kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

গোটা শিক্ষা কাঠামোর উন্নয়ন জরুরি

এ কে এম শাহনাওয়াজ

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



গোটা শিক্ষা কাঠামোর উন্নয়ন জরুরি

জীবন চলার পথে বঙ্গবন্ধুর খুনিরা মাঝে মাঝে আমার মানসভূমিতে দেখা দেয়। তখনই দারুণ ঘৃণায় ধিক্কার জানাই। স্পষ্ট হয়, কী ক্ষতিই না আমাদের করে গেছে এই কুলাঙ্গাররা। আমি জানি না বঙ্গবন্ধুর এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রকাশিত যাবতীয় লেখা ও বিভিন্ন সময়ে দেওয়া তাঁর বক্তৃতা আওয়ামী লীগের ছোট-বড় নেতাকর্মী কতটা পড়েছেন বা শুনেছেন।

বিজ্ঞাপন

পড়লে বা শুনলেও কতটা অনুধাবন করেছেন, অনুধাবন করলেও কতটা তাঁর আদর্শের অনুসারী হতে পেরেছেন! সন্দেহটা আমার বরাবরের মতোই রয়ে গেছে। কারণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণে যখন নানা স্খলন দেখি তখন স্পষ্ট হয় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এখানে অনুসরণ করা হচ্ছে না। বিশেষ করে আমাদের দেশের শিক্ষা ক্ষেত্রে যখন নানা অব্যবস্থাপনা তখন বঙ্গবন্ধুর খুনিদের চেহারা আবার দৃশ্যমান হয়। তখন যথারীতি ধিক্কার জানাই। দেখতে পাই বঙ্গবন্ধুর শিক্ষাভাবনা থেকে আমরা কতটা দূরে সরে গেছি।

বঙ্গবন্ধু দেশের শিক্ষাকাঠামোকে অবিমিশ্র রাখতে চেয়েছিলেন। রাজনীতির কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক আর শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করার প্রবণতা এই মহান মানুষটির জীবনকালে দেখা যায়নি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া জাতির সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই সরকারের দায়িত্বে এসে দ্রুত কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করেছিলেন। দেশের সব স্তরের শিক্ষা উন্নয়ন এই কমিশনের ভাবনায় ছিল। শিক্ষকের মানোন্নয়ন ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনীতির অক্টোপাসে আটকে ফেলতে চায়নি এই কমিটি। বঙ্গবন্ধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে বৈশ্বিক মানে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো পূরণ করতে চেয়েছিলেন প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের দিয়ে। সেখানে তিনি পণ্ডিত শিক্ষকদের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক চিন্তার খোঁজ রাখতে চাননি। গুণকেই কদর করতে চেয়েছিলেন। প্রথিতযশা শিক্ষাবিদদের আচার্য নিয়োগ দেওয়ারও চিন্তা ছিল। অর্থাৎ তিনি চেয়েছিলেন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি যাতে শিক্ষাঙ্গনে প্রাধান্য বিস্তার করতে না পারে। অবশ্য বঙ্গবন্ধুর আমলে শিক্ষক রাজনীতিতে নানা রং পরিচয় শুরু হয়নি। কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনে একটি দূরদর্শিতা ছিল। এখানে প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন এনে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের উপযোগী করে সমাজ গঠনমূলক একটি সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থার রূপরেখা ছিল। বঙ্গবন্ধু তাঁর চিন্তাকে বিলম্বিত করতে চাননি। তাই দেশে ফিরেই শিক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেন। এই লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই শিক্ষা কমিশন সুপারিশমালা প্রণয়ন করে।

বঙ্গবন্ধু ছাত্ররাজনীতির ভেতর থেকে বেড়ে উঠেছিলেন। তুখোড় ও জনপ্রিয় ছাত্রনেতা ছিলেন তিনি। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক ছিল পাকিস্তানি শাসকদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলনের যুগ। অমন বাস্তবতায় ছাত্র নেতাকর্মীরা ছিলেন দেশের জন্য নিবেদিত। লোভ-লালসা আর অন্যায় আচরণের সঙ্গে তাঁদের সংযুক্তি ছিল না। আইয়ুব খান এনএসএফ গঠন করে ছাত্রদের চরিত্র হননের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মতো সৎ নেতৃত্ব তাঁদের ছায়া দিয়ে রেখেছিলেন। ছাত্ররাজনীতির সেই কমনীয় রূপ ফিকে হয়ে যেতে থাকে স্বাধীনতা-উত্তরকালে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড ও বিএনপির উত্থানের পর ছাত্ররাজনীতির চারিত্রিক স্খলন ঘটা শুরু হয় জোরেশোরে। সুন্দরের পথে চালিত করার মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব দৃশ্যপট থেকে বিদায় নিতে থাকেন। এর পরের সব দলের জাতীয় রাজনীতির বিধায়কদের একমাত্র মোক্ষ হয়ে পড়ে যেভাবেই হোক ক্ষমতার দণ্ড হাতে নেওয়া। এ জন্য জনগণের মনোরঞ্জন করার মতো অতটা ধৈর্য যেন কারো নেই। তাই তাঁরা নানা জায়গায় শক্তির বলয় তৈরি করতে থাকেন। এর মধ্যে বড় শক্তিকেন্দ্র হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। শুধু ছাত্রদের আদর্শচ্যুত করেই ক্ষান্ত হননি নেতানেত্রীরা। শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষমতার রাজনীতি ঢুকিয়ে দিয়ে গোটা ক্যাম্পাসের শিক্ষাকাঠামোকেই বিপন্ন করে তোলেন। এ অবস্থায় উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক ছন্দে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারছে না। এবার ছাত্রলীগ আসন গাড়তে চাইছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেক আগে শুনেছিলাম স্কুলেও ছাত্রলীগ শাখা খোলার পাঁয়তারা করছিল। অর্থাৎ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ভেঙে ফেলার একটি মহাপরিকল্পনা যেন।

সাধারণ মানুষ আকুতি জানিয়ে আসছে বর্তমান ধারার ছাত্ররাজনীতির অবসান ঘটাতে। কিন্তু নিজ পায়ে দাঁড়ানোর মনোবল হারানো নেতারা সাধারণ মানুষকে মূর্খ বিবেচনা করে বলেন, ‘ছাত্ররা রাজনীতি না করলে ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও সরকারের হাল ধরবে কারা’! এ ধরনের ছেঁদো কথায় ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে। এই যে হলে হলে, ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে সন্ত্রাস চালানো ছাত্ররাজনীতি করা ছেলেরা এবং এই যে দুদিন আগে ইডেন কলেজে ছাত্র নেত্রীদের মারামারির স্বরূপ দেখলাম। অনেক দিন থেকেই প্রচার ছিল ছাত্রলীগের নেত্রীরা চাঁদাবাজি ও সিট বাণিজ্যে জড়িত। এরপর ভয়ংকর অভিযোগ যুক্ত হয়েছে যে ছাত্রীদের আপত্তিকর ছবি তুলে তা ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করেন নেত্রীরা। মারামারির পর অনেকেই এসব অভিযোগের সত্যতার পক্ষে কথা বলছেন। একটি ঐতিহ্যবাহী কলেজের সম্মান কোথায় নামিয়ে আনল নষ্ট ছাত্ররাজনীতি। আমরা বাস্তবতা বুঝতে পারি যে কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিচার করতে বা নিবৃত করতে অসমর্থ! বড় নেতাদের ভাষ্যমতো যদি রাজনীতির এমন ট্রেনিং পাওয়া ছাত্র নেতানেত্রীরা ভবিষ্যৎ রাজনীতির কাণ্ডারি হন এবং সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেন কোথায় গিয়ে পৌঁছবে দেশ!

একজন সুশিক্ষিত মানুষ সময়ের প্রয়োজনে যেকোনো পরিস্থিতিতে হাল ধরতে জানেন। ক্যাম্পাসগুলোতে রাজনীতিতে না জড়ানো মেধাবী শিক্ষার্থী এবং সুস্থ ধারার সংস্কৃতিচর্চা করা অনেক মেধাবী তরুণ-তরুণী থাকেন। তাঁদের ভেতর বরঞ্চ পরিচ্ছন্ন চিন্তার নেতৃত্বগুণের বিকাশ ঘটে। তাই নেতৃত্বের শূন্যতা হওয়ার প্রশ্ন থাকে না। এসব কারণে আজ সুশিক্ষার প্রশ্নটিই সামনে চলে আসছে সবার আগে। আমাদের একটি দুর্ভাগ্য রয়েছে, রাজনৈতিক সরকারগুলোর মধ্যে কট্টর দলীয়করণের প্রচলন থাকায় মুক্তচিন্তার যোগ্য শিক্ষাবিদদের সাধারণত আর পাওয়া যায় না নেতৃত্বে বা শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বে, যিনি শিক্ষা বিকাশের খুঁটিনাটি গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারবেন। পশ্চিম বাংলায় মেধাবী ফলাফল করা, এমনকি পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক হতে দেখি। সম্মানজনক বেতন কাঠামোর কারণে তাঁরা প্রাইমারি স্কুল আর কলেজে শিক্ষকতাকে আলাদা করে দেখেন না। অথচ আমাদের দেশে বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা জাতীয়করণের দাবিতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে রাজপথে অবস্থান ধর্মঘট করেন। একজন গার্মেন্ট শ্রমিকের চেয়েও কম বেতন পান এমপিওভুক্ত বেসরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আমি শুনে বিস্মিত হয়েছি যে এমপিওভুক্ত স্কুলের শিক্ষকরা সাড়ে বারো হাজার টাকা বেতন পান। বাড়িভাড়া ভাতা পান এক হাজার টাকা আর চিকিৎসা ভাতা পান পাঁচ শ টাকা। বেশির ভাগ স্কুলেই স্কুলের আয় থেকে শিক্ষকদের তেমন কিছু আর্থিক সুবিধা দেওয়া হয় না। এমন বাস্তবতায় স্কুল শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছার সুযোগ কোথায়! বেসরকারি কলেজের শিক্ষকদের অবস্থাও তথৈবচ।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দলীয়করণের চাপে ভীষণ কোণঠাসা দশায়। স্বাধীনতার পর থেকে আশির দশক পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার জন্য উপাচার্য নিয়োগে দল বিবেচনা করা হতো না। সিনেট নির্বাচনও হতো মুক্তচিন্তায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাই উপাচার্য হিসেবে পেয়েছি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, মুজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী, ড. ফজলুল হালিম চৌধুরীর মতো বরেণ্য মানুষদের। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যলয়ে পেয়েছি অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ, অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম, সৈয়দ আলী আহসান প্রমুখ উজ্জ্বল শিক্ষাবিদকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আলো করেছিলেন ড. মোহাম্মদ এনামুল হক, সৈয়দ আলী আহসান ও জিল্লুর রহমান সিদ্দিকীর মতো পণ্ডিত মানুষ। কিন্তু এখন রাজনৈতিকীকরণের দাপটে তেমন স্বনামে উজ্জ্বল পণ্ডিতজনদের পাওয়া যাচ্ছে না বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে। উচ্চশিক্ষা বিকাশে এটি নিঃসন্দেহে অন্তরায়। বর্তমান সময়ে সম্মানিত উপাচার্য মহোদয়রা ক্ষমতাসীন সরকার ও নেতৃত্বের কাছে পরোক্ষভাবে দায়বদ্ধ থাকেন বলে মুক্তচিন্তায় বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারেন না। এখন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মেধা প্রতিযোগিতার বদলে দলীয় আনুগত্যের বিনিময়ে শিক্ষক নিয়োগ হয় বেশি। এভাবে শিক্ষাব্যবস্থার নানা ক্ষেত্রেই রাজনীতির ঘুণপোকারা পুরো কাঠামোটিকে কুরে কুরে খাচ্ছেন। এসব দেখে মেধাবী ছাত্র, মেধাবী শিক্ষক সবাই হতাশাগ্রস্ত।

বেশ কয়েক মাস আগে এক বৈঠকে শিক্ষামন্ত্রী কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, সর্বজনমান্য পণ্ডিত অধ্যাপকদের উপাচার্য হওয়ার অনুরোধ করলেও তাঁরা সাড়া দেননি। এ কথা থেকে বুঝতে পারি বাধ্য হয়ে তাঁদের ‘ভিন্ন গ্রেডে’র অধ্যাপকদের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে হয়!

আমাদের মান্যবর রাজনীতির বিধায়করা জানেন কেন বিদগ্ধ শিক্ষাবিদরা উপাচার্যের দায়িত্বে আসতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তাঁরা জানেন, না চাইলেও উপাচার্যের চেয়ারে বসে বিএনপির আমলে ছাত্রদল আর আওয়ামী লীগের আমলে ছাত্রলীগের সব অন্যায় আচরণ আর আবদারকে মেনে নিতে হবে। সরকারের নীরব অভিপ্রায়ও তেমনটিই থাকবে। শিক্ষক-অফিসার নিয়োগে অন্যায় তদবির এড়ানো তাঁর পক্ষে সম্ভব হবে না। শিক্ষক রাজনীতিযুক্ত নেতারা তাঁদের দাবি মানাতে বাধ্য করতে চাইবেন। কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা জ্ঞানচর্চায় নিমগ্ন উপাচার্যদের পক্ষে এসব অন্ধকার মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তাঁরা জানেন তাঁর যৌক্তিক ও ন্যায়ানুগ পথচলার প্রতিবন্ধকতা সরাতে সরকার ও সরকারপক্ষ এগিয়ে আসবে না। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় উপাচার্যের চেয়ারটি তাঁদের আকর্ষণ করে না।

শুধু আমরা নই, সারা দুনিয়ার জ্ঞানদীপ্ত মানুষ বিশ্বাস করেন একটি দেশের উন্নয়ন টিকিয়ে রাখতে হলে শিক্ষিত জাতি প্রয়োজন। সুশিক্ষিত মানুষ যদি উন্নয়ন কার্যক্রমের চালিকাশক্তি না হন, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না।

 

 লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা