kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

গম উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন

ড. নরেশ চন্দ্র দেব বর্মা

১৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



গম উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন

স্বাধীনতা-পূর্ব সময়ে গম অপ্রচলিত ফসল হিসেবে গণ্য হতো এবং এ অঞ্চলে গম পরিচিত করার বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা পর্যায়ে সীমিত ছিল। তবে সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গম ফসলকে ধানের বিকল্প খাদ্য হিসেবে বিবেচনা করে সত্তরের দশকের প্রারম্ভেই বাংলাদেশে গম আবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত তথা গমের আবাদ দ্রুত সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ১৯৭২ থেকে ১৯৮১ সময়কালের মধ্যে সরকার ‘ত্বরান্বিত গম গবেষণা কর্মসূচি’ এবং এর ধারাবাহিকতায় ‘সম্প্রসারিত গম গবেষণা কর্মসূচি’ শীর্ষক দুটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে। আন্তর্জাতিক ভুট্টা ও গম গবেষণা কেন্দ্র (সিমিট), মেক্সিকো কর্মসূচি বাস্তবায়নে কারিগরি সহযোগিতা প্রদান করে।

বিজ্ঞাপন

কৃষক পর্যায়ে দ্রুত নতুন জাতের গম আবাদ সম্প্রসারণ এবং বীজ ও উপকরণ সরবরাহকাজে যথাক্রমে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন বিশেষ ভূমিকা পালন করে। এর ফলে গমের আবাদ ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয় এবং ১৯৭১-৭২ থেকে ১৯৮০-৮১ সালের মধ্যে গমের আবাদ ১.২৭ লাখ থেকে ৫.৯১ লাখ হেক্টরে উন্নীত হয় এবং গমের উৎপাদন ১.১ লাখ টন থেকে ১০.৯ লাখ টনে উন্নীত হয়। এই সময়ের মধ্যে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে কিছুটা পরিবর্তন আসে এবং ভাতের পাশাপাশি মানুষ গমজাত খাবার গ্রহণে অভ্যস্ত হয়। এ সফলতা থেকেই গম গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে দিনাজপুরে ১৯৮৪ সালে গম গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করা হয়। পরবর্তী সময়ে এ কেন্দ্র থেকে গমের বেশ কিছু উচ্চ ফলনশীল ও রোগ প্রতিরোধী জাত এবং উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়, যা দেশের অভ্যন্তরীণ গম উৎপাদন বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

সরকার গৃহীত বিভিন্ন উৎপাদন পরিকল্পনা এবং মাঠ পর্যায়ে উচ্চ ফলনশীল জাত ও উৎপাদন প্রযুক্তি মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে ১৯৯৯ সালে গমের আবাদ রেকর্ড ৮.৫ লাখ হেক্টরে এবং উৎপাদন ১৯ লাখ টনে উন্নীত হয়। কিন্তু পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ফসল যেমন বোরো ধান, হাইব্রিড ভুট্টা, আলু, উচ্চমূল্যের সবজি ইত্যাদি ফসলের সঙ্গে প্রতিযোগিতার কারণে গমের আবাদ ও উৎপাদন দ্রুত কমতে থাকে। এ ছাড়া গমের মূল্যহ্রাস এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে গমের ফলন কমার কারণেও কৃষকরা গম চাষে আগ্রহ হারাতে থাকেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গমের আবাদ ১৯৯৯ সালের তুলনায় অর্ধেকে নেমে আসে। তবে গমের উচ্চ ফলনশীল, রোগ প্রতিরোধী এবং তাপ সহনশীল জাত, লাগসই প্রযুক্তি এবং মানসম্পন্ন বীজ মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে সাম্প্রতিক সময়ে হেক্টরপ্রতি জাতীয় গড় ফলন ৩.৬০ টনে উন্নীত হয়।

গমের আবাদ ক্রমাগতভাবে কমতে থাকলেও গম ও গমজাত খাদ্যের চাহিদা প্রতিবছরই বাড়তে থাকে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বেকারিশিল্প, বিস্কুটশিল্প ও ফাস্ট ফুড রেস্টুরেন্টের সংখ্যাও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় গমের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ১৯৭২ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ২৫ লাখ টন থেকে প্রায় ৭৫ লাখ টনে উন্নীত হয়। গমের এ চাহিদা মেটাতে আমদানি প্রায় ৬০ লাখ টনে উন্নীত হয়। বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ এখন গম আমদানিকারক দেশের মধ্যে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশ সাধারণত প্রায় ৫০ শতাংশ গম রাশিয়া ও ইউক্রেন থেকে এবং বাকি ৫০ শতাংশ গম ভারত ও অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করে থাকে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে বিশ্ববাজারে গমসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রীর দাম অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে এবং গমের মূল্য মে ২০২২ মাসে টনপ্রতি ৫২৯ ইউএস ডলারে বৃদ্ধি পায়, যা গত তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ এবং গত সাত মাসে গমের মূল্য প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পায় (উৎস : ইনডেক্স মুন্ডি)। বর্তমান বাজারমূল্যে ৬০ লাখ টন গমের আমদানি মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩.০ বিলিয়ন ইউএস ডলার। এমন বিশ্ব পরিস্থিতিতে আমদানি চাপ কমাতে গমের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। এ জন্য প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর ও বাস্তবমুখী উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

বর্তমান সরকার দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। নতুন আশা ও সম্ভাবনা নিয়ে গম ও ভুট্টা ফসলের উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০১৭ সালে গম গবেষণা কেন্দ্রকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউটে উন্নীত করা হয়। নতুন ইনস্টিটিউট হিসেবে স্থাপনের পর থেকে এখানকার বিজ্ঞানীরা গম-ভুট্টা গবেষণা ও উন্নয়নে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকটি উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই জাতগুলোর উৎপাদনশীলতা হেক্টরপ্রতি পাঁচ থেকে ছয় টন, প্রতিকূল পরিবেশ সহনশীল এবং রোগ প্রতিরোধী। এ ছাড়া গমের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ প্রতিষ্ঠান থেকে বেশ কিছু উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবনসহ নতুন জাতগুলোর মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদনেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

গমের দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কৌশলগত উৎপাদন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। দুটি উপায়ে গমের উৎপাদন বাড়ানো যেতে পারে : ১. উন্নত জাত ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে গমের ফলন বৃদ্ধি এবং ২. অপ্রচলিত এলাকায় গমের আবাদ সম্প্রসারণের মাধ্যমে গমের উৎপাদন বৃদ্ধি। গমের সব আধুনিক জাত ও প্রযুক্তির বহুমাত্রিক প্রদর্শনী, মানসম্পন্ন বীজের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ওপর কৃষক প্রশিক্ষণ, মাঠ দিবস, কর্মশালা, বহুমাত্রিক প্রচার ইত্যাদির মাধ্যমে গমের উৎপাদন ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং গম চাষকে লাভজনক করা সম্ভব। অন্যদিকে বিভিন্ন অপ্রচলিত এলাকায় গমের আবাদ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলে দেশজ ভাণ্ডারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গম যুক্ত হবে।

 

লেখক : সিনিয়র স্পেশালিস্ট (মাঠ শস্য), কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন এবং

সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ গম ও ভুট্টা গবেষণা ইনস্টিটিউট

 



সাতদিনের সেরা