kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

আত্মনির্ভর অর্থনীতির জন্য গবেষণা জরুরি

ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী

২০ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



আত্মনির্ভর অর্থনীতির জন্য গবেষণা জরুরি

সাসটেইনেবিলিটি বলে একটা কথা আছে। খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে টিকে থাকা। বিষয়টা যেমন-তেমন করে টিকে থাকা নয়, বরং এমনভাবে নিজেদের তৈরি করা, যাতে সারা পৃথিবী অর্থনৈতিক সংকটে ভুগলেও তখনো যেন তার প্রভাব আমাদের দেশের ওপর না পড়ে, তেমন একটা অবস্থান তৈরি করা। যদিও আমার অর্থনীতির বিশেষজ্ঞের ধারণা নেই, তার পরও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে এমন একটা সুদৃঢ় অবস্থান গড়ে তোলার কৌশলকে ‘অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা তৈরি থেকে উদ্ভূত অর্থনৈতিক ধারণা’ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে, যেটা বিশ্ব অর্থনীতির বাইরে বিকল্প অর্থনীতি হিসেবে কাজ করবে।

বিজ্ঞাপন

যেমন—ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের মতো ঘটনাগুলোর প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতির দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলেও নিজস্ব সম্পদ ও কৌশলগুলো বিকল্প শক্তি হিসেবে অর্থনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠবে, যেগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা মেটানোর ক্ষেত্রে অবদান রাখবে। মানুষের সামগ্রিক জীবনে কোনো বিরূপ প্রভাব ফেলবে না। অনেকগুলো মৌলিক উপাদানের মধ্যে জ্বালানিসম্পদের বিষয়টি উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। বিশ্ব অর্থনীতি যখন স্বাভাবিক থাকবে, তখনো যদি বিকল্প অর্থনীতি রাষ্ট্রের স্বার্থে লাভজনক হয়, তাহলে সেটাকেই প্রাধান্য দিতে হবে।

মূলত দেশীয় উপাদানভিত্তিক ধারণা বিকল্প অর্থনীতির মূলশক্তি হিসেবে কাজ করবে। জ্বালানিসম্পদের যাতে কোনোভাবে ঘাটতি না হয়, সে বিষয়টাকে মাথায় রেখে দেশীয় সম্পদ ও কৌশল ব্যবহার করে জ্বালানির চাহিদা মেটাতে হবে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির সর্বোত্তম ব্যবহারের সুযোগ আমাদের রয়েছে। আমাদের দেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির নীতিমালায় জ্বালানির মূল উৎস হিসেবে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, বায়োমাস, হাইড্রো, বায়োফুয়েল, জিয়োথারমাল, নদীর স্রোত, সমুদ্রের ঢেউ, জোয়ার বা টাইডাল ইত্যাদিকে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু এগুলোকে বাণিজ্যিক রূপ দিয়ে এখনো জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে বা জ্বালানির ক্ষেত্রে বিদেশনির্ভরতা কমাতে সেভাবে ব্যবহার করা যায়নি। এগুলো নিয়ে দেশে অনেক গবেষণা হলেও সে গবেষণার ফল বাস্তবে প্রয়োগ করার সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। এ ছাড়া জ্বালানির এই উৎসগুলোর কার্যক্ষমতা কিভাবে বাড়িয়ে জ্বালানি শক্তির উৎপাদন বাড়ানো যায়, তা নিয়ে গবেষণার পরিধি বাড়াতে হবে। কারণ গবেষণা এমন এক শক্তি, যা জ্বালানি উৎসগুলোর কার্যক্ষমতা বাড়াতে যে বিষয়গুলো এর সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারে, তা শনাক্ত করে জ্বালানি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এই উৎসগুলোর বাইরে আমাদের দেশে আর কী কী নতুন ধরনের জ্বালানিশক্তির উপাদান রয়েছে, তা গবেষণার মাধ্যমেই বের করে আনা সম্ভব। জ্বালানি গবেষণায় সব সময় দেশে পাওয়া যায় এমন কাঁচামাল ও উৎসগুলোকেই প্রাধান্য দিতে হবে। জ্বালানির মতো করে কৃষিভিত্তিক গবেষণাকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে সব ধরনের কৃষিজ উপাদান দেশ থেকেই সংগ্রহ করা যায়।

কৃষি গবেষকরা দেশীয় সব ধরনের উপাদান ব্যবহার করে কৃষিক্ষেত্রে যে স্বনির্ভরতা আনার চেষ্টা করে যাচ্ছেন, তা প্রশংসনীয়। তবে ধান, গম, আলুর মতো অন্যান্য কৃষিজ পণ্যে আমরা কিভাবে অন্যের ওপর নির্ভরশীলতা দ্রুত কমিয়ে এনে স্বনির্ভর হতে পারি, তা নিয়ে গবেষণা পরিকল্পনাকে আরো ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করতে হবে। আমাদের দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আবাদি জমির পরিমাণ কম ও জনসংখ্যার আধিক্য। তবে যেখানেই চ্যালেঞ্জ থাকে, সেখানেই গবেষণার সম্ভাবনা তৈরি হয়। দেশের অর্থনীতিকে বিদেশমুখী না করে গবেষণামুখী অর্থনীতিতে পরিণত করতে পারলেই সব ধরনের সমস্যার সমাধান সম্ভব। আমাদের বিশাল জলসীমা আমাদের সম্পদ। এই সম্পদের বহুমুখী ব্যবহার গবেষণার ওপর ভিত্তি করে নিশ্চিত করতে হবে। এখন পর্যন্ত আমাদের দেশ বস্ত্রশিল্পের ওপর নির্ভরশীল। কেবল একটি বা দুটি শিল্পের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে নতুন নতুন শিল্পধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমাদের শিল্পের ক্ষেত্রকে বাড়াতে হবে। যেমন—এ ক্ষেত্রে ম্যাটেরিয়াল, ন্যানোটেকনোলজি ও কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির বিষয়গুলো উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে এই শিল্পগুলোর কাঁচামাল সংগ্রহের ক্ষেত্রে বিদেশনির্ভরতা না রেখে দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমাদের দেশের গবেষকরা এখন দেশীয় কাঁচামাল ব্যবহার করে অনেক মূল্যবান ম্যাটেরিয়াল, ন্যানো প্রডাক্ট ও রাসায়নিক উপাদান দেশেই উৎপাদন করছেন। আমাদের দেশের বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ এবং তার বিবিধ অংশ থেকে এ ধরনের শিল্প-কারখানার কাঁচামাল সংগ্রহ করা সম্ভব। দেশের গবেষণাভিত্তিক অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার ও শিল্প-কারখানার মধ্যে ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের বলয় গড়ে তুলতে হবে। গবেষকদের গবেষণা সুবিধা ও মূল্যায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। গবেষণাভিত্তিক অর্থনীতির ধারণাকে প্রসারিত করতে হবে এবং গবেষণা খাতে বাজেটের পরিমাণ বাড়াতে হবে।

উন্নয়ন সেটাকেই বলি, যেটা বিদেশনির্ভরতা ছাড়াই মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো তার নিজস্ব সম্পদ থেকে পূরণ করতে পারে। কিন্তু কিছু মানুষ নিজের স্বার্থে দেশকে বাইরের দেশের ওপর নির্ভরশীল করে রেখে দেশে এগুলোর সক্ষমতা সৃষ্টিতে বাধা তৈরি করে। কারণ দেশ মৌলিক চাহিদার উপাদানগুলো তৈরির মাধ্যমে স্বনির্ভর হলে বিদেশ থেকে সেগুলো আর আমদানি করার সুযোগ থাকবে না। তখন নিজের পকেটও ভারী করা যাবে না।

অন্যের ওপর ভর করে উন্নয়নকে গ্যাস বেলুনের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। নিজেদের অভ্যন্তরীণ সম্পদের সর্বোচ্চ ও সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে উন্নয়নকে বটগাছের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বেলুন বটগাছকে অতিক্রম করে ক্রমেই ওপরে উঠতে থাকে। সেটা টেকসই উন্নয়ন নয়। কারণ যত দ্রুত ওপরে উঠতে থাকে, গ্যাস ফুরোলে তার চেয়েও দ্রুততর সময়ে বেলুন ক্রমেই নিম্নমুখী হয়ে তার অস্তিত্ব হারায়। কিন্তু মাটির গভীরে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে থাকা শিকড় বটগাছকে সব সময় তার জায়গায় শক্ত করে ধরে রাখে। এ ধরনের উন্নয়ন সব সময় টেকসই হয়।

আমাদের দেশের গবেষকরা দেশীয় রিসোর্স ব্যবহার করে অনেক মৌলিক ও ফলিত গবেষণা করছেন। কিন্তু যখন দেখি সেগুলোর বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার মতো যে হাতগুলো দরকার, তারা হাত গুটিয়ে বসা, তখন খুব কষ্ট হয়। তারাই আবার বিদেশে গিয়ে আধুনিক গবেষণা দেখে তাদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে দ্বিধা করে না। আমাদের দেশের গবেষকরা উঁচুমানের গবেষণা করেও কোনো মূল্য পান না। কারণ দেশের গবেষণাকে বাণিজ্যিক রূপ দিলে অনেকে বিদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের অবৈধ সুযোগ হারাবে। দেশ যদি গবেষণা করে সেগুলো বানিয়ে ফেলে, তাহলে বিদেশ থেকে আমদানি করার সুযোগ থাকবে না। অনেকের ব্যক্তি ও গোষ্ঠী স্বার্থ অর্জিত হবে না।

তাই বিষয়গুলো নিয়ে সবাইকে ভাবতে হবে। সমাধানসূত্র বের করে আনতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর

 



সাতদিনের সেরা