kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

সর্বত্রই পুঁজিবাদের একচ্ছত্র দৌরাত্ম্য

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



সর্বত্রই পুঁজিবাদের একচ্ছত্র দৌরাত্ম্য

রাশিয়া যে পুরোপুরি পুঁজিবাদী হয়ে গেছে তার প্রমাণ ভেতরে-বাইরে সুন্দরভাবে দৃশ্যমান। ভেতরে চলছে স্বৈরাচার, বিরোধীদের নিষ্পেষণ, দুর্নীতি, পরিবেশদূষণ। বাইরে বিক্রি করছে অস্ত্র; মিয়ানমারের সেনাশাসকরা অস্ত্র পাচ্ছে রাশিয়ার কাছ থেকে। শেষমেশ ঘটল ইউক্রেনের ওপর হামলে পড়া।

বিজ্ঞাপন

কারণ ইউক্রেন বশ মানছিল না; পুঁজিবাদে দীক্ষিত হয়ে ইউক্রেনও চাইছিল পুঁজিবাদী দেশগুলোর সঙ্গে মিলেমিশে ‘উন্নতি’ করবে। যোগ দেবে ন্যাটোতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নে এবং বন্ধুত্ব গড়ে তুলবে আমেরিকার সঙ্গে। মহামতি পুতিনের তাতে ভীষণ রাগ। ইউক্রেন একসময় সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল, ইউক্রেনকে রাশিয়া এখন অনুগত প্রতিবেশী হিসেবে দেখতে চায়, শত্রুদের সঙ্গে হাত মেলানো তার জন্য বড় অপরাধ; তাতে ‘রাশিয়ার নিরাপত্তা’ বিঘ্নিত হওয়ারও আশঙ্কা।

শোনা যাচ্ছিল হামলা করবে। কিন্তু সত্যি সত্যি যে হামলে পড়বে এমনটা মনে হয়নি, বিশেষ করে এ জন্য পুতিন বারবারই বলছিলেন যে আক্রমণের কোনো অভিপ্রায়ই তাঁর নেই। হামলা হলো। রাশিয়া আশা করেছিল ইউক্রেন সরকার দেশ ছেড়ে পালাবে। কিন্তু দেখা গেল তেমন কিছু ঘটছে না। ইউক্রেন লড়ছে। শুধু পেশাদার সেনারাই নয়, দেশের সাধারণ মানুষও পথে নেমে এসেছে। পুতিন আশা করেছিলেন সেখানে একটা পুতুল সরকার বসাবেন। পারলেন না। ইউক্রেনের সেনাবাহিনীকে তিনি আহ্বান জানিয়েছিলেন বিদ্রোহ করতে এবং ক্ষমতা দখল করে নিতে। সেনাবাহিনী উল্টো কাজ করেছে, দেশরক্ষায় ব্রতী হয়েছে। এবং খোদ রাশিয়াতেই যুদ্ধবিরোধীরা বিক্ষোভ করছে। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও শিল্পীরা খোলা চিঠি লিখেছেন। মস্কোসহ ৫৩টি শহরে মানুষ নেমে এসেছে যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে। এ পর্যন্ত তিন হাজার জনকে আটক করা হয়ে গেছে। ওদিকে চীনও নীরবে সমর্থন জানাচ্ছে তার একদা শত্রু রাশিয়াকে। সেও পুঁজিবাদী। অন্যদের কাছে তো বটেই, মিয়ানমারের কাছেও সে অস্ত্র বিক্রি করে থাকে। তার আশা, যুদ্ধে রাশিয়া দুর্বল হলে সে প্রবল হবে এবং আমেরিকার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারে নেতৃত্বের আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। ওদিকে আমেরিকা আশা করছে, রাশিয়া এবার ভালোভাবেই জব্দ হবে। এতে তার সুবিধা। পুঁজিবাদীরা যে অসংশোধনীয় রূপে যুদ্ধবাজ, সেটি দুটি বিশ্বযুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে, প্রমাণিত হলো ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলায়ও।

ইউক্রেনের ওপর রাশিয়ার হামলায় একটি ঐতিহাসিক বক্রাঘাতও ঘটেছে। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত (ষড়যন্ত্রও বলা চলে) ইউক্রেনে বসেই রাশিয়া, বেলারুশ ও ইউক্রেনের তিন রাষ্ট্রপ্রধান নিয়েছিলেন; গোপনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধান ব্যক্তি গর্বাচেভকে না জানিয়ে। গোপন চুক্তি সই করার পর গভীর রাতে ইউক্রেনের রাষ্ট্রপ্রধান তাঁর বন্ধু আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে (সিনিয়র) জানিয়েছিলেন খবরটি; রুশ রাষ্ট্রপ্রধান ইয়েলিসন জানান গর্বাচেভকে। টেলিফোনে। সেই ইউক্রেনকে দখল করার জন্যই এখন পুতিনের অভিযান, যে পুতিন একসময় ছিলেন কেজিবির কর্মচারী। বিভিন্ন শহরে যুদ্ধবিরোধী যে বিক্ষোভ হচ্ছে তার ফেস্টুনে পুতিনের ব্যঙ্গচিত্র আঁকা হয়েছে অবিকল হিটলারের মতো করে। পুতিনও একজন হিটলারই। ইতিহাসের কৌতুক এখানেও যে হিটলারের পতন ঘটেছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ঘটাতে গিয়েই, আর পুঁজিবাদের ভেতর-বাইরের অন্তর্ঘাত ও আঘাতে সেই সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া থেকেই নতুন একজন হিটলার বের হয়ে এলেন। কৌতুকের পেছনে বাস্তবতাটা এই যে হিটলাররা পুঁজিবাদেরই প্রতিনিধি, পুঁজিবাদের ভেতর থেকেই তাঁরা উৎপাদিত। আর সে ক্ষেত্রে হিটলার ও পুতিনের পার্থক্যটা গুণগত নয়, পরিমাণগতই বটে।

পুতিনের হিটলারি আচরণের বিস্তর নিন্দা হচ্ছে। হওয়াটা স্বাভাবিক, হওয়াটা প্রয়োজনীয়ও। পশ্চিমা পুঁজিবাদী বিশ্ব কেবল নিন্দা নয়, মুষ্টিবদ্ধ আস্ফাালন করছে, হুংকারও দিচ্ছে মোটা গলায়। গণমাধ্যমে ইউক্রেনবাসীর মানবিক বিপর্যয়ের কাহিনি ও ছবি আসছে। অর্থনৈতিক অবরোধও জারি করা হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমা পুঁজিবাদীদের নৈতিক জোর আছে কি? ওই একই কাজ কি তারা ইরাকে করেনি? হানা দেয়নি কি আফগানিস্তানে? বিধ্বস্ত করে দেয়নি কি লিবিয়াকে? ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পেছনে কি পশ্চিমের পুঁজিবাদী বিশ্ব ছিল না? নিয়মিতভাবে ইসরায়েলিরা যে আবদ্ধ ফিলিস্তিনিদের হত্যা করে চলেছে তার প্রতিবাদটা কোথায়?

পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদীদের মুখোশটাই যা ভিন্ন, মুখশ্রী একই।

তাহলে উপায় কী? উপায়টি কী, তা বলা কিন্তু সহজ। ব্যবস্থার বদল চাই। কোনো একটি দেশে নয়, পৃথিবীব্যাপী। ব্যাধিটি সর্বত্রব্যাপ্ত, করোনাভাইরাসের মতোই। এর প্রতিকারও আন্তর্জাতিকভাবেই করতে হবে; তবে শুরু করা প্রয়োজন প্রতিটি দেশেই। সমাজ পরিবর্তনের বিশ্বব্যাপ্ত ওই আন্দোলন নতুন যে আন্তর্জাতিকতা গড়ে তুলবে, সেটি মুনাফাকেন্দ্রিক হবে না; হবে সহমর্মিতা ও সহযোগিতা কেন্দ্রিক। এর জন্য দরকার পড়বে ব্যাপক ও গভীর সাংস্কৃতিক কাজের। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটি সংস্কৃতির মানবিক উন্নতির পথে মস্ত বাধা। অতিশয় উন্নত দেশেও তাই দেখা যায় সাংস্কৃতিক অন্ধকার। যেমন করোনার টিকাবিরোধী আন্দোলন। সেটি বাংলাদেশের মতো পশ্চাৎপদ দেশের মানুষ কিন্তু করেনি; উন্নত ইউরোপ ও আমেরিকার মানুষই করেছে। অথবা ধরা যাক ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর শ্বেত আমেরিকানদের আস্থার ব্যাপারটা। অবিশ্বাস্য কিন্তু সত্য। নির্বাচনে হেরে গেলেও ট্রাম্পের ভোটপ্রাপ্তি প্রমাণ করে শ্বেতাঙ্গদের প্রতিনিধিরূপে তাঁর শক্ত অবস্থান।

উন্নত সংস্কৃতির জন্য উন্নত আদর্শ আবশ্যক। সেটা অবশ্যই হবে পুঁজিবাদবিরোধী এবং সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় অঙ্গীকারে আবদ্ধ। না, ব্যবস্থার সংস্কারে কুলাবে না, দরকার বৈপ্লবিক পরিবর্তনই। এটা তো মোটেই অজানা নয় যে সংস্কারের মূল অভিপ্রায়টা হচ্ছে ব্যবস্থাটাকে রক্ষা করা, তাকে বদলানো নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো জিনিসকেই নতুন মোড়ক দিয়ে হাজির করা হয়। সংস্কারের নমুনা হচ্ছে সর্বজননিন্দিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বদলে সেখানে নতুন বিধিমালা জারি করা, যাতে পুরনো আইনের মত প্রকাশের অধিকার হরণকারী ধারাগুলো ঠিকই থাকবে, তবে আচ্ছাদনটা হবে নতুন, যেমন—সংস্কার পদক্ষেপ বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিটি নিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। এসব নয়ছয় ছলনা মাত্র, প্রতারণাও বলা চলে এবং সবটাই ব্যবস্থাটাকে রক্ষা করার স্বার্থে।

বিক্ষিপ্তভাবে ভালো খবর পাওয়া যায়। এমনকি এমনও শোনা যায়, যে পরিবর্তনের একটা হাওয়া এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী বইতে শুরু করেছে, যেমনটা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আমাদের জানাচ্ছে। তাদের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলছে, একনায়কদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। এক বছরে কমেছে কর্তৃত্ববাদীদের দাপট। ঝুঁকি সত্ত্বেও প্রতিবাদে নেমেছে মানুষ। কারচুপির পরও নির্ভার নয় শাসকরা এবং গণতন্ত্রীদের আবেদন আরো শক্তিশালী হচ্ছে।

এসব খবর ভালো তো অবশ্যই, তবে মোটেই যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে পুতিনরা যখন তৎপর রয়েছেন। মৌলিক পরিবর্তনের জায়গাটাতে হাত দেওয়া চাই। সেটা অবশ্য বলা যত সহজ, করা ঠিক ততটাই কঠিন। কিন্তু না করে তো উপায় নেই। বদল করার কথা বহু মনীষী বলেছেন। আজ থেকে ১০০ বছর আগে আমাদের কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘বিদ্রোহী’ নামে যে অসাধারণ একটি কবিতা লিখেছিলেন, তাতে ওই বদলের আবশ্যকতার কথাটি শুনতে পাই। পরে তিনি তাঁর বক্তব্য আরো পরিষ্কার করেছেন, বলেছেন সমাজ বিপ্লবের অত্যাবশ্যকতার বিষয়ে। যেমনটি পাওয়া যায় তাঁর ‘কুলি-মজুর’ নামের কবিতায়। কবিতাটিকে তিনি স্থান দিয়েছিলেন তাঁর সাম্যবাদী নামের কবিতার বইয়ে। প্রকাশকাল ১৯২৫। ছোট্ট ওই কবিতাটি আমাদের খুবই পরিচিত। কবি বলছেন, সেদিন রেলগাড়িতে তিনি দেখলেন ‘কুলি বলে’ এক বাবুসাব একজনকে ঠেলে নিচে ফেলে দিচ্ছে। দেখে কবির চোখে এলো জল, তাঁর মনে প্রশ্ন জাগল, ‘এমনি করে কি জগৎ জুড়িয়া মার খাবে দুর্বল?’ জবাবে তিনি বলছেন, না, মার খাবে না। কারণ বিশ্বব্যাপী একটি জাগরণ এসেছে, ‘আজ নিখিলের বেদনা-আর্ত পীড়িতের মাখি খুন/লালে লাল হয়ে উঠেছে নবীন প্রভাতের নবারুণ। ’ তা নতুন সূর্য উঠেছিল বৈকি। রুশ দেশে বিপ্লব ঘটেছিল। ১৯১৭ সালে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই নবীন সূর্যকে ঢেকে ফেলেছে প্রাচীন অন্ধকার। কবির ভাষায় বলতে গেলে জয় হয়েছে শয়তানের।

 

 লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 



সাতদিনের সেরা