kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

নিজেদের সমস্যায়ও নজর দিতে হবে

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

২০ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



নিজেদের সমস্যায়ও নজর দিতে হবে

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন দুটি লড়াই চলছে। একট হচ্ছে কভিড-পরবর্তী সময়ের প্রভাব কাটিয়ে ওঠা এবং অন্যটি চলমান রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব মোকাবেলা করা। শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বই এ দুই প্রপঞ্চের সঙ্গে লড়াই করছে। এর সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে বৈশ্বিক সমস্যার কথা বলে নিজেদের দায় এড়ানোও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

বিজ্ঞাপন

কারণ সমস্যা দুটি বিশ্বজনীন হলেও কাকে কতটা আঘাত করবে তা নির্ভর করে প্রতিটি দেশের শাসনব্যবস্থা, পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা, অর্থনৈতিক শক্তি এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর। এ জন্যই বৈশ্বিক সমস্যার সঙ্গে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর দিকে বিশেষ মনোযোগ দিতে হয়।

বাংলাদেশের জন্য একই কথা প্রযোজ্য। বাংলাদেশকে মনে রাখতে হবে যে অর্থনীতিতে আমাদের কতগুলো সমস্যা আগে থেকেই চলে আসছে। যেমন—ব্যাংকিং অব্যবস্থাপনা, অর্থপাচার, দুর্নীতি, অর্থের অপচয়, আয় ও সম্পদের বৈষম্য, ব্যাংকঋণে বৈষম্য, কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনার অভাব, আবহাওয়াজনিত দুর্যোগ ইত্যাদি। বিদ্যমান এ সমস্যাগুলো যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার প্রচেষ্টার সঙ্গে একযোগে আমাদের বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবেলা করতে হবে।

কভিড-পরবর্তী সময়ে হঠাৎ করেই বিশ্বব্যাপী পণ্য সরবরাহ চেইনে বিরাট সমস্যা দেখা দেয়। এর পরপরই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। জ্বালানি, খাদ্যপণ্যসহ অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের সরবরাহের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে থাকে। এসব পণ্যের দাম হু হু করে বাড়তে থাকে। তবে কয়েক দিন ধরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমে আসা এবং ইউক্রেন থেকে গম ও ভুট্টা রপ্তানি শুরু হওয়ায় কিছুটা ভালো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে বিশ্ববাজার আগের মূল্যে ফিরে যাওয়া এখনো অনেক বাকি।

এই পরিস্থিতিতে আমরা কতটা ঘুরে দাঁড়াতে পারব সেটা নির্ভর করছে আমাদের সক্ষমতার ওপর, বিশেষ করে বিদ্যমান সমস্যাগুলো কতটা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারব। এই মুহূর্তে আমাদের দেশে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি এবং টাকার অবমূল্যায়ন ঘটছে। দ্রব্যমূল্য প্রতিদিনই বাড়ছে। রপ্তানি আয় তুলনামূলক মন্থর, জনশক্তি রপ্তানির গতি হ্রাস, বৈধ উপায়ে রেমিট্যান্স আসা কমে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলো তো আছেই। ফলে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে চাপ পড়েছে। এটা অস্বীকার করা যাবে না। এর বড় সমস্যাটি হলো সব মানুষের জীবনযাত্রার মান নিচে নেমে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষই বেশি কষ্টের সম্মুখীন হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মানুষের মধ্যে হাতাশা ও আতঙ্ক সৃষ্টি হচ্ছে। এটা দেশের উন্নয়নের জন্য, বিশেষ করে টেকসই উন্নয়নের জন্য মোটেও সুখকর নয়। আমাদের দুটি অর্জন হচ্ছে নিম্নমধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানো এবং উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়া। এ দুটি অর্জন এখন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ ছাড়া এসডিজি অর্জনের প্রচেষ্টাও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠবে। মোটকথা অর্থনীতিতে আমরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যে পারফরম্যান্স দেখিয়েছি এবং বর্তমানেও যা আছে, তা ভবিষ্যতে ধরে রাখতে পারব কি না প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকার আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও এডিবির কাছে অর্থ চেয়েছে। আমি মনে করি, এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কারণ সরকার বাজেট সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংক, এডিবির কাছে অর্থ চাইতেই পারে। বাজেটে দেশের জন্য প্রয়োজনীয় কতগুলো বিষয় থাকে, যা পূরণ করার মতো সম্পদের ঘাটতি আমাদের রয়েছে। এই মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ হলো বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের বিষয়টি। এর জন্য আইএমএফের কাছে অর্থ চাওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নিজেদের দর-কষাকষির সক্ষমতা দেখাতে হবে।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের কিছু মূল্যায়ন রয়েছে। এই মূল্যায়নের ভিত্তিতে কতগুলো বিষয় চিহ্নিত করেছে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি। এর মধ্যে তিনটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সংস্থাটির মতে, প্রথমত, বাংলাদেশ উন্নত হচ্ছে বটে; কিন্তু এখানে কেবল বড় বড় শিল্পের উন্নতি হচ্ছে। অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প মোটেও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত হচ্ছে না। সাধারণত ব্যাংকঋণও তাদের কাছে যায় না। আমাদের অর্থনীতির বড় একটি দুর্বলতা হচ্ছে এটি। এ কারণেই বিশ্বব্যাংক মনে করে, আমাদের শিল্পের ভিত্তিটা অনেক ছোট। আমরা বুঝতে চাচ্ছি না যে শুধু বড় শিল্প নিয়েই একটা দেশের শিল্পের ভিত্তি তৈরি হয় না।

দ্বিতীয়ত, আমাদের রপ্তানি মূলত তৈরি পোশাকভিত্তিক। বলতে গেলে একটাই পণ্য। তৈরি পোশাক খাতে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উৎপাদনশীলতা। এ খাতের উৎপাদনশীলতায় এখনো আমাদের দেশ অনেক পিছিয়ে। এখানে স্বল্প মজুরি এবং স্বল্প মার্জিনে ব্যবসা করছেন মালিকরা। প্রতিযোগিতায় সক্ষম একটি শক্ত ভিত্তির ওপর এ শিল্প দাঁড়িয়ে আছে—এমনটা বলার সুযোগ নেই। এভাবে চলতে থাকলে পোশাক খাতে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ অন্য উদীয়মান দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবে না। ভারতও ভালো করছে। এসব দেশ এ খাতের উৎপাদনশীলতা, সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ও আধুনিকায়নে এগিয়ে গেলেও আমরা খুব একটা এগোতে পারিনি। এ খাতে কমপ্লায়েন্সে কিছু উন্নতি হয়েছে বটে; কিন্তু উৎপাদনশীলতায় আমরা এখনো পিছিয়ে। বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে হলে এদিকে নজর দিতে হবে।

তৃতীয় কৃষি খাত। আমরা শতভাগ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এটা বলার সুযোগ নেই। আমাদের প্রচুর পরিমাণে গম আমদানি করতে হয়। এখন চালও আমদানি করতে হচ্ছে। কৃষি খাত একটা জায়গায় এসে থমকে গেছে। সরকার বিভিন্ন জায়গায় প্রণোদনা দিচ্ছে; কিন্তু কৃষকদের নতুন প্রযুক্তি, কৃষি উপকরণ, কৃষি বাজারজাতকরণ—এসব ব্যাপারে উৎসাহ প্রদানের অভাব রয়েছে। আমাদের কৃষি খাতে কৃষি সম্প্রসারণের মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের বিরাট অবদান রয়েছে। কিন্তু তাদের তৎপরতা আর আগের মতো নেই। শস্য উৎপাদনের বাইরে কৃষি খাতের অন্তর্ভুক্ত পশু পালন, মৎস্য চাষ ও পোল্ট্রিগুলোও থমকে আছে। তাদের প্রতি সহায়তার পরিমাণ খুব বেশি বাড়েনি।

এই তিনটি বিষয় আমাদের বিশেষভাবে বিবেচনায় নিতে হবে। এটা শুধু বিশ্বব্যাংক নয়, বাইরের অনেকেই আমাদের দেশের অর্থনীতি মূল্যায়ন করতে গিয়ে এ কথাগুলো বলেছেন। আমাদের অভ্যন্তরীণ বিশেষজ্ঞরাও বিষয়গুলোর কথা বলে আসছেন। আমি মনে করি, এ তিনটি জায়গায় সরকারের বিশেষ তৎপরতা দরকার।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্যাংক খাত চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। এখানে চরম অব্যবস্থাপনা চলছে। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক চেষ্টা করছে এ খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার। এরই মধ্যে সমস্যায় থাকা ১০টি ব্যাংক চিহ্নিত করেছে। কিন্তু শুধু ১০টি ব্যাংকই কেন? আমার জানা মতে, অন্যান্য ব্যাংকেও সমস্যা আছে। কয়েকটা ব্যাংক বাছাই করে তাদের মনিটর করা হবে এবং বাকিগুলো আড়ালে থাকবে—এটা হয় না। এ খাতের শৃঙ্খলার জন্য প্রয়োজন হলো সার্বিক নিয়ন্ত্রণ। নিয়ম-নীতির পরিপালন যাতে সঠিকভাবে হয়—এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংককে শক্ত হতে হবে।

সুদের হারে নয়ছয় বিষয়টি নিয়েও ভাবার আছে। আমানতে সুদের হার ৬ শতাংশ করার ফলে লোকজনের মধ্যে সঞ্চয় প্রবণতা কমে গেছে। এ সময়ে এসে মানুষের মধ্যে সঞ্চয়ের আকাঙ্ক্ষাও কমে গেছে। অথচ সঞ্চয় কমে গেলে দেশের সম্পদ কমবে, বিনিয়োগ কম হবে। শুধু বাইরে থেকে ঋণ নিয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। আবার ব্যাংকঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার ৯ শতাংশ স্থির রাখারও নেতিবাচক দিক আছে। কারণ বড় শিল্পপতিরা এর সুবিধাটা পাচ্ছেন। ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা বলতে গেলে পাচ্ছেনই না। এ ছাড়া সুদের হার এক অঙ্কের ঘরে থাকায় প্রকৃতপক্ষেই যাঁদের ঋণের দরকার নেই, তাঁরাও ঋণ নেন। তাঁরা ঋণটা নিয়ে হয় অন্য কাজে লাগান, না হয় পাচার করে দেন। ফলে সঞ্চয় ও ঋণের এই নয়ছয়ের ফাঁদ নিয়েও ভাবতে হবে।

আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো স্ট্রাকচারাল বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব। যেমন—ব্যাংক, ইনস্যুরেন্স, বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা এবং উন্নয়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান—এগুলোর কর্মদক্ষতা, সক্ষমতা, সততা এবং তাদের উদ্যোগ ও উদ্যম বাড়ানো দরকার। না হলে সমস্যাগুলো থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের কঠিন হবে। এমন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আমাদের মানবসম্পদ উন্নয়ন, কারিগরি শিক্ষার দিকে জোর দিতে হবে। আমাদের রাজস্ব আহরণও সক্ষমতার চেয়ে অনেক কম। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে এ বিষয়ে সচেষ্ট হতে হবে। আর সমতাভিত্তিক টেকসই উন্নয়নের জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। না হলে বৈশ্বিক দুর্যোগ পরিস্থিতি আমাদের সহজেই কাবু করে ফেলতে পারবে।

 

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়



সাতদিনের সেরা