kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

আফগানিস্তানের দুঃস্বপ্ন তীব্র হচ্ছে

অনলাইন থেকে

১৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আফগানিস্তানের দুঃস্বপ্ন তীব্র হচ্ছে

তালেবানের কাবুল দখল করার এক বছর পূর্ণ হয়েছে সোমবার। বিষয়টি শুধু একটি সরকারের পতন নয়, বরং একটি জাতির স্বপ্নের পতনকেও নির্দেশ করে। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিষয়টিকে এভাবেই বর্ণনা করেছিলেন এক আফগান। কেউ কেউ অবশ্য আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনাদের বিদায়, দুই দশক ধরে বেসামরিক লোকদের ভয়ংকর হতাহতের ঘটনা এবং দুর্নীতির পর শান্তির সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

তবে এটিও ঠিক যে দেশটিতে সহিংসতা ও আত্মঘাতী বোমা হামলা সত্ত্বেও অনেকের জন্যই এই বছরগুলো গড় আয়ু ও সাক্ষরতার বৃদ্ধি এবং নতুন সুযোগ ও আকাঙ্ক্ষা তৈরিতে ভূমিকা রাখে। যেমন গ্রামীণ এলাকা ও বড় শহরগুলোর নারীরা শিক্ষা ও চলাফেলার স্বাধীনতা চেয়েছিল।

দেশটিতে দুঃস্বপ্ন আরো গভীর হচ্ছে। আফগানরা এখন তালেবান নিপীড়ন ও গণক্ষুধার সঙ্গে দিন কাটাচ্ছে। দাবি করা হয়েছিল যে ২০ বছর পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট উত্খাত হওয়ায় বিশ্ববাসী এক মধ্যপন্থী তালেবানকে দেখতে পাবে। এটি সত্য যে অনেকেই যেভাবে দেশটিতে গণমৃত্যুদণ্ডের আশঙ্কা করেছিল, বাস্তবে তেমনটি ঘটেনি। আবার এটিও ঠিক, তালেবানের ক্ষমতা নেওয়ার পর দেশটিতে সমালোচক ও বিরোধীদের হত্যা করা হয়েছে, নির্বিচারে আটক ও নির্যাতন করা হয়েছে এবং মিডিয়াকে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছে।

দেশটিতে বাস্তববাদী ও কট্টরপন্থীদের মধ্যে একটি লড়াই চলছে। মার্চ মাসে উত্ফুল্ল মেয়েরা তাদের লেখাপড়া পুনরায় শুরু করার জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে গিয়েছিল। কিন্তু এর পরপরই স্কুলগুলো আবারও বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাদের শুধু বলা হয়েছিল যে শিক্ষা কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বাতিল করার কারণে তাদের জন্য ক্লাসরুমগুলো আপাতত বন্ধ থাকবে। এ ছাড়া নারীদের অনেক কাজ করা থেকে নিষিদ্ধ করা হয় এবং পুরুষ অভিভাবক সঙ্গে না থাকলে ভ্রমণ বা কাজে যেতে বাধা দেওয়া হয়। তালেবানের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলামী ড্রেস কোডের সঙ্গে সংগতি রেখে তাদের শরীর বা মুখ ঢেকে রাখার আদেশ দেওয়া হয়। অন্যথায় কাউকে কাউকে হুমকি দেওয়া বা মারধর করা হয়।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এখন পর্যন্ত অন্তত তালেবান তাদের পূর্বসূরিদের চেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু তারা একটি গেঁয়ো বিদ্রোহকে জাতীয় সরকারে রূপান্তর করতে চাইলেও অর্থনৈতিক পতনের মুখে তিন কোটি ৮০ লাখ আফগানের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারছে না। সত্য কথা হলো, আফগান নাগরিকদের ওপর দমনপীড়ন চালানো তাদের খাবারের নিশ্চয়তা দেওয়ার চেয়ে সহজ।

জাতিসংঘ আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকট বলে অভিহিত করেছে, যেখানে মা-বাবাকে কিডনি ও সন্তান বিক্রি করার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি দেশটির প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করছে। এর মধ্যে যদিও যুক্তরাষ্ট্র মানবিক সহায়তার জন্য কিছু নিষেধাজ্ঞা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে, তার পরও আফগানদের দরকার হচ্ছে উন্নয়ন সহায়তা ও একটি কার্যকর অর্থনীতি। এর মধ্যে দেশটির মেধাপাচার ঘটছে। এটি কেবল তরুণ পেশাদারদের দেশ ছাড়ার কারণেই নয়, নারীদের প্রতিভার অপচয়ের কারণেও ঘটছে।

এই সময়ে বিশ্বব্যাপী খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং দেশটির প্রতি আন্তর্জাতিক সহানুভূতি হ্রাস আসন্ন শীতে মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনতে পারে। এ ছাড়া তালেবান শাসন শান্তির নিশ্চয়তা দানকারীও নয়। আইএস শাখা ইসলামিক স্টেট-খোরাসান ক্রমাগত আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আবারও বিদ্রোহ শুরু হয়েছে। সত্য হচ্ছে, আল-কায়েদার নেতা আইমান আল জাওয়াহিরি যেভাবে কাবুলে বসবাস করছিলেন, তা মার্কিন সেনা প্রত্যাহার বিষয়ক দোহা চুক্তির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এতে বলা হয়েছিল যে আফগানিস্তান সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেবে না। এই বিষয়টি এখন অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আরো কঠিন করে তুলতে পারে।

তবে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই মাসে কাবুলে মার্কিন হামলায় এক সন্ত্রাসী নিহত হওয়ার খবরটি যখন জো বাইডেন ঘোষণা করেন, তাতে তিনি তালেবানের কথা উল্লেখ করেননি। যুক্তরাষ্ট্র তালেবান সরকারকে সফল হতে দেখতে চায় না, কিন্তু তাদের ব্যর্থ হতে দেওয়াও উচিত নয়। আফগানিস্তান একটি গৃহযুদ্ধে ফিরে যাওয়া মানে পশ্চিমাদের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক, যা আফগানিস্তানকে আরো পেছনে ঠেলবে।

ওয়াশিংটন তার নিজের ভূমিকা ও দায়িত্ব নিয়ে কখনো মাথা ঘামাতে ইচ্ছুক নয়। এর ওপর জনগণের উদ্বেগ এখন আফগানিস্তান থেকে ইউক্রেনের দিকে ঘুরে গেছে। তাই বলে বসে নেই কিছু আফগান। দেশটির অনেক নারী ও পুরুষ তালেবানের নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস দেখিয়েছে; কিশোর-কিশোরীরা গোপনে স্কুলে যাচ্ছে। যেসব আফগান যুক্তরাজ্য ও অন্যত্র পালিয়ে গিয়েছিল, তারা এখনো তাদের জীবন পুনর্নিমাণ করতে সক্ষম হয়নি। তবে এসব প্রচেষ্টা আশা জোগায়, আরো ভালো কিছু দাবি করে।

 

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য) ভাষান্তরিত

 



সাতদিনের সেরা