kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০২২ । ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১২ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

জল দেয় নদী, পথ দেয় নদী

মঞ্জুর আরিফ

২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



জল দেয় নদী, পথ দেয় নদী

সভ্যতার আদি সন্ধানে আমরা দেখি পৃথিবীর যে তিন বা চারটি গোড়াপত্তনকারী সভ্যতা, সেগুলো সব গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যভাগে গড়ে ওঠে মেসোপটেমিয়ান সভ্যতা। যেখানে ‘মেসোপটেমিয়া’র শাব্দিক অর্থই হলো দুই নদীর মধ্যবর্তী স্থান। নীল নদের পলির মমতায় ঊষর মরুর মধ্যে গড়ে ওঠে মিসরীয় সভ্যতা।

বিজ্ঞাপন

সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা। ধরা হয় এই সিন্ধু সভ্যতার আধুনিক রূপ পুরো ভারতবর্ষ। ইয়েলো নদীর হলুদ পলির সন্তান চৈনিক সভ্যতা। আর এদিকে আমাজন নদী তো একসঙ্গে কয়েকটি দেশ ও তার অগণিত সভ্যতাকে আঁকড়ে রেখেছে অনাদিকাল থেকে। নদী কী করে সভ্যতা তৈরি করল? পানীয় জল এবং সেচ মানবসমাজকে দিয়েছে জীবনের নিশ্চয়তা আর কৃষির বিকাশ। ভরা বর্ষায় দিয়েছে যাতায়াত ও পণ্য স্থানান্তরের অবারিত সুযোগ। পলি দিয়েছে মাটির উর্বরতা। কৃষিতে বিকাশ এসেছে। উদ্বৃত্ত হয়েছে খাবার। মানুষ তখন অন্যান্য পেশায় নিজেকে ব্যস্ত রাখার সুযোগ পেয়েছে। গড়ে তুলেছে নগর, রাষ্ট্র, শিল্প, সেনাবাহিনী। ধীরে ধীরে নদীর আশীর্বাদে সভ্যতা এগিয়েছে সবেগে।

মানবসভ্যতা যখন থেকে শিকার ও সংগ্রহ নির্ভরতা থেকে উৎপাদন সভ্যতায় রূপ নিচ্ছে, অর্থাৎ কৃষি সভ্যতায় পরিবর্তিত হয়েছে, সেই ইতিহাস অনুযায়ী ধরা হয় আদিতে যে সভ্যতা জলের নিয়ন্ত্রণ করত তারাই শক্তিশালী সভ্যতা। ভারতে মৌর্য সভ্যতা বিকাশের প্রধান সক্ষমতাই ছিল জলের নিয়ন্ত্রণ। জলের প্রবাহ, সেচ, যোগাযোগ, অতিবন্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মৌর্য সভ্যতার মতোই ওপরে যে আদি সভ্যতার কথা আমরা জানলাম, তারা আধিপত্য বিস্তার করেছিল সমসাময়িক অন্যান্য সভ্যতার ওপর। চীন জলের নিয়ন্ত্রণ করেছে তার সমাজের ধান উৎপাদনের চাহিদার জন্য। জলের ওপর কর, জল শ্রমিকদের মাধ্যমে সেচ, প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সহজে পরিবহন ক্ষমতা দিয়েছিল এই সভ্যতাগুলোর স্থিতি। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে রয়েছে এর বিশদ বিবরণ। প্রকৃতিগত কারণেই এই সভ্যতাগুলো অন্যান্য নিয়ামকের চেয়ে জলের নিয়ন্ত্রণকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল। এই সভ্যতাগুলো ছিল খুব কেন্দ্রীভূত। ছোট ছোট স্বাধীন অংশ ছিল না তেমন। মূল বিষয় হলো জল যার, শক্তি তার। আর এই শক্তির উৎস ছিল নদীর ওপর নির্ভরতা এবং নদীর ব্যবহার। নদী ছিল সভ্যতার পরিচয়। আদি এই সভ্যতাগুলোর পারস্পরিক যোগাযোগও হতো নদীপথে।

অন্য সব কৃষিনির্ভর সভ্যতার মতোই বাংলাও ছিল নদীবর্তী আর নদীনির্ভর। মেসোপটেমিয়া, মিসরীয়, সিন্ধু সভ্যতা মূলত এক নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার উদাহরণ। অন্যান্য নদীর ভূমিকা এই সভ্যতাগুলোতে ছিল প্রায় প্রচ্ছন্ন। অন্যদিকে বাংলার যে সভ্যতা তার প্রাণভোমরাই ছিল অসংখ্য নদী-নালা, খাল-বিল। আমাদের গঙ্গা, যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, রপসা, কর্ণফুলী—এসব নদী বাংলার সমতল বা অর্ধসমতল ভূমির প্রাণপ্রবাহ।

সে কারণে অন্যান্য সভ্যতায় মূল নগর ছিল একটি, কিন্তু বাংলায় ছিল একাধিক। মোগলরা যখন ভারতবর্ষ জয় করে তাদের রাজধানী জাহাঙ্গীরনগরের গোড়াপত্তন করল গঙ্গা নদীর তীরে, গঙ্গার নাব্যতা আর স্রোত ওই শুকনা পাথুরে মাটির শাসকদের মুগ্ধ করেছে বহুকাল। তাঁদের সাম্রাজ্যের বিস্তার লাভ করেছে নদীর শক্তি দিয়ে। বাংলার যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নদী। সড়ক ব্যবস্থা তো সেদিনের কথা। মানুষ ও পণ্য পরিবহন হতো নদীপথে। যাঁরা বাংলা ভ্রমণে এসেছেন, এসেছেন ধর্ম প্রচারে—নদীই ছিল তাঁদের জন্য বাংলার মহাসড়ক।   বাংলার কৃষি সব সময়ই ছিল সমৃদ্ধ। কারণ জলের প্রাপ্যতা। সময় গড়িয়েছে তারপর। সমাজ আধুনিক হয়েছে। কৃষিসমাজ বদলেছে শিল্পসমাজে। জ্ঞান-বিজ্ঞানে জয় করেছে চরাচর। মানুষ ভুলেছে নদীর অবদান।

সরকারি হিসাব মতে, বাংলাদেশে নদী রয়েছে আড়াই শর বেশি। কিন্তু খুব খোলা চোখেই আমাদের নদীগুলোর অবস্থা দেখা যায়। আমরা আধুনিক মানুষ নদীকে করেছি ভাগাড়। কেড়ে নিয়েছি জীবন। বর্জ্য, নদী ভরাট, অবৈধ দখল হয়েছে নদীর নিয়তি। আমরা কি এই দৃশ্য চেয়েছি? চাইনি নিশ্চয়ই। কিন্তু আটকাতে পেরেছি কি? পারিনি। নদী আজ আমাদের সমাজে বিলুপ্ত সত্তার নাম। এত কিছুর পরও নদীপথই এখনো বাংলাদেশের পণ্য সরবরাহের অন্যতম সহজ মাধ্যম। কিন্তু নদীর নাব্যতা সংকট, প্রশস্ততা সংকটের কারণে নদীপথ হারাচ্ছে তার ব্যাবহারিক উপযোগিতা। ক্ষতি হচ্ছে অর্থের, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একসময় চিলমারী নদীবন্দর ছিল উত্তরের বৃহৎ নদীবন্দর। যাতায়াত করা যেত দেশের অন্যান্য অংশে। পাশের দেশের সঙ্গে করা যেত পণ্য পরিবহন। কিন্তু চিলমারী নদীপথ ধীরে ধীরে হারিয়েছে তার জৌলুস। সব হয়েছে আমাদের অবহেলায়।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আমাদের অবহেলাও রয়েছে বিস্তর। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মধ্যে অভিন্ন নদী রয়েছে ৫৪টি। অভিন্ন নদীতে অভিন্ন অধিকার আমরা প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি এত দিনেও। এ বছর তিস্তা নদীতেই বন্যা হয়েছে আটবার। অথচ তিস্তার জল বাংলাদেশের ভেতর দিয়েই বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। শুষ্ক মৌসুমে জলের হাহাকারে তিস্তার বুক পরিণত হয় বালিয়াড়িতে। ঊষর মরু থেকে রক্ষা পেতে প্রাচীন সভ্যতা বেছে নিয়েছিল নদীর আশ্রয়। আর আধুনিক বাংলাদেশ শত শত নদীর জন্মভূমি হয়েও পরিণত হয়ে চলেছে শুষ্ক ভূমিতে। এ যেন সভ্যতার উল্টো যাত্রা। প্রকৃতি ও পরিবেশে পড়ছে বিরূপ প্রভাব। প্রজাতি বিলুপ্তির মতো ঘটনা ঘটছে। যে মাছ একসময় আমাদের জেলেদের মুখে হাসি ফুটিয়েছে, সেগুলো এখন কৃত্রিমভাবে উৎপাদন করতে হচ্ছে নতুন করে।

আমাদের জীবন, জীবিকা, অর্থনীতি, সাহিত্য—সবখানেই রয়েছে নদীর উপস্থিতি। কিন্তু আমরা কি নদীর জন্য কিছু করছি? নাগরিক জীবনের সচেতন অপরাধ, রাষ্ট্রের অবহেলা আমাদের নদীগুলোকে মেরে ফেলছে দিনে দিনে। এ অবস্থা চলতে পারে না।

আমাদের নদীগুলোর আজকের অবস্থা যেমন এক দিনে তৈরি হয়নি, রাতারাতি এ অবস্থাও ফিরবে না। চাই সম্মিলিত অবস্থান। সবার আগে প্রয়োজন নদীর প্রতি ভালোবাসা। নদীর কাছে যাওয়া চাই, দেখা চাই কেমন আছে আমাদের নদীগুলো। জলদায়ী ও জীবনদায়ী এই সত্তাদের জন্য প্রয়োজন যত্ন। যে নদীকে কেন্দ্র করে আমরা গড়ে উঠেছি, সময় এসেছে তার প্রতিদান দেওয়ার। প্রত্যেক মানুষকে, রাষ্ট্রকে চোখ ফেরাতে হবে এদিকে। অট্টালিকার পাহাড় চোখ ধাঁধাতে পারে, জীবন জুড়াতে পারে না। জীবন জলে বাঁচে। জল দেয় নদী। পথ দেয় নদী।

লেখক : আহ্বায়ক, রিভারাইন পিপল

তিস্তা শাখা, রংপুর



সাতদিনের সেরা