kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

যেখানে রাস্তা কেড়ে নেয় প্রাণ

শফিক আশরাফ

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



যেখানে রাস্তা কেড়ে নেয় প্রাণ

ভারতবর্ষে উনিশ শতকের মধ্যে প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঘর থেকে রাস্তায় বেরিয়ে হারিয়ে গেছে! তারা আর কোনো দিনই ঘরে ফিরে আসেনি। তাদের স্বজনরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করে থেকেছে তাদের ফিরে আসার, কিন্তু তারা ফিরে আসেনি। আশ্চর্যজনক হলো, অপেক্ষারত স্বজনরা জানতেও পারেনি তারা কোথায় হঠাৎ করে হাওয়া হলে গেল! এই ঘটনা নিয়ে একসময় ব্রিটিশ শাসকদের টনক নড়ল। কারণ তাদের সেনাবাহিনীর ছোটখাটো সেনাদলও মিসিং হয়ে গিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তারা তদন্তে নামল, তদন্তে বের হলো আশ্চর্যজনক সব তথ্য! হিন্দু-মুসলমান মিলে ‘ঠগি’ নামের একটা সম্প্রদায়ের জন্ম দিয়েছে। তারা আবার কালীভক্ত। আর এদের পেশাই হলো নিঃসঙ্গ পথচারী কিংবা দলবদ্ধ কোনো বিত্তশালী কাফেলাকে খুব সুপরিকল্পিতভাবে হত্যা করে কোনো নিরিবিলি, ফাঁকা জায়গায় পুঁতে ফেলে সর্বস্ব লুট করা। এভাবে তারা প্রায় ২০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। এ নিয়ে ফিলিপ মিডোস টেলরের ‘কনফেশন অফ ঠগি’ নামে লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ। এই ঠগিদের কাহিনি নিয়ে ‘দ্য ডিসিভার্স’ মুভিটি বেশ হৈচৈ ফেলে দিয়েছিল।

এখন আর ঠগি নেই। কিন্তু এখনো মানুষ ঘর থেকে বের হয়ে রাস্তায় হারিয়ে যায়! এখনো তাদের আত্মীয়-স্বজন তাদের খোঁজার জন্য রাস্তায় নামে। তবে কোনো ঠগি নয়, মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে রাস্তা! বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে রাস্তায় জীবন হারানো মানুষের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। টাঙ্গাইল থেকে রংপুর পর্যন্ত সড়কে উন্নয়নের কাজ চলছে। এই উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে রাস্তাটা মানুষের মারণফাঁদ তৈরি করেছে। এমন কোনো দিন নেই রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটে না, এমন কোনো দিন নেই রাস্তায় কোনো মানুষ মারা যায় না! রাস্তার উন্নয়নের কাজ করতে গিয়ে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ, কোনো কোনো জায়গায় রাস্তা সরু ও অপ্রতুল। ফলে দ্রুতগামী যানবাহন খুব সহজেই এসব জায়গায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। এ ছাড়া এসব মহাসড়কে রিকশা, ভ্যান, ইজি বাইকের মতো ধীরগতির যানবাহন অবলীলায় চলছে আইন অমান্য করে। ফলে গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো এগুলো মানুষের জীবনহানির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

উত্তরের আরেকটা মারণ-রাস্তা রংপুর টু নীলফামারী, দিনাজপুরগামী এক লেনের রাস্তা। গত কয়েক দিনে রংপুরের তারাগঞ্জে বড় দুটি বাস দুর্ঘটনায় ১২ জন মানুষ মারা গেল। দুর্ঘটনার কারণ রাস্তা মহাসড়কের উপযোগী নয়, অত্যন্ত সরু, রাস্তাঘাটে অপরিকল্পিত হাট-বাজার, রিকশা, ইজি বাইক, ভ্যানগাড়ির অবাধ চলাচল ইত্যাদি। রাস্তার স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী দ্রুতগামী যানবাহনগুলো রাস্তার ডান পাশ দিয়ে চলবে, একটু কম দ্রুতগামী গাড়ি মাঝ দিয়ে যাবে, ধীরগতির কোনো যানবাহন থাকলে তা রাস্তার বাঁ পাশ দিয়ে যাবে। ইজি বাইক বা রিকশাচালক রাস্তার কোনো নিয়ম-কানুন জানে না, লেন পরিবর্তন করার জন্য তাদের গাড়িতে কোনো সিগন্যাল থাকে না এবং তারা ইচ্ছামতো ডান-বাম দিয়ে চলাচল করে। ফলে মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস বা ট্রাক তাদের বাঁচাতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পতিত হয়। সামান্য অমনোযোগ, সামান্য ভুল ঘর ছেড়ে বের হওয়া মানুষের জীবনকে দারুণ অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেয়। তারাগঞ্জ দুর্ঘটনায় ১২ জন মানুষ কোনো সংখ্যা নয়, ১২টি পরিবার এবং তাদের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল আরো অনেক মানুষের জীবনকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে। তারা ঘর ছেড়ে বের হয়েছিল সুস্থভাবে ঘরে ফেরার প্রত্যাশা নিয়ে। এখন যেহেতু কোনো ঠগি নেই, কাজেই তাদের মিসিং হওয়ার আশঙ্কাও নেই, কিন্তু কার্যত তারা মিসিং হয়ে গেল।

দুঃখজনক হলো, আমাদের সামর্থ্য ছিল তাদের ঘরে ফেরা নিশ্চিত করার। আমাদের যোগ্যতা আছে এই মৃত্যুযাত্রা রোধ করার; কিন্তু আমরা সেটা করছি না। মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহন চলাচলে হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা আছে, মহাসড়কের পাশে দোকানপাট না বসাতে রাস্তার পাশে বড় বড় সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে; কিন্তু এসব কার্যকর করতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কিংবা প্রশাসনের কর্তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ আছে বলে মনে হয় না। মাঝেমধ্যে রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে মোটরসাইকেল ধরার উৎসব পরিলক্ষিত হয়, সেটা দেখে মনে হতে পারে রাস্তার সব সমস্যার কারণ মোটরসাইকেল। কিন্তু দুর্মুখরা (!) বলে মোটরসাইকেল ধরার উৎসবে উপার্জন ভালো! অথচ প্রশাসনের সামান্য নজরদারি, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, হাইকোর্টের নির্দেশনা বাস্তবায়ন করলেই রাস্তায় বের হওয়া মানুষের জীবন অনেকটাই অনিশ্চয়তা থেকে বাঁচানো যায়। আর এসব করার জন্য সরকার লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে বিভিন্ন দপ্তর চালাচ্ছে, আর এসব দপ্তর চলে জনগণের রক্ত জল করা ট্যাক্সের টাকায়! কিন্তু আমাদের কলোনিয়াল মানসিকতা হলো জনগণের টাকায় বেতন নিয়ে জনগণের ওপর খবরদারি করা এবং এই খবরদারি আমরা জনগণও অনেকটা মেনে নিয়েছি।

কিন্তু যখন জনগণের জীবন রক্ষার জন্য দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা হয়, যখন জনগণের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার শপথ নিয়ে সেটা পালন না করা হয়, তখন সেটা প্রশাসনিক অকার্যকারিতার নিদারুণ উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রে অনেক দিন যাবৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় আছে। বর্তমান সরকারের হাত ধরে এ দেশ জঙ্গিমুক্ত হওয়ার পথে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ করতে সরকারের প্রচেষ্টা লক্ষণীয়। আর সেখানে আমলাতান্ত্রিক দুর্বৃত্তায়ন রোধ করা এই সরকারের পক্ষে খুব কঠিন কোনো বিষয় নয়।

বেশ কিছুদিন ধরে কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রবীণ নেতা অভিযোগ করে যাচ্ছেন, আমলারা তাঁদের কথা শোনেন না! এ অভিযোগ রাষ্ট্রের পক্ষে খুবই ভয়ানক বার্তা দেয়। জনগণের সেবক জনপ্রতিনিধির আদেশ অমান্য করছেন! এটা খুব সহজ স্বাভাবিক কোনো অভিযোগ নয়! এটা এখন আর কোনো ব্রিটিশ কলোনি নয়। মনে করার কোনো কারণ নেই যে অনেক দূরে বসে আমাদের কেউ শাসন করছে, সেই শাসকদের সর্বস্বার্থ রক্ষা করার জন্য কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে! স্বাধীন-সার্বভৌম দেশে বসে জনপ্রতিনিধির আদেশ অমান্য করার অর্থ এখনো সরকারি প্রশাসকরা কলোনিয়াল শাসনের মনোভাব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি।

আইনের শাসন বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে এ দেশের মানুষ কেন রাস্তায় মরবে! কেন মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা পাবে না! এটা যাদের নিশ্চিত করার কথা তারা কেন, কোন শক্তিবলে সেটা নিশ্চিত করছে না! রাস্তায় মানুষের জীবন বাঁচাতে এ সব কিছুকে জবাবদিহির মধ্যে আনতে হবে। জনসেবকদের ব্যর্থতার কারণে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারলে মানুষের ঘরে ফেরা অনিশ্চিতই থেকে যাবে, মানুষ হারিয়ে যেতে থাকবে রাস্তায়।

 

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ,

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা