kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

যেখানে হাসপাতালেরই চিকিৎসা দরকার

শফিক আশরাফ

১ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যেখানে হাসপাতালেরই চিকিৎসা দরকার

বাংলাদেশের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ জেলাগুলোর মধ্যে প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এই হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা ও চিকিৎসাসেবা নিয়ে যে তথ্যচিত্রগুলো পাওয়া যাচ্ছে, তা খুবই আশঙ্কাজনক। এমনিতেই উত্তরের মানুষ খুব সহজে ঘর ছেড়ে বের হতে চায় না, এমনকি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে হাতের কাছের কবিরাজ, হাতুড়ে ডাক্তার কিংবা পীর-ফকিরের কাছে চিকিৎসা নেন। এসবের বাইরে কখনো কোনো সচেতন মানুষের পরামর্শে যদি তারা রংপুর মেডিক্যাল কলেজ পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন, তাহলে তারা যে অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফেরেন তাতে তাদের মনে হতে পারে চিকিৎসাহীন অবস্থায় হয়তো মৃত্যুও ভালো ছিল।

বিজ্ঞাপন

মানুষের অমানবিক ও অমানুষিক রূপ দেখে যে অভিজ্ঞতা হয় তাতে মৃত্যুকেও তুচ্ছ মনে হতে পারে। হয়তো মায়ের মৃত্যুতে সন্তান কাঁদতে কাঁদতে বেহুঁশের মতো পড়ে আছে, তার কাছ থেকে ২০০ টাকা ঘুষের জন্য লাশ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখার খবরও পাওয়া গেছে। এই হাসপাতালের বেশির ভাগ টেস্টের যন্ত্রপাতি নষ্ট। নষ্ট না বলে অকেজো করে রাখা হয়েছে বলা উত্তম। কারণ হাসপাতালে টেস্টের যন্ত্রপাতি সচল থাকলে চিকিৎসাসেবা প্রার্থীর লাভ, কিন্তু সেবাদাতাদের পুরোটাই লস। বাইরে বিভিন্ন ক্লিনিকে টেস্ট করাতে পারলে লভ্যাংশের একটা বড় অংশ সেবাদাতাদের পকেটে চলে আসবে। এ রকম নগদ লাভ থেকে বঞ্চিত হতে কে যন্ত্রপাতিগুলোকে সচল রাখবে? এই হাসপাতালের এক ডাক্তার গল্পচ্ছলে আমাকে একবার বলেছিলেন, হাসপাতালে রোগী ঢোকার পর তাকে আর মানুষ হিসেবে গণনা করা হয় না, তাকে গণ্য করা হয় একটা সংখ্যা বা পণ্য হিসেবে। অসুস্থ মানুষকে নিয়ে অমানবিক ব্যবসার এই ভয়াবহ তথ্য আমাকে বিহ্বল করেছিল। বর্তমানে এই হাসপাতাল যে অসুস্থ, এই হাসপাতালের যে চিকিৎসা প্রয়োজন, সেই চিত্র উঠে এসেছে হাসপাতালের অসুস্থতা নিয়ে এক ডাক্তারের লিখিত অভিযোগনামা দেখে। নিজের কর্মস্থলে চিকিৎসা নিতে ডাক্তারের মাকে বিভিন্ন জায়গায় ভোগান্তির শিকার হতে হয়েছে, পদে পদে ঘুষ দাবি করা হয়েছে। এমনকি তিনি এই হাসপাতালের ডাক্তারের মা জানার পরও তারা তাঁকে রেহাই দেয়নি। ডাক্তারের অভিযোগনামা ভার্চুয়াল মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এই ঘটনা থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, এই হাসপাতালে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আসা সাধারণ রোগীরা কী রকম চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে। মানুষ যে এখানে শুধুই পণ্য বা একটা নম্বর এ বিষয়ে আর কোনো সন্দেহ নেই।

প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে যাচ্ছে চিকিৎসা নিতে। সেখানে আমি নিজেও বেশ কয়েকবার মাকে নিয়ে, কখনো নিজের জন্য চিকিৎসা নিয়ে এসেছি। চিকিৎসাব্যবস্থায় যে ভারত প্রভূত উন্নতি করে ফেলেছে কিংবা আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা দিচ্ছে ব্যাপারটা কিন্তু মোটেও সে রকম নয়। আমার মায়ের আইএলডি (ইন্টার ইস্টিসিয়াল লাঙ ডিজিজ) নামের এক দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের পালমোনারি মেডিসিনের বড় বড় অধ্যাপককে দেখিয়েছি, তাঁরা প্রত্যেকেই আলাদা করে হাজার হাজার টাকার টেস্ট করিয়েছেন, ব্যাপারটা এমন এক ডাক্তার আরেক ডাক্তারের টেস্ট, রিপোর্ট কোনোটাই দেখতে চান না বা বিশ্বাস করেন না কিংবা হয়তো টেস্টের লভ্যাংশের লোভ ছাড়তে পারেন না। ফলে একই রিপোর্ট ও রোগ শনাক্তের পরও আবারও টেস্ট করায়। আমার সামর্থ্য আছে আমি টেস্টগুলো সহজেই করিয়েছি, যাদের সামর্থ্য নেই তাদেরও এ রকম টেস্ট দেয় এবং গরু ও ভিটা বিক্রি করাতে অনেকটা বাধ্য করে। যাহোক, এরপর তারা ঘোষণা দেয় আমার মা আর তিন বছর বাঁচবেন। আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে, আমি মাকে নিয়ে ভারতের সিএমসি হাসপাতালে চলে যাই। তারা অল্প কিছু টেস্ট করে জানাল, আমার মায়ের আইএলডি হয়েছে। চেম্বারে বসেই আমার প্রায় সমবয়সী ডাক্তার অনলাইনে মেডিক্যাল বোর্ড বসিয়ে চিকিৎসাপত্র লিখল। আমি ডাক্তারকে খানিকটা অনুচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আমার মা কত দিন সারভাইভ করবে? আমার কথা শুনে ডাক্তার খানিকটা অবাক হয়ে আমাকে বলল, তুমি তো মুসলমান, তোমরা তো বিশ্বাস করো হায়াত-মউত তোমার আল্লাহর হাতে। তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন তোমার মা আর কত দিন সারভাইভ করবে! আমি মিন মিন করে বললাম, বাংলাদেশি ডাক্তার আমাকে বলেছে, আমার মা আর তিন বছর বাঁচবে। আমার কথা শুনে ডাক্তার তার ল্যাপটপের স্ক্রিন আমার দিকে ঘুরিয়ে বলল, দ্যাখো, তোমার মায়ের লাঙ প্রায় আশি পার্সেন্ট ড্যামেজ। আমরা চিকিৎসা করে তোমার মায়ের লাঙ আশি-পঁচাশি পাসের্ন্ট ভালো করে দেব। এক শ ভাগ কোনো দিনই ভালো হবে না। এই ১৫ পার্সেন্ট ড্যামেজ নিয়ে যত দিন সারভাইভ করতে পারে। সেখানকার চিকিৎসা নিয়ে আজ প্রায় সাত বছর ধরে আমার মা সারভাইভ করে যাচ্ছে। এ ঘটনায় প্রমাণিত হয় আমাদের ডাক্তারদের প্রফেশনালিজম ও মানবিকতার প্রচণ্ড ঘাটতি রয়েছে। ফলে এ দেশের লাখ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতমুখিতার জন্য দায়ী ডাক্তারদের প্রফেশনালিজমের ঘাটতি এবং চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায় সরকারের কঠোর নজরদারির অভাব।

সারা দেশে চিকিৎসার যে অব্যবস্থাপনা চলছে তার মধ্যে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ চূড়ান্ত অরাজকতায় তার কয়েক ধাপ এগিয়ে আছে। রংপুরের ক্লিনিক ব্যবসা জমজমাট, রংপুরের কোনো ক্লিনিকে কোনো যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকে না। রংপুরের ক্লিনিকগুলোতে উত্তরের হাজার হাজার অভাগা রোগী অনেক টাকা ব্যয় করে টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে দৌড়ায় হাসপাতালে অপেক্ষারত ডাক্তার-নার্সের কাছে। অথচ হাসপাতালের কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা যন্ত্রগুলো তাদের ট্যাক্সের টাকায় কেনা হয়েছে। পৃথিবীর আর কোনো দেশে জনসম্পত্তির এমন অপব্যয়, এমন অবহেলা হয় বলে আমার জানা নেই; বিশেষ করে হাসপাতালের মতো জরুরি খাতে। পৃথিবীর আর কোনো দেশের হাসপাতাল দালাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে এ রকম কোনো খবর আমার জানা নেই। কিন্তু বাংলাদেশের প্রান্ত উত্তরবঙ্গে অবস্থিত সবচেয়ে বড় চিকিৎসাকেন্দ্র দালাল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, টাউট-বাটপাড় হাসপাতাল শাসন করে, রোগীকে সেবার বদলে পণ্য হিসেবে গণনা করা হয়, এই হাসপাতালের ডাক্তারই হাসপাতালের টাউট-বাটপাড়ের খপ্পরে পড়ে হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে বাধ্য হয়! কাজেই এই হাসপাতাল যে বড্ড অসুস্থ, এই হাসপাতালের যে চিকিৎসা প্রয়োজন, সে বিষয়ে আমাদের আর কোনো সন্দেহ নেই। কাজেই রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।  

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা