ফলে বাংলার তাঁতি ও বস্ত্র শ্রমিকরা স্বাধীনভাবে তাঁদের শ্রম ও তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করার স্বাধীনতা হারিয়েছিলেন; দায় দেওয়া হয় শিল্প বিপ্লবের সময় যে পরিবর্তন হয়েছিল সেই প্রযুক্তির; দায় আছে ব্রিটিশ শাসনের, যার ফলে ব্রিটেনে উৎপন্ন পণ্য শুল্ক সুবিধা নিয়ে উপমহাদেশের বাজারে সহজে প্রবেশ করতে পারে। এর সব কটিই সঠিক, কিন্তু নিজেদের শিল্পের উৎকর্ষ তৈরি না করে ঐতিহ্যনির্ভর হয়ে থাকার দায়ও কোনোভাবে এড়ানো যায় না।      

একটি শিল্প যদি বিনিয়োগের মাধ্যমে ক্রমে উৎকর্ষে না গিয়ে কেবল ঐতিহ্যনির্ভর হয়ে থাকে, তবে পরিবর্তনের মুখে সবার আগে মুখ থুবড়ে পড়ে তা। বাংলার ঐতিহ্যনির্ভর বস্ত্রশিল্পও শিল্প বিপ্লবের মতো অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সামনে টিকে থাকতে পারেনি। ইংরেজদের বিভিন্ন দমননীতি এই শিল্প ধ্বংস হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলেও একমাত্র কারণ ছিল না। যুগ যুগ ধরে একটি শিল্প শুধু তার ঐতিহ্য আর নিম্ন বাজারমূল্য দিয়ে টিকে থাকতে পারে না, বিরূপ পরিবেশ আর প্রতিযোগিতার মুখে তাকে ভেঙে পড়তেই হয়। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে ইতিহাস তার পুনরাবৃত্তি করতে ভুলবে না।  

লেখক : সরকারি কর্মকর্তা

[email protected]



সাতদিনের সেরা