kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ অক্টোবর ২০২২ । ২১ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

পোলিও : পুরনো শত্রুর আগমনে বিপদ বাড়বে

অনলাইন থেকে

১৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



পোলিও : পুরনো শত্রুর আগমনে বিপদ বাড়বে

ছয় দশকেরও বেশি সময় পর এখন কল্পনা করাও কঠিন তৎকালীন সময়ে পোলিও টিকার কার্যকারিতার সংবাদটি কতটা আনন্দ ও স্বস্তি বয়ে এনেছিল। তখন সংবাদটি প্রচারিত হওয়ার পরপরই আমেরিকার গির্জাগুলোর ঘণ্টা বেজে উঠেছিল, শিশুদের স্কুলে ছুটি দেওয়া হয়েছিল, মানুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরেছিল। এতটা আনন্দিত হওয়ার কারণ ছিল, পোলিও এমন একটি ভাইরাস, যা পক্ষাঘাতগ্রস্ত করতে পারে, এমনকি কখনো কখনো মৃত্যুর কারণ হতে পারে।

পরবর্তী সময়ে ভাইরাসটির বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত থাকায় একে নির্মূল করার কাজটি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে যায়।

বিজ্ঞাপন

এটাকে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সাফল্যের অন্যতম গল্প মনে করা হয়। এখন এটা ভাবাও যায় না যে ৩০ বছর আগে বিশ্বে প্রতিবছর তিন লাখ ৫০ হাজার শিশু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতো। এরই মধ্যে তিনটি বন্য পোলিও প্রজন্মের মধ্যে দুটি নির্মূল করা হয়ে গেছে। আর দুই বছর আগে আফ্রিকাকে বন্য পোলিওমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।

বৈশ্বিক স্বাস্থ্যে এই সাফল্য পাওয়ার পর সম্প্রতি লন্ডনে নর্দমার পানিতে পোলিও ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেল। এর পরপরই কর্তৃপক্ষ লন্ডনের এক থেকে ৯ বছর বয়সী সব শিশুকে টিকা কিংবা টিকার বুস্টার ডোজ দেওয়ার অভিযান শুরু করেছে। একই ধরনের পরীক্ষায় ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়া গেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক নগরেও। সেখানে নগরের উত্তরাংশে বসবাসকারী এক ব্যক্তি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন। যুক্তরাষ্ট্রে পোলিও আক্রান্তের ঘটনা প্রায় এক দশকের মধ্যে এটাই প্রথম। ইসরায়েলও ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো পোলিও রোগী শনাক্ত হয়েছে। মনে হচ্ছে এসব ঘটনাই আন্ত সম্পর্কিত।

পোলিওর টিকা প্রদানের হার যুক্তরাজ্য ও অন্য অনেক জায়গায় বেশ ভালো। এই টিকার আওতায় আসা ভৌগোলিক পকেটগুলোর অর্থ হচ্ছে প্রাদুর্ভাবগুলো অপেক্ষাকৃত কমসংখ্যক লোকের জন্য হুমকি। আর টিকাদানের সাফল্যের অর্থ হচ্ছে শিশুদের ‘আয়রন ফুসফুসে’ (যান্ত্রিক শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যবস্থা) যাওয়ার ভয়ানক দৃশ্য দেখতে হবে না। মনে করা হয়েছিল, এই বিপদটি বাস্তব ও বর্তমানের চেয়ে অনেক বেশি দূরের এবং তাত্ত্বিক। এর মধ্যে সাধারণ টিকা দ্বিধাগ্রস্ততা বা টিকা বিরোধিতাও নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উন্নয়নশীল বিশ্বের কিছু অংশে এখন এই পোলিও ঝুঁকি অনেক বেশি। গত বসন্তে পাকিস্তান এক বছরেরও বেশি সময় পর প্রথম পোলিও আক্রান্তের ঘটনা সরকারিভাবে জানিয়েছে। মোজাম্বিক ৩০ বছরের মধ্যে প্রথম বন্য (তবে আমদানীকৃত) পোলিও আক্রান্তের ঘটনা নিশ্চিত করেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে আফ্রিকার আরেক দেশ মালাউতে অনুরূপ ধরন শনাক্ত হয়েছে। মূলত করোনাভাইরাস মহামারি এসে সব টিকা কমর্সূচিকে খুব বিঘ্নিত করেছিল। এর সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও অন্যান্য অস্থিতিশীলতা মিলে গত এক দশকে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে যে সাফল্য পাওয়া গিয়েছিল, সেটাকে উল্টো জটিল করে তুলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফ আশা করেছিল যে ২০২১ সালটি হবে পুনরুদ্ধারের বছর। কিন্তু সম্প্রতি তারা সতর্ক করেছে যে প্রায় ৩০ বছর সাফল্যের পর বিশ্বের শিশু টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের পতন ঘটেছে। এর কারণ হচ্ছে ২০১৯ সালের তুলনায় এই সময়ে বিশ্বে ৬৭ লাখের বেশি শিশু পোলিও টিকার তৃতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে। এ ছাড়া দুই কোটি ৫০ লাখ শিশু ডিপথেরিয়া, টিটেনাস ও হুপিং কাশির টিকার এক বা একাধিক ডোজ মিস করেছে। আর হামের টিকাদানের হার ২০০৮ সালের পর এই প্রথম সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। এমন একসময়ে এই তথ্য প্রকাশ পেল যখন বিশ্বে খাদ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে মারাত্মক অপুষ্টির আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে এবং শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করছে। আর কভিড-১৯ সম্পর্কিত ভুল তথ্য টিকাবিরোধী প্রচারকে আরো জোরদার করেছে।

এখন মানুষকে আশ্বস্ত করা দরকার যে পোলিও টিকা শুধু কার্যকর ও নিরাপদই নয়, বরং খুব ভালোভাবে প্রতিষ্ঠিত। এর সঙ্গে সতর্ক করাও জরুরি যে নতুন শত্রুর মধ্যেই পুরনো শত্রুর ফিরে আসা আমাদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতিকে মারাত্মক হুমকির মধ্যে ফেলতে পারে। একই সঙ্গে টিকাদানের সুবিধা বাড়াতে হবে। যখনই টিকাদান শুরু হবে, তখন ব্যস্ত মা-বাবাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তাঁদের জন্য টিকাকে আরো সহজলভ্য করার ব্যবস্থা করতে হবে। এটা হতে পারে কমিউনিটি সেন্টার বা বিদ্যালয়ে। মনে রাখা দরকার যে যুক্তরাজ্য বা নিজেদের দেশকে রক্ষার বিষয়টি নির্ভর করে অন্য দেশগুলো একই প্রচেষ্টা কতটুকু চালাতে পারছে।

লজ্জার বিষয় হচ্ছে, ব্রিটেন বিশ্বব্যাপী ভাইরাস নির্মূল অভিযানের তহবিল হ্রাস করেছে, যেখানে ৪৬০ কোটি মার্কিন ডলারের তহবিল প্রয়োজন। কভিড এই স্বতঃসিদ্ধ সত্যকে পরিচিত করে তুলে যে সবাই নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত কেউই নিরাপদ নয়। এটি অতীতে যেমন প্রযোজ্য ছিল, তেমনি বিদ্যমান হুমকি মোকাবেলায়ও প্রযোজ্য।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য) ভাষান্তরিত

 



সাতদিনের সেরা