kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দীর্ঘ বঞ্চনার ফল আজকের চা শ্রমিক আন্দোলন

ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক শাকিল

২০ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দীর্ঘ বঞ্চনার ফল আজকের চা শ্রমিক আন্দোলন

ভারতীয় উপমহাদেশ তথা আসাম ও বাংলাদেশে চা-শিল্পের গোড়াপত্তন থেকেই শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁদের সুযোগ-সুবিধা ও মজুরি নিয়ে অসন্তোষ চা চাষাবাদের জন্মলগ্ন থেকেই। তবে ৯ আগস্ট থেকে দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা করার দাবিতে আন্দোলন, দাবি আদায়ে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি, চা-বাগানের নিকটবর্তী এলাকায় মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়ক অবরোধ ও এক দফার দাবিতে অনড় অবস্থান কেবল দেশের চা-শিল্পের জন্য অশনিসংকেত নয়; বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং দেশের চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতায় ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। রাষ্ট্র যখন ডলারের সংকট ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস নিয়ে মহাচিন্তায় চা-পাতা আহরণের ভরা মৌসুমে চা শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে রপ্তানিমুখী এই শিল্প মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম।

বিজ্ঞাপন

বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী কৃষিজ পণ্য পাটশিল্প ধ্বংসের পর চা-শিল্পই ছিল আমাদের ভরসা ও অবলম্বন। আর শ্রমঘন চা-শিল্প খাতের মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চরম ব্যর্থতায়ই আজ দেশের ১৬৭ বাগানে তালা ঝুলছে। এ ব্যর্থতার দায় কেউ এড়াতে পারে না

বর্তমান মুদ্রাস্ফীতি ও দেশের শ্রমের মূল্যের চিত্র দেখে চা শ্রমিকদের চাপা ও প্রকাশ্য অসন্তোষ, উপার্জিত অর্থ দিয়ে সংসার পরিচালনায় হিমশিম এবং দৈনন্দিন খরচাপাতির সংস্থান না হওয়া তো কারো অজানা নয়। তাহলে কেন শ্রমিকদের বাগান থেকে বের হয়ে রাস্তায় নামার আগেই তাঁদের মজুরি নিয়ে মালিক ও সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিল না? তাহলে কি সবাই চা-শিল্প নিয়ে চরম উদাসীন? আর শ্রমিকরা চা-পাতা আহরণের এ ভরা মৌসুমে কেন এতটা হার্ড লাইনে গেলেন তারও হিসাব মেলাতে পারছেন না অনেকে।

গত প্রায় দুই সপ্তাহে অনেক চায়ের কুঁড়ি বড় পাতায় পরিণত হয়েছে। যে পাতা দিয়ে চা উৎপাদন সম্ভব নয়। আবার ছিঁড়ে আনা দুটি পাতা একটি কুঁড়ির স্থানেই অনেক টেম বা নতুন কুঁড়ি জন্ম নেয়। ফলে কুঁড়ি তোলা বন্ধ থাকায় নতুন কুঁড়িও জন্মাবে না। ফলে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, শ্রমিক আন্দোলনের কারণে কেবল হবিগঞ্জ জেলায় দৈনিক প্রায় ৮৫ হাজার কেজি চা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে দৈনিক ক্ষতি হচ্ছে প্রায় আড়াই কোটি টাকা (প্রতি কেজি ৩০০ টাকা দরে)। যত দিন যাচ্ছে পরিস্থিতি তত জটিল হচ্ছে।

সরকার চা শ্রমিক নেতা ও মালিকপক্ষকে নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছে। বৈঠকে দৈনিক মজুরি ১৪ টাকা বাড়িয়ে ১৩৪ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়। বর্তমান দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দীর্ঘদিন মজুরি বৃদ্ধি প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় এ ধরনের প্রস্তাব চা শ্রমিকরা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এমন একটি আন্দোলন দেশের ১৬৭ চা-বাগানে একযোগে চা-পাতা আহরণের ভরা মৌসুমে শুরু হবে এ রকম তথ্য কি সরকারের কাছে ছিল না? এটা ভুলে গেলে চলবে না, চা শ্রমিকরা আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক। সিলেট বিভাগে অন্তত পাঁচ-ছয়টি আসন আওয়ামী লীগ পায় চা-বাগানের শ্রমিকরা গণহারে নৌকায় ভোট দেওয়ার জন্যই। পাকিস্তান শাসনালে বঙ্গবন্ধু যখন চা বোর্ডে প্রথম বাঙালি চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন, তখন চা শ্রমিকদের জন্য অনেক হিতকর কাজ করেছেন। দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে অংশগ্রহণ, মুক্তিযুদ্ধে হাজারো চা-কন্যার সম্ভ্রমহানি, চা শ্রমিকদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা এবং দেশকে পাকিস্তানি শাসক-শোষকদের কবল থেকে মুক্ত করার জন্য রক্তদান ও ত্যাগ-তিতিক্ষাকে বঙ্গবন্ধু বিশেষভাবে মূল্যায়ন করেছেন। আর সে জন্যই জাতীয় নির্বাচনে চা-বাগান এলাকাগুলোতে প্রায়ই বলতে শোনা যায়, অমুক সাহেব তো ভালো; কিন্তু নৌকা মার্কা নিয়ে ইলেকশন করেন না কেন? আজ বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দেশ পরিচালনা করছেন। এই সময়ে চা শ্রমিকদের রাস্তায় নামার বিষয়টি তাদের চরম দুর্ভাগ্য।

সরকার ২০১০ সালে চা শ্রমিকদের জন্য একটি মজুরি বোর্ড গঠন করে। শুরুতে ৪৮ টাকা দৈনিক মজুরির সুপারিশ কার্যকর হয়। প্রতি পাঁচ বছর পর বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা সংশোধন করার কথা থাকলেও ২০২১ সালের ১৩ জুন অর্থাৎ ১১ বছর পর বর্তমান মজুরির গেজেট হয়। যদিও মালিকপক্ষ তা ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকেই কার্যকর করে। মজুরি বোর্ডের নির্লিপ্ততার জন্য মালিক, শ্রমিক ও সরকার একে অপরকে দোষারোপ করছে।

চা-শিল্পের আজকের সংকটের বীজ শুরুতেই বপন হয়ে আছে। ব্রিটিশরা চীন থেকেই মূলত চা আমদানি করত। ১৬১০ সালে চীন-জাপান সংকটে ব্রিটেনে চীনারা চা রপ্তানি বন্ধ করে দেওয়ায় ব্রিটিশরা তVলীন ভারতের বাংলাদেশ ও আসামে চা চাষের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে গঠিত রয়াল কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে আজ থেকে ১৬৮ বছর আগে ভারতের বিহার, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, ওড়িশা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে কানু, তেলেগু, লোহার, রবিদাস, গোয়ালাসহ প্রায় ১১৬টি জনগোষ্ঠীকে চা-বাগানের শ্রমিক হিসেবে নিয়ে আসে। দুর্গম এলাকায় জঙ্গল-আবর্জনা পরিষ্কার করে বিভিন্ন ধরনের জন্তু ও সরীসৃপের সঙ্গে জীবন বাজি রেখে সংগ্রাম করে চা চাষের আবাদ শুরু করেন তথাকথিত এসব অস্পৃশ্য সমাজের লোকরা। ব্রিটিশরা ‘গাছ নাড়লে টাকা ঝড়বে’ বা ‘চা-পাতা একসময় সোনার পাতা হবে’—এসব প্রলোভন দেখিয়ে তাদের নিয়ে আসে। ১৮৬৩ থেকে ১৮৬৬ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলে ৮৪ হাজার ৯১৫ জন চা শ্রমিক আনা হয়। যার মধ্যে অনাহারে-অর্ধাহারে, অসুখে-বিসুখে ৩০ হাজার শ্রমিক মারা যান।

১৯২১ সালের ২০ মে রাতের অন্ধকারে হাজারো শ্রমিক চাঁদপুরের মেঘনা ঘাট হয়ে তাঁদের নিজেদের দেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তদানীন্তন ব্রিটিশ গুর্খা রেজিমেন্টের সেনারা কয়েক হাজার শ্রমিককে হত্যা করে। বাকিরা নিজ নিজ চা-বাগানে ফিরে আসেন। তাঁদের আর নিজেদের মুল্লুকে ফেরা সম্ভব হয়নি। প্রতিবছর ২০ মে চা-বাগানগুলোতে ‘মুল্লুকে চলো’ দিবস পালন করা হয়। তবে ভাবতে অবাক লাগে, ১৬৮ বছরে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি এখনো ১৬৮ টাকা হয়নি। এর পরও এসব শ্রমিক নিজ হাতে দেশে কোটি কোটি চায়ের চারা লাগিয়েছেন। বাগান পরিচর্যা করে আসছেন। আজ ধর্মঘটে তাঁদের চোখের সামনে তাঁদের লাগানো ও পরিচর্যাকৃত চা-বাগান ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এটা দেখে তাঁদেরও হৃদয়ে রক্তক্ষরণ যে হচ্ছে না সেটা কিন্তু বলা যাবে না। আর মালিকদের কোটি টাকার বিনিয়োগ তাঁদের চোখের সামনে শেষ হয়ে যাচ্ছে, সেটাও তাঁরা মানতে পারছেন না। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত যেতে হতে পারে সংকট উত্তরণে, সেটাই আমার ধারণা। তবে যত দ্রুত সংকট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হবে, ততই মঙ্গল।

 

 লেখক : অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও

প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

[email protected]



সাতদিনের সেরা