kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০২২ । ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

শিক্ষা ও দুর্নীতি একসঙ্গে চলতে পারে না

মাছুম বিল্লাহ

২৮ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



শিক্ষা ও দুর্নীতি একসঙ্গে চলতে পারে না

শিক্ষার আলো সমাজ ও দেশ থেকে অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করবে, অর্থাৎ মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করবে, সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত রেখে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখাবে। এখানে সমাজের অন্যান্য বিভাগের মতো মানুষকে জিম্মি করবে না; বরং উন্মুক্ত পথ দেখাবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে অন্যান্য বিভাগের দুর্নীতির সঙ্গে শিক্ষা বিভাগও সমানতালে পাল্লা দিয়ে চলছে। যেন সব কিছুই ঠিক আছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যায় করা, শিক্ষকদের, অভিভাবকদের, প্রকৃত প্রাপকদের ফাইল আটকে, বিপদে ফেলে অর্থ আদায় যেন অনেক বিভাগকেই হার মানিয়েছে। শিক্ষক তা সে যে টায়ারেরই হোন না কেন, তিনি সমাজের অভিভাবক, তিনি অনন্য ব্যক্তিত্ব, তাঁকে হতে হচ্ছে দুর্নীতির প্রধান শিকার। কোথা থেকে শুরু করতে হবে, কিভাবে শুরু করতে হবে—কেউ যেন এর দিশা করতে পারছে না। সবাই যেন অসহায়। শিক্ষা ভবনের বড় বড় কর্মকর্তারা সারা জীবন শিক্ষার আলো ছড়িয়ে, শিক্ষার আলো সারা জীবন ভবিষ্যৎ নাগরিকদের মধ্যে বণ্টন করে একটি সময়ে মাউশিতে শিক্ষা প্রশাসকের ভূমিকায় এসে বসেন। তাঁদের কাছে সাধারণ শিক্ষকদের অনেক আকাঙ্ক্ষা থাকে, কিন্তু দেখা যায় তাঁরা পুরো অসহায়। কিন্তু তাঁরা যতটা অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন, প্রকৃতপক্ষে ততটা অসহায় নন। এটি ঠিক তাঁরা মাউশিকে স্বর্গে পরিণত করতে পারবেন না, কিন্তু অনেক কিছুই করতে পারেন প্রচলিত নিয়মের মধ্যে থেকেও। কিন্তু আমাদের শিক্ষকসমাজ শিক্ষক থেকে প্রশাসক যাঁরা হচ্ছেন তাঁদের সবার কাছ থেকে সেই ধরনের আচরণ পান না। আবার যাঁরা সৎ ও নিবেদিত কর্মকর্তা তাঁরা অনেক সময় কোণঠাসা হয়ে পড়েন, এটিও ঠিক। দুর্নীতির কারণে উচ্চমান সহকারী কিংবা অন্য কোনো স্টাফকে কোথাও বদলি করা হলে তাঁরা কয়েক দিন আবার বহাল তবিয়তে পূর্ববর্তী জায়গায় চলে আসেন। এতে কোনো ধরনের সমাধান হয় না।

দুর্নীতি কেন হয়, কিভাবে হয় তা শিক্ষা প্রশাসকরা সবই জানেন। তাঁরা জানেন যে মন্ত্রণালয় থেকে অনেক বিষয় সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা হয় বলে রাজনৈতিকভাবে অনেক বিষয় অবৈধ হলেও তাঁদের স্বীকার করে নিতে হয়। শিক্ষকসমাজ সেটিও জানে, তার পরও মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেওয়ার মতো, মাউশির অভ্যন্তরে অনেক রিফর্ম ও পরিবর্তন মাউশির দুর্নীতিকে অনেকটাই কমাতে পারে। শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসা হয়তো এসব শিক্ষা কর্মকর্তা ও শিক্ষা প্রশাসকদের দ্বারা সম্ভব নয়। তার পরও তাঁদের শুরু করতে হবে, যাতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা শিক্ষকরা সঠিক সেবাটি পান। তাঁদের অর্থের বিনিময়ে যাতে কোনো কাজ করাতে না হয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, তাঁরা শিক্ষক। তাঁদেরই যদি ঘুষ দিতে হয়, তাহলে সমাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

আমরা প্রত্যক্ষ করি যে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান একটি প্রতিষ্ঠানে বদলি হয়ে আসেন। তাঁকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তারা অনেক কিছু আশা করে, বরণের দিন কত মধুর ও কত সুন্দর কথা আলোচনা করা হয়। অথচ জেনে অবাক হলাম যে তিন লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে এসব বদলির ব্যবস্থা করা হয়, তাদের পুরো বিষয়টিই যে অন্ধকারাচ্ছন্ন সেটি মানসচক্ষে দেখা যায় না বলে অনেক কথা বলা হয়। এনটিআরসি কর্তৃক সুপারিশ পাওয়া সহকারী শিক্ষকদেরও নাকি ঘুষ দিয়ে কাজে যোগ দিতে হয়। আমরা পত্রিকা মারফত জানতে পারলাম যে মাউশিতে কর্মরত দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের আয়ের সঙ্গে তাদের বিত্তবৈভব পুরোপুরি সংগতিহীন। অনেকেই ঢাকায় কয়েকটি বাড়ির মালিক, অফিসে আসেন নিজ গাড়িতে। শিক্ষা বিভাগে যেখানে প্রশাসন থেকে কোনো কর্মকর্তা নেই, শিক্ষকরাই সব কিছু ম্যানেজ করেন, সেখানকার কর্মচারীরা যদি এতটা দুর্নীতিপরায়ণ হন তাহলে কী হবে আমাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের?

মাউশির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীরা বেতন পান ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা, যা দিয়ে রাজধানী শহর ঢাকায় সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়ার কথা, কিন্তু তাঁরা নিজেদের ব্যক্তিগত গাড়িতে অফিসে আসেন ও বাসায় যান। ধরা পড়ার ভয়ে গাড়ি অফিস থেকে কিছুটা দূরে রেখে হেঁটে অফিসে আসেন। শুধু তা-ই নয়, তাঁদের অনেকেরই রয়েছে একাধিক ফ্ল্যাট। ঢাকার বাইরেও নাকি রয়েছে ফ্ল্যাট, ভূ-সম্পত্তিসহ আরো অনেক কিছু। অবাক করা বিষয় হচ্ছে, মাউশির ১০৫ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীর মধ্যে ১৮ জনই নাকি কোটিপতি। এই কোটিপতি হতে তাঁদের বেশি সময় লাগেনি। কারণ তাঁরা নাকি ১০ বছরের কিছু বেশি সময় ধরে মাউশিতে আছেন। অনিয়ম-দুর্নীতি করে, শিক্ষকদের বিপদে ফেলে, ভয় দেখিয়ে ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’ হয়েছেন অনেকেই। তাঁদের বাণিজ্য হচ্ছে বদলি, পদায়ন, বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের নাম সংশোধন, পদবি সংশোধন, বিভিন্ন অভিযোগ নিষ্পত্তি, বকেয়া বেতন পরিশোধ ইত্যাদি কাজ করিয়ে দিয়ে আদায় করেন মোটা অঙ্কের ঘুষ। এ জন্যই অফিশিয়াল কাগজপত্রে এত ভুল থাকে, সবই ইচ্ছাকৃত ভুল।

মাউশিতে নানা পর্যায়ে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের তদন্ত প্রতিবেদন এবং ভুক্তভোগীদের লিখিত অভিযোগ, এমনকি মামলা হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে। যে কর্মচারীরা এমন দুর্নীতি করেন, ঘুষ নেন তাঁরা উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রাখেন, যাতে দায় শুধু কর্মচারীদের ওপর নয়, কর্মকর্তাদের ওপরও পড়ে। অভিযোগ প্রমাণিত হলেও শাস্তির খুব একটা নজির নেই। শাস্তির মধ্যে হচ্ছে বদলি করা, যা কোনো শাস্তিই নয়। সেবা বিকেন্দ্রীকরণের কথা বলে ২০১৫ সালে এমপিও ব্যবস্থা মাউশির আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর হাতে ছেড়ে দিয়েছিল সরকার। কিন্তু ছয় বছর পর দেখা গেছে দুর্নীতি তাতে কমেনি; বরং জটিলতা বেড়েছে। নানা সময়ে ১৮৪টি অভিযোগ তদন্তে মাউশিকে দায়িত্ব দিয়েছিল দুদক। কিন্তু তদন্তের অগ্রগতি ও প্রতিবেদন পাঠাতে মাউশিকে ৪০টি চিঠি পাঠিয়েও নাকি জবাব না পাওয়ায় মহাপরিচালককে তলব করেছিল দুদক। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।

শিক্ষা প্রশাসনে দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য শিক্ষক নিয়োগ হলে তার প্রভাব যে কত গভীর সেটি কিন্তু এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি। শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি হচ্ছে মাউশি, এখানকার দুর্নীতির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব গোটা শিক্ষকসমাজের ওপর পড়ে। কাজেই এটিকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হবে যেকোনো মূল্যে। এই দুর্নীতিবাজরা কিন্তু সবাই এক, এরা সংঘবদ্ধ নিজেদের বৃহত্তর স্বার্থের কারণে। কিন্তু সৎ কর্মকর্তা দু-চারজন যে আছেন, তাঁরা কিন্তু সংঘবদ্ধ নন। তাঁরা নিজ উদ্যোগে মাঝেমধ্যে এই পাহাড়সম দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে, কাজ করতে গিয়ে মারাত্মকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন, অনেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যান।

বছরের পর বছর একই জায়গায় চাকরি করছেন খুঁটির জোরে। কখনো বদলি করা হলে আবার কয়েক দিন পর যথাস্থানে হাজির। অর্থ দিয়ে, পার্টির জোর দিয়ে সব ম্যানেজ করা হয়। কারণ এঁদের সবারই ঢাকার বাইরে বহু ধরনের সম্পদ, ব্যবসা, ব্যাংক ব্যালান্স আছে বিভিন্ন নামে। দেশের শিক্ষকসমাজ যদি এ ধরনের অসাধু  কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের নিকট ধরা থাকে, তাহলে শিক্ষার কী হবে? আজ শিক্ষা নেই, পাস আছে, পড়াশোনা নেই, জিপিএ আছে, খাতা খালি অথচ পাস। যাদের সন্দেহ আছে, কিছু বিদ্যালয় ঘুরে আসুন, দেখুন সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীদের অবস্থা, শিক্ষকদের অবস্থা। শিক্ষকরা কেন পড়াশোনা করবেন? শিক্ষার্থীরা কেন পড়বে, যখন এমনিতেই পাস? এই অবস্থা কি চলতে থাকবে? শিক্ষার্থীরা যাতে পড়াশোনায় মনোযোগ দেয়, তারা যাতে শ্রেণিকক্ষে আসে এবং শিক্ষকরা যাতে মনোযোগ দিয়ে পড়াতে পারেন সেই ব্যবস্থাটি নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাই সচেষ্ট হোন।

 লেখক : সাবেক শিক্ষক, সিলেট, কুমিল্লা, মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ

[email protected]



সাতদিনের সেরা