kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১ ডিসেম্বর ২০২২ । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ ।  ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

বিদ্যাসাগরের অবদান

গোলাম কবির

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



বিদ্যাসাগরের অবদান

আমার বয়স ছয় বছর তিন মাস ১৪ দিন পূর্ণ হওয়ার সময় দেশ ভাগ হয়ে গেল। এর মূলে ছিল ধর্মীয় সংস্কৃতির জটিল সমস্যা। তখন বোঝার বয়স হয়নি। পরে সামান্য বুঝেছি।

বিজ্ঞাপন

আমার বাবা ছিলেন শিক্ষক। আমাদের পরিবার ছিল শিক্ষাসংশ্লিষ্ট। আমার অগ্রজ-অগ্রজারা সন্ধ্যা হলেই হারিকেন জ্বালিয়ে মাদুরে বসে পড়তেন। আমিও তাঁদের সঙ্গ দিতাম।

একটা হারিকেনে আমি উটকোসহ চারজনে পড়াশোনা বিঘ্নিত হওয়ার জন্য কোন্দল হতো। মাঝে মাঝে বাবা এসে আমাদের কিছু উপদেশের কথা বলতেন। বলতেন বিদ্যাসাগর সম্পর্কিত তাঁর পাঠের ইতিহাস। বলতেন দারিদ্র্য-লাঞ্ছিত জীবনে রাজপথের বারোয়ারি আলোয় কিভাবে পাঠ সমাপন করতেন বিদ্যাসাগর। মনে হতো সে কি কিংবদন্তি; নাকি সত্য; এখন বুঝছি, তা ছিল সত্যেরও অধিক, যা বোঝা বা বোঝানো কঠিন।

২০২০ সালে বিদ্যাসাগরের জন্ম দ্বিশতবর্ষ অতিক্রান্ত হয়েছে, সেপ্টেম্বরে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো অনুষ্ঠান হয়নি। প্রাকৃতিক করোনা নাকি মানসিক দৈন্য তার পরিসংখ্যান কে নেবে! অথচ তিনি হতে পারতেন করোনা নিবারণের অন্যতম চাবিকাঠি। জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি বর্ধমানের ম্যালেরিয়াক্লিষ্ট মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন মানবধর্ম কাকে বলে। জমিদারের আহ্বানকে আমল না দিয়ে দরিদ্র মুসলিমপল্লীতে অবস্থান নিয়ে তিনি সেবাধর্মে নিজেকে নিয়োজিত করেন। তা ছাড়া কলকাতা থেকে দূরে কর্মটাড় স্টেশনের সাঁওতালপল্লীতে ঘর বানিয়ে প্রকৃত মাটির সন্তানদের সান্নিধ্যে অনাড়ম্বর জীবনযাপনের অকৃত্রিম স্বাদ পেতে চেয়েছিলেন তিনি।

কোন ধর্মের প্রতি বিদ্যাসাগরের প্রগাঢ় আকর্ষণ ছিল, তা বোঝা কঠিন। তবে তিনি যে মানবধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, তা তাঁর সারা জীবনের কর্মধারা অনুসরণ করলে সহজেই বোঝা যায়।

নিশ্চিত প্রায় অনাহার বরণ করার পালা তিনি শুরু করেছিলেন জীবন-সূচনা থেকেই। মাছ-মাংস-দুধ তিনি গ্রহণ করেননি। এটা ছিল তাঁর নিজস্ব বিবেচনা যে এতে অনেকটা অধিকার হরণ করা হয়। এখন প্রায় সব সমাজসেবী মানবসেবার নামে মানুষের রক্ত পান করে। রবীন্দ্রনাথ বিদ্যাসাগরের চারিত্র্য মাহাত্ম্য অবলোকন করে মিথ্যা বলেননি : ‘আমাদের এই অবমানিত দেশে ঈশ্বরচন্দ্রের মতো এমন অখণ্ড পৌরুষের আদর্শ কেমন করিয়া জন্মগ্রহণ করিল, আমরা বলিতে পারি না। ’

রবীন্দ্রনাথ কবি, তিনি অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বিদ্যাসাগরের চারিত্র্য মাহাত্ম্য অনুধাবন করে ‘অক্ষয় মনুষ্যত্বের অধিকারী’ ব্যক্তির বাংলার মাটিতে জন্ম সম্পর্কে বিস্মিত হয়েছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তাঁর চরিত্রের মাহাত্ম্য তাঁকে মহিমান্বিত করেছে।

সমাজ ও জীবনের অগ্রগতির জন্য যেসব বিষয় তিনি অগ্রগণ্য মনে করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল শিক্ষা ও নারী। জীবনকেন্দ্রিক শিক্ষাকে তিনি ছোট করে দেখার সুযোগ রাখেননি। তাঁর বেড়ে ওঠার কালে বাংলাদেশে শিক্ষায় ইংরেজি জানার তেমন সুযোগ ছিল না। বলতে গেলে নিজ চেষ্টায় তিনি ইংরেজি শিখেছিলেন, আর সংস্কৃত শিখেছিলেন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তথা সংস্কৃত কলেজের শিক্ষক সমভিব্যাহারে। মাতৃভাষার বাইরে দুটি ভাষা শেখার সুযোগ তিনি পান। সংস্কৃত ও ইংরেজি ছাড়া আরবি ভাষার বৈশিষ্ট্য তিনি আয়ত্ত করেছিলেন বলে উত্কৃষ্ট শিল্পসম্মত বাংলা ভাষার ‘যথার্থ প্রথম শিল্পী’ হওয়া তাঁর জন্য কঠিন হয়নি।

আধুনিক বাংলা ভাষার বয়স এবং অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। একটা বিষয় বোধকরি কেউ অস্বীকার করেন না যে বিদ্যাসাগর ভাষাকে অস্বাভাবিক সরল করে গেছেন।

‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ চারটি শব্দের সমন্বয়ে বিদ্যাসাগর এমন হৃদয়সংবেদী রূপ উপস্থাপন করেন, যা নিয়ে মানুষ এখনো সংশয়ে থাকে। রচনাটি কার! রবীন্দ্রনাথের নয় তো! বর্ণ পরিচয় করিয়ে দিতে গিয়ে তিনি বাংলা ভাষার মাহাত্ম্য যেভাবে তুলে ধরেন তার তুলনা তিনি নিজেই। তাইতো কবি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘ভাষার প্রাঙ্গণে আমি তব কবি তোমারি অতিথি। ’ উনিশ শতকের ব্যক্তির ইতিহাসকে সামাজিক উপন্যাসে উজ্জীবনকারী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় দুঃখ করে বলেছিলেন, বাঙালি, বিশেষ করে নারীসমাজের জন্য বিদ্যাসাগর যা করেছিলেন, তার তুলনা কোথায়? অথচ ধর্ম নিয়ে নাড়াচাড়া করা মানুষ যে পরিমাণ সমাদর পান, বিদ্যাসাগর তা পাননি। বিদ্যাসাগর উনিশ শতকে নারীমুক্তির নীরব আন্দোলনে যে শ্রম দিয়েছিলেন, তার প্রকৃত সম্মান তাঁকে দেওয়া যায়নি। এখানেই আমাদের দুর্বলতা দৃশ্যমান। আমরা অলৌকিক নিয়ে জীবনের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করি, বাস্তব নিয়ে ততটুকু করি না।

শিক্ষা, বিশেষ করে গ্রামীণ নারীশিক্ষা বিষয়ে তাঁর অবদান সর্বজনীন। আমরা আজ বাতাসের মধ্যে অবস্থান করে যেমন বাতাসের অবদান বুঝি না, তেমনি এই যে নারীশিক্ষার সুলভতা, তা তো বিদ্যাসাগরের নিঃস্বার্থ অবদান। তাঁকে সামনে রেখে সমকাল তেমন মুখর হয়নি। তবে রবীন্দ্রনাথ অন্তর থেকে যে প্রয়াস পেয়েছিলেন তাঁকে সামনে রেখে, তাই দিয়ে আমাদের শূন্যতা পূরণ করে যাচ্ছি।

বিদ্যাসাগরের সামনে মানবধর্ম সবচেয়ে বড় ছিল বলে প্রচলিত ধর্মের প্রতি তেমন মনোযোগী হননি। তবে বিধবা বিবাহ বিষয়ে তিনি ধর্মবিষয়ক গ্রন্থগুলো এফোঁড়-ওফোঁড় করতে ছাড়েননি। এতে তথাকথিত ধর্মরক্ষার ধ্বজাধারীদের আক্রোশ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেননি। এখনো নানা আকৃতিতে সে আক্রোশ প্রদর্শিত হয়।

শৈশবে আমি বিদ্যাসাগরে মোহিত ছিলাম। আজও বিদ্যাসাগর স্মরণে আছি, মানবকল্যাণে তাঁর নিঃস্বার্থ অবদানের জন্য। আগেই বলেছি, তিনি প্রচলিত ধর্মের পথে ধাবিত হননি। যে জীবন তিনি পেয়েছিলেন, প্রাকৃতিক বন্ধনে তাঁকে কিভাবে যথার্থ করা যায়, তাই ছিল তাঁর সমগ্র জীবনের সাধনা। আমরা মূঢ়, তাই তাঁকে প্রাপ্য সম্মান দিতে পারিনি। আজকের দিনে তাই বোধকরি আমাদের বড় ভাবনার বিষয়।

লেখক : সাবেক শিক্ষক, রাজশাহী কলেজ

 



সাতদিনের সেরা