kalerkantho

শনিবার । ১ অক্টোবর ২০২২ । ১৬ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

১৭ আগস্ট: পুনরাবৃত্তি রোধে সতর্ক হতে হবে

মো. জাকির হোসেন

১৭ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



১৭ আগস্ট: পুনরাবৃত্তি রোধে সতর্ক হতে হবে

২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট। ঝলমলে সূর্যের হাসিমাখা সকালটি শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। কিন্তু বেলা গড়াতেই সারা দেশ থেকে আসতে থাকে বোমা হামলার খবর। জঙ্গিদের বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিল সেদিন সারা দেশ।

বিজ্ঞাপন

একটি-দুটি জেলা নয়, মুন্সীগঞ্জ বাদে দেশের ৬৩টি জেলার ৪৩৪টি স্থানে বোমা হামলা হয় এই দিনে। তা-ও প্রায় একযোগে হামলা হয় সকাল ১১টা থেকে ১১টা ৩০ মিনিটের মধ্যে। হামলায় দুজন নিহত ও শতাধিক মানুষ আহত হন। সুপ্রিম কোর্ট, জেলা আদালত, বিমানবন্দর, দূতাবাস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, প্রেস ক্লাব ও সরকারি-আধাসরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বেছে নিয়েছিল হামলাকারীরা।

হামলার স্থানগুলোতে জঙ্গি সংগঠন জেএমবির লিফলেট পাওয়া গিয়েছিল। লিফলেটগুলোতে বাংলাদেশে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠাসহ বিচারকদের প্রতি হুমকির বার্তা দেওয়া হয়েছিল। এতে লেখা ছিল, ‘দেশের কর্মরত বিচারকদের প্রতি একটি বিশেষ বার্তা পাঠালাম। দ্রুত দেশে ইসলামী হুকুমত কায়েম করতে হবে। নতুবা কঠিন পথ বেছে নিতে বাধ্য হবে জেএমবি। ইসলামী হুকুমত কায়েমের বিষয়ে তাদের সঙ্গে দেশ-বিদেশের অনেক শক্তিশালী দেশ ও শীর্ষ রাজনৈতিক দল একমত পোষণ করেছে। অতএব যাঁরা বিচারক আছেন, তাঁরা তাগুতি (মানবসৃষ্ট) আইন বাদ দিয়ে ইসলামী আইনে বিচার করবেন। নতুবা আরো ভয়াবহ বিপদ আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছে। এই সতর্কবাণীর (সিরিজ বোমা হামলা) পর আমরা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করব। তারপর আবার হামলা শুরু হবে। ’

ইতিহাসের পাতায় এমন ঘটনা নজিরবিহীন। একটি দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ জেলায় একযোগে বোমা হামলার দ্বিতীয় কোনো নজির আমাদের জানা নেই। পুলিশ সদর দপ্তর ও র‌্যাবের তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার পরপরই সারা দেশে ১৫৯টি মামলা করা হয়, যার মধ্যে ১৪৩টি মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বাকি ১৬টি মামলায় ঘটনার সত্যতা থাকলেও আসামি শনাক্ত করতে না পারায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ১৫৯টি মামলার মধ্যে ৯৭টির বিচার সম্পন্ন হয়েছে। এসব মামলায় ৩৩৪ জনকে দণ্ডিত করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে ২৭ জনের বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দেওয়া হয়। এর মধ্যে আটজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৪৬টি মামলা বিচারাধীন।

এমন পরিকল্পিত সমন্বিত হামলা কি হঠাৎ করেই ঘটেছে? একটি দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে ৬৩টি জেলার চার শতাধিক স্থানে হামলা করার মতো সাংগঠনিক কাঠামো, সক্ষমতা, গোপন রাখার প্রক্রিয়া কি রাতারাতি অর্জন করা সম্ভব হয়েছে? তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ পর্যালোচনায় এটি স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে সিরিজ বোমা হামলা আকস্মিকভাবে হয়নি। বোমা হামলার আগে জঙ্গি সংগঠন বিভিন্ন স্থানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিরাও ওই সময় তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন বলে একাধিক শীর্ষ জঙ্গি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে। এমনকি তাদের জবানবন্দিতে বেরিয়ে এসেছে জঙ্গিরা তখন এক স্থান থেকে আরেক স্থানে রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী গাড়িতে করে গেছে। বোমা হামলার পর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়েছে হামলার পেছনে ইন্ধনদাতা ছিলেন বিএনপির আট মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য। তাঁদের নামও সেই সময় পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

সিরিজ বোমা হামলার আগে জেএমবি বোমা হামলার একাধিক ড্রেস রিহার্সাল করেছে। জেএমবি প্রথম সংগঠিত নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড শুরু করে ২০০১ সালে। ওই বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার একটি সিনেমা হলে বোমা হামলা করে তারা। এর পরের বছর ২০০২ সালের ১ মে নাটোরের একটি সিনেমা হলে এবং একই বছরের ৭ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের চারটি সিনেমা হলে একযোগে বোমা হামলা করে। কিন্তু তৎকালীন সরকার জঙ্গি হামলাগুলোকে রাজনৈতিক প্রলেপ মাখিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করে। এই সুযোগে দেশজুড়ে জেএমবি বিস্তার লাভ করে। ২০০৪ সালে রাজশাহীর বাগমারা, নওগাঁর আত্রাই ও রানীনগর এলাকায় চরমপন্থী নিধনের নামে জেএমবির অন্যতম শুরা সদস্য সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলা ভাই ব্যাপক তাণ্ডব চালায়। বাগমারায় বাংলা ভাইয়ের কর্মকাণ্ডের কারণে পত্রপত্রিকায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে ‘বাংলা ভাই’ মিডিয়ার সৃষ্টি বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ফলে জেএমবি খুব সহজেই নিজেদের শক্তিশালীভাবে সংগঠিত করতে পেরেছে। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার শুধু জেএমবিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে তা নয়, আরেক জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদকেও (হুজি) ব্যবহার করেছে।

সিরিজ বোমা হামলার সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে জেএমবি আত্মঘাতী বোমা হামলা শুরু করে। ধারাবাহিক বোমা হামলায় বিচারক, আইনজীবীসহ ৩০ জন নিহত হন। আহত হন চার শতাধিক। ২০০৫ সালের ৩ অক্টোবর চট্টগ্রাম, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুরের আদালতে জঙ্গিরা বোমা হামলা চালায়। এতে তিনজন নিহত এবং বিচারকসহ কমপক্ষে ৫০ জন আহত হন। এর কয়েক দিন পর সিলেটে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিপ্লব গোস্বামীর ওপর বোমা হামলার ঘটনায় তিনি ও তাঁর গাড়িচালক আহত হন। ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠিতে বিচারকদের বহনকারী গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা হামলা চালায় আত্মঘাতী জঙ্গিরা। এতে নিহত হন ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতের বিচারক জগন্নাথ পাঁড়ে ও সোহেল আহম্মদ। এই হামলায় আহত হন অনেক মানুষ। সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটে ২৯ নভেম্বর গাজীপুর বার সমিতির লাইব্রেরি প্রাঙ্গণে। গাজীপুর বার লাইব্রেরিতে আইনজীবীর পোশাকে প্রবেশ করে আত্মঘাতী এক জঙ্গি বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। এই হামলায় আইনজীবীসহ ১০ জন নিহত হন। নিহত হয় আত্মঘাতী হামলাকারী জঙ্গিও। একই দিন চট্টগ্রাম আদালত চত্বরে জেএমবির আত্মঘাতী জঙ্গিরা বিস্ফোরণ ঘটায়। সেখানে রাজিব বড়ুয়া নামের এক পুলিশ কনস্টেবল ও একজন সাধারণ মানুষ নিহত হন। পুলিশসহ আহত হন প্রায় অর্ধশত। ১ ডিসেম্বর গাজীপুর ডিসি অফিসের গেটে আবারও বোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সেখানে নিহত হন গাজীপুরের কৃষি কর্মকর্তা আবুল কাশেম। এ ঘটনায় কমপক্ষে ৪০ জন আহত হন। ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনায় ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। নেত্রকোনা শহরের বড়পুকুরপার উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর অফিসের সামনে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায় আত্মঘাতী জঙ্গি দল। সেখানে স্থানীয় উদীচীর দুই নেতাসহ আটজন নিহত হন। আহত হন শতাধিক। অবশেষে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর ঝালকাঠিতে দুই বিচারক হত্যা মামলার রায়ে ২০০৭ সালের ৩ মার্চ শীর্ষ ছয় জঙ্গির ফাঁসি কার্যকরের মাধ্যমে জেএমবির একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন, শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। সিরিজ বোমা হামলার বেশির ভাগ মামলার রায় হয়েছে। এখন আর ১৭ আগস্টের বোমা হামলা নিয়ে আতঙ্ক, দুশ্চিন্তা কিংবা আলোচনার কী আছে? আজকের নতুন প্রজন্ম, যারা সেই সময়ে ছোট ছিল বা যাদের জন্ম সেই ভয়াল হামলাগুলোর পরে, তাদের জানা উচিত সেই সময়ের ভয়াল ঘটনার ইতিবৃত্ত। আর যারা ঘটনার কথা সেই সময় জেনেছে, কিন্তু দীর্ঘ ১৭ বছর পর স্মৃতির পরতে প্রলেপ পড়েছে, তাদেরও এ ঘটনা স্মরণে রাখা দরকার। যেসব কারণে এই ভয়াল ঘটনা, সেগুলো ভুলে গেলে চলবে না। এর মধ্যে অন্যতম হলো—এক. এ হামলার ঘটনা বাংলাদেশের নিরাপত্তা এবং একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ও ইমেজের সঙ্গে জড়িত। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জানা উচিত কারা জঙ্গিদের প্রতি সহানুভূতিশীল, কোন রাজনৈতিক দলের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে জঙ্গিবাদ বেড়ে উঠেছে এই বাংলার প্রান্তরে? দুই. একটি বিষয় আজও অমীমাংসিত রয়ে গেছে। দেশের ৯৯ শতাংশ জেলার একটি-দুটি স্থানে নয়, ৪৩৪টি স্থানে বোমা রাখা হয়েছে। অনেক স্পর্শকাতর স্থানে বোমা রাখা হয়েছে। আমাদের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা লোকজন এতগুলো স্থানে বোমা রাখার ঘটনা কেন আগে জানতে পারলেন না? যদি আগে না জানতে পারেন, তাহলে তো আমাদের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাব্যবস্থায় মারাত্মক ত্রুটি ছিল। আর আগে থেকে জেনেও যদি চুপ থাকেন, তাহলে তা আরো ভয়ংকর ব্যাপার। কারণ জেনে চুপ থাকা মানে রাষ্ট্রযন্ত্রের জঙ্গিবাদের সহযোগী হওয়া। তিন. বারবার জঙ্গিগোষ্ঠীর হামলার শিকার হওয়া আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহিষ্ণুতা নীতি অবলম্বন করার পরও নব্য জেএমবি ২০১৬ সালে হলি আর্টিজানে ভয়ংকর জঙ্গি হামলা চালায়। এতে ১৭ জন বিদেশি, দুজন পুলিশ কর্মকর্তা ও জঙ্গিসহ ২৪ জন নিহত হন। ওই বছরের ৭ জুলাই শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশসহ চারজন নিহত হন, আর আহত হন অনেকেই।

অতি সম্প্রতি একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদন বলছে, সার্বিক পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে যেকোনো সময় পরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি বা স্থাপনায় হামলা চালানো হতে পারে। রাজধানীসহ সারা দেশে হামলা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। গত ১২ আগস্ট রাজধানীর শ্যামলীতে ব্যানারবিহীন একটি মিছিল থেকে পুলিশের গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনার সূত্র ধরে এসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে সতর্ক থাকতে সারা দেশে বার্তা পাঠানো হয়েছে। চার. বাংলাদেশে আল্লাহর আইন তথা ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সিরিজ বোমা হামলার সঙ্গে লিফলেট প্রচার করা হয়। জঙ্গিদের এরূপ আহ্বানে কেউ যাতে বিভ্রান্ত না হয় সে জন্যও এ ঘটনা স্মরণ রাখা দরকার।

১৭ আগস্টের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে রাষ্ট্রের পাশাপাশি জনসাধারণকেও ভূমিকা পালন করতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের সচেতনতা ও সতর্কতা আবশ্যক।

লেখক : অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা