kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

দিল্লির চিঠি

দুই দেশের ঐক্য বিপন্ন করা চলবে না

জয়ন্ত ঘোষাল

১৬ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



দুই দেশের ঐক্য বিপন্ন করা চলবে না

তখন সবে সাংবাদিকতায় এসেছি। প্রবীণ এক সাংবাদিক বলেছিলেন, পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি সব সময়ই বিরোধীদের রাজনৈতিক হাতিয়ার। শাসকদলকে সব সময় সেটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে মোকাবেলা করতে হয়। শুধু পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নয়, যেকোনো জিনিসের দাম বাড়া মানেই সেটা প্রতিষ্ঠানবিরোধী জনমত পাবে।

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ দাম বাড়াকে কোনোভাবেই কোনো শাসকদল জাস্টিফাই করতে পারে না। আবার যখন যারা বিরোধী দল হয়, তখন মূল্যবৃদ্ধি কেন হচ্ছে তার জন্য তারা শাসকদলকে দোষারোপ করে। এমনটাই দস্তুর।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর জওয়াহেরলাল নেহরু তৎকালীন বিভিন্ন প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীদের চিঠি লিখতেন। সেই সব চিঠিতে বহু জায়গায় তিনি লিখেছেন, এই মুহূর্তে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি। আজ ২০২২ সালে দাঁড়িয়েও দেখা যাচ্ছে, শুধু ভারত নয়, উপমহাদেশের সর্বত্রই একটা বড় সমস্যা হলো এই মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি।

সম্প্রতি বাংলাদেশে পেট্রল ও ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দেশজুড়ে দেখলাম নানা রকমের জনবিক্ষোভের ছবি। আবার এটাও দেখলাম, সরকারের পক্ষ থেকে সবিস্তার ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো হলো, কেন এত দিন পর এই মূল্যবৃদ্ধি করতে তারা বাধ্য হয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির ফলে ভর্তুকির যে লাগাতার সমস্যা, সেই সমস্যার সমাধান হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিশ্বজুড়ে যে এই আর্থিক সংকট, তাতে স্বাবলম্বী অর্থনীতির জন্যই এই অর্থ রাজস্ব সংগ্রহ করা প্রয়োজন।

এখন বাংলাদেশের পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। এমনটাই সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যাচ্ছে। তবে ভারতের সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারছি যে শুধু বাংলাদেশ নয়, আজ গোটা দুনিয়ার অর্থনীতি বিপর্যস্ত। অনেক সময় রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শাসকদল অর্থনৈতিক সংকটগুলো ধামাচাপা দিয়ে অন্যান্য বিষয়ে অগ্রাধিকার দেয়, যেটা ভারতে খুব বেশি করে দেখতে পাচ্ছি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সমস্যা, কর্মহীনতা, বেকারত্ব, আর্থিক ঘাটতি, জিডিপির পতন—সব একটা ভয়াবহ জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেটা কমবেশি সব অর্থনীতিবিদই স্বীকার করছেন। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন সংসদে দাঁড়িয়ে এই সংকটজনক পরিস্থিতি স্বীকার করে বলেছেন, এই সংকট থেকে উদ্ধারের রাস্তাও ভারত দিতে পারছে।

আমি এ কথা নিশ্চয়ই মানব, শ্রীলঙ্কার যে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আজ যেভাবে শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি চোরাবালিতে ঢুকে গেছে, সে সমস্যা ভারতেরও নেই, বাংলাদেশেরও নেই। কাজেই আজ যাঁরা বাংলাদেশের পেট্রোপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে চিৎকার জুড়ে দিয়েছেন যে বাংলাদেশটা শ্রীলঙ্কার অর্থনীতিতে পর্যবসিত হলো, তাঁরা মনে হয় ভাবের ঘরে চুরি করছেন। কেননা বাংলাদেশের অর্থনীতি আর শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি যে এক নয়, সেটা অমর্ত্য সেন ও অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় শুধু নয়, গোটা পৃথিবীর অর্থনীতিবিদরা স্বীকার করছেন। বরং বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ, তারা মানছে বাংলাদেশ অনেক বেশি আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে গেছে। আর্থিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যায়নি বলেই আইএমএফ পাকিস্তানকে ঋণ দিতে রাজি নয়। পাকিস্তান এখনো চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আমেরিকার মাধ্যমে দৌত্য করছে। বাংলাদেশকে আইএমএফ সব সময় ঋণ দিতে এ জন্য প্রস্তুত যে ঋণটা কাজে লাগিয়ে, ঋণের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ যথেষ্ট ভালো রেকর্ড দেখিয়েছে।

কিছুদিন আগে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলাটা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটা পরিণত কূটনৈতিকমনস্কতা, সেটাও আমরা দেখলাম। সেই পররাষ্ট্রনীতির সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করার জন্য চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হওয়া উচিত। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক তো আজকের নয়, বহুদিন আগে থেকেই এই সম্পর্ক রয়েছে। চীন অতীতে যাই করে থাকুক না কেন, এখন বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। এমনকি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের একটা প্রতিরক্ষা চুক্তিও অনেক দিন থেকে আছে। চীনের সঙ্গে এই সম্পর্ক রক্ষা করলেও শ্রীলঙ্কা যে রকমভাবে চীনের ঋণের ফাঁদে জড়িয়ে গিয়ে বিপদে পড়ল এবং নাস্তানাবুদ হলো, বাংলাদেশ কিন্তু সেটা করতে রাজি নয়। আর বাংলাদেশ যে রাজি নয়, সেটা এবার যখন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশে গেলেন, তখন বাংলাদেশ সেটা বুঝিয়ে দিল।

সুতরাং সেদিক থেকে দেখতে গেলে এই পরিস্থিতিতে যাতে কোনো আর্থিক সংকটের দিকে বাংলাদেশ না যায় তার জন্য উদ্বেগ আছে ভারতেরও। ভারত মনে করে, ভারত ও বাংলাদেশ—এই দুই দেশের অর্থনীতি একজনের সঙ্গে আরেকজন অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয়ে রয়েছে। ভারত আর্থিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং এই সংকট থেকে ভারতও চায় মুক্ত হতে। কভিডও দেশের অর্থনীতিকে সাংঘাতিকভাবে বিপর্যস্ত করেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ যদি কোনো কারণে আর্থিক সংকটের গহ্বরে নিমজ্জিত হয়, তাহলে সেটাও হবে ভারতের স্বার্থপরিপন্থী। সুতরাং ভারত চাইবে যাতে বাংলাদেশ কখনোই সেই সংকটে ডুবে না যায়। এখন গোটা পৃথিবীর যা পরিস্থিতি, বিশেষত ইউক্রেন যুদ্ধের পর, তাতে ভারত ও বাংলাদেশকে আজ আরো বেশি করে হাতে হাত ধরে চলতে হবে।

এখন সমস্যা হচ্ছে, ভারতের যে রাজনৈতিক স্থায়িত্ব, তাতে ভারতবাসী মনে করেছিল, যেহেতু নরেন্দ্র মোদি সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এসেছে এবং এখানে কোনো খণ্ডিত জনাদেশ নয়, যেমনটা কোয়ালিশন যুগে হয়েছিল—সেহেতু এখানে সরকার সঠিকভাবে নীতিনির্ধারণ করতে পারবে। নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে টানাপড়েন থাকবে না এবং তাতে জনগণের সুবিধা হবে।

৭৫ বছরের স্বাধীনতা দিবস চলে গেল। অর্থাৎ ভারত ৭৫ বছরের বৃদ্ধে পরিণত হয়েছে। সেই যেখান থেকে শুরু করেছিলাম, মূল্যবৃদ্ধি ও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে নেহরুর যে আক্ষেপ, মোদি সরকারও ১০ বছরে সেই আর্থিক সংকট থেকে ভারতকে মুক্ত করতে পারছে না।

এখন এই পরিস্থিতিতে সিবিআই ও এনফোর্সমেন্টের মতো গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যেভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। গরু পাচার থেকে শুরু করে শিক্ষাক্ষেত্রে নানা রকমের দুর্নীতি এবং নানা বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারকেও কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার জেরবার করে দিয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের অভিযোগ, এর মধ্যে রাজনৈতিক অভিসন্ধি আছে। রাজনৈতিকভাবে এটা করা হচ্ছে। অর্থাৎ এই এজেন্সিগুলোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। সোনিয়া গান্ধী ও রাহুল গান্ধীর বিরুদ্ধেও ন্যাশনাল হেরাল্ডের মামলা তুলে সেখানেও আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছে। এখন এই বিরোধী শিবির যদি বিরোধিতা করতে আসে, তাহলে তাতে রাজনৈতিকভাবে অস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থাৎ সিবিআই ও এনফোর্সমেন্ট ব্যবহার করে বিজেপির হাত শক্ত করা হচ্ছে। এই অভিযোগটা আজ ধীরে ধীরে দেশজুড়ে তৈরি হতে শুরু করেছে। তাতে এক অন্য ধরনের অস্থিরতাও তৈরি হচ্ছে।

বিরোধী দলগুলো ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের আগে এই ব্যাপারটাকে বিরাটভাবে ইস্যু করে মোদির বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়ার চেষ্টা করছে। যদিও এই মুহূর্তে নরেন্দ্র মোদির কোনো বিকল্প নেই এবং এই মুহূর্তে বিরোধীদের ঐক্যও ছত্রভঙ্গ। তাহলেও এই ইস্যুটা যে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করছে, সেটা এই দেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার বদলে কিঞ্চিৎ দুর্বল করছে। তাই ভারত ও বাংলাদেশ—এই দুটি দেশেরই যে সংকট তার থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য হাতে হাত ধরাটা খুব জরুরি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ও ভারত—দুই দেশেরই মৌলবাদী শক্তি এখন যথেষ্ট সক্রিয়। সেই মৌলবাদী শক্তি হাসিনাকে দুর্বল করতে চায়, তারা ভারত বিরোধিতার তাস খেলতে চায়। তারা এখন মূল্যবৃদ্ধির ইস্যুটাকে মূলধন করে হাসিনা সরকারকে বরখাস্ত করতে চায় এবং অগণতান্ত্রিক শাসনের দিকেও ঠেলে দিতে চায় বাংলাদেশকে। যেসব শক্তি কাজ করছে, সেখানে কোনো বিদেশি শক্তিরও একাংশ যদি থাকে, তাহলেও আমি অবাক হব না। কেননা বারবার দেখা গেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক সময় সার্বভৌম রাষ্ট্রকে অস্থির করার জন্য বাইরের শক্তিও কাজ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে ভারত ও বাংলাদেশের মানুষকে সজাগ হতে হবে, সচেতন হতে হবে। ক্ষুদ্র রাজনীতির জন্য আমাদের দুই দেশের ঐক্যকে বিপন্ন করা চলবে না। আজ গোটা দুনিয়া যখন একটা সাংঘাতিক প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন আমাদের আরো অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

 লেখক : নয়াদিল্লিতে কালের কণ্ঠের

বিশেষ প্রতিনিধি

 



সাতদিনের সেরা