kalerkantho

বুধবার । ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৩ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি : ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা চরম ঝুঁকিতে

ড. মো. ওয়াকিলুর রহমান

১৪ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



কৃষি উপকরণের মূল্যবৃদ্ধি : ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষিরা চরম ঝুঁকিতে

বাংলাদেশে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, নারী ও বর্গাচাষির সংখ্যা প্রায় ৮৪.৩৫ শতাংশ। এসব কৃষক তাঁদের উৎপাদিত পণ্য সংগ্রহের পর কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এর অন্যতম কারণ হলো তাঁদের পণ্য উৎপাদনে যে উপকরণ খরচ হয় তা ধারদেনা করে নির্বাহ করতে হয়। ধারদেনা মিটিয়ে যা অবশিষ্ট অর্থ থাকে তা দিয়ে পরিবারের ব্যয় নির্বাহ এবং পরবর্তী ফসল উৎপাদনের জন্য ব্যয় করে থাকেন।

বিজ্ঞাপন

এই চক্রাকার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে এবং তাঁদের এই দৈন্যদশা দিন দিন বাড়ে বৈ কমে না। তাঁদের এই নিম্নগামী অবস্থা আরো দুর্বিষহ হয় যখন উপকরণের দাম বেড়ে যায়। কৃষি উৎপাদনের অন্যতম উপকরণ হলো বীজ, সার, সেচ, মজুরি, কীটনাশক ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, বেশির ভাগ কৃষক এখন বীজ নিজ সংগ্রহে রাখেন না, বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে চড়া দামে কিনে থাকেন।

অপরপক্ষে কৃষকরা ফসলভেদে সারের জন্য প্রায় ১৩-২০ শতাংশ ব্যয় করে থাকেন। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, আর্থিক দৈন্যের কারণে প্রান্তিক, নারী ও বর্গাচাষিরা তুলনামূলক (পরিমিত মাত্রা অপেক্ষা) কম পরিমাণে সার ব্যবহার করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে দোকান থেকে অধিক দামে বাকিতে সার ক্রয় করেন। নতুন করে ইউরিয়া সারের মূল্যবৃদ্ধিতে (কেজিপ্রতি ছয় টাকা) তাঁদের অতিরিক্ত ৩৭.৫ শতাংশ ব্যয় বাড়াতে হবে, যা সার্বিক উৎপাদনপ্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে। ইউরিয়া সারে ভর্তুকির ফলে উপকরণ ও উৎপাদন খরচ দুটিই কমে। ফলে এর উপকারভোগী সর্বস্তরের মানুষ। অপরপক্ষে বর্ধিত দামের কারণে উৎপাদক ও ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হন। উল্লেখ্য, গত ১৫ বছর সারের চাহিদা ও জোগান পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে ইউরিয়া সারের চাহিদা ছিল ২৮.১৪ লাখ মেট্রিক টন এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ছিল ১৪.০০ লাখ মেট্রিক টন, বাকি সার আমদানি করে চাহিদা মেটানো হয়। ছয় বছর ধরে ইউরিয়া সারের চাহিদা কিছুটা কমে ২৪-২৬ লাখ মেট্রিক টন স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা না বাড়িয়ে আমদানি নির্ভরতা বাড়ানো হয়েছে। গত ছয় বছর অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ১০.০০ লাখ মেট্রিক টন সীমাবদ্ধ রেখে আমদানিতে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। ফলে অধিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে এবং ভর্তুকির পরিমাণ দিন দিন বেড়েই চলছে। বিদেশ নির্ভরতার নীতি-কৌশলের দায় কেন গরিব কৃষকের ঘাড়ে চাপানো হলো তা বোধগম্য নয়।

কৃষকরা যখন ইউরিয়া সারের অতিরিক্ত দাম সমন্বয় করতে হিমশিম খাচ্ছেন, ঠিক তখনই ডিজেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি (৪২.৫ শতাংশ) ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ববাজারে যখন তেলের দাম স্থিতিশীল বা কমতে শুরু করেছে, তখনই তেলের মূল্যবৃদ্ধি মানুষের মনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। আইএমএফকে খুশি করার জন্যই কি এই মূল্যবৃদ্ধি? ডিজেলের এই মূল্যবৃদ্ধি সেচ খরচ অনেক গুণ বাড়িয়ে দেবে। বাংলাদেশে মোট সেচযন্ত্রের প্রায় ৭৮.৪৫ শতাংশ (ডিজেলচালিত ১২.৪৪ লাখ এবং বিদ্যুত্চালিত ৩.৪২ লাখ) ডিজেলচালিত এবং এসব সেচযন্ত্রের মালিক তুলনামূলক কম সচ্ছল। যাঁরা একটু সচ্ছল তাঁরা বিদ্যুত্চালিত সেচযন্ত্র ব্যবহার করেন। তবে তাঁদেরও নিস্তার নেই, ক্রমাগত লোড শেডিং তাঁদেরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

বাংলাদেশ ক্রমবর্ধমান ফসলের নিবিড়তা (১৯৮ শতাংশ) নিয়ে যে গর্ব করে তা কিন্তু সেচব্যবস্থার উন্নয়ন ও বিস্তারের ফলে সম্ভব হয়েছে। কৃষকরা আজ একই জমিতে বছরে তিন-চারটি ফসল ফলাতে সক্ষম। কৃষি পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, দেশের ৫০.৭৬ শতাংশ জমিতে দুটি এবং ২২.৯৮ শতাংশ জমিতে তিনটি ফসল উৎপাদিত হয়, যা খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে সেচনির্ভর বোরো ধান চাষের ব্যাপকতা বেড়েছে এবং এটি মোট ধান উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি (৫০.০৬ শতাংশ) অবদান রাখছে। অন্যান্য দানাদার শস্য, যেমন—গম ও ভুট্টা এবং আলু, শাক-সবজি, ডাল ও তেলজাতীয় ফসল উৎপাদনেও সেচের প্রয়োজন। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে সেচের অবদান যেমন অপরিসীম, তেমনি পরিমিত ও সময়মতো সেচের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হতে বাধ্য। কাজেই কৃষক যদি সেচের খরচ বাঁচাতে গিয়ে পরিমিত ও সময়মতো সেচ না দেন তবে তার প্রভাব হবে বহুমুখী।

বাংলাদেশে সবচেয়ে সফল যান্ত্রিকীকরণের উদাহরণ হলো পাওয়ার টিলার ও ট্রাক্টরের ব্যাপক ব্যবহার, যা ডিজেলচালিত। বর্তমানে দেশে প্রায় ৭.৪৫ লাখ পাওয়ার টিলার ও ১.৫৮ লাখ ট্রাক্টর রয়েছে। কাজেই ডিজেলের আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি জমি চাষের খরচও বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। শুধু জমি চাষ কেন, শস্য বপন বা রোপণ, কাটা ও মাড়াইযন্ত্রের চাহিদা ও ব্যবহারের যে গতি পেয়েছিল তা-ও স্থবির হয়ে যেতে পারে। দেশে বর্তমানে এক হাজার ৫০০টি বপন বা রোপণযন্ত্র, এক হাজার ৪৩০টি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টার এবং ৩.৯০ লাখ মাড়াইযন্ত্র রয়েছে, যার সংখ্যা বাড়ছে। কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ব্যাহত হলে কৃষি শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যাবে এবং শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি পাবে, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিত্যনতুন রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ফসলে কীটনাশক ও বালাইনাশকের ব্যবহার অনেক গুণ বেড়ে গেছে, যা উৎপাদন ও পরিবেশ উভয়ের জন্য ক্ষতিকর। কয়েক বছর ধরে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাত্রা ও পরিমাণ অনেক বেড়েছে। অনাবৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, তাপমাত্রার তারতম্য ও হাওর এলাকায় আকস্মিক বন্যা এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় আপৎকালীন ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব বিদ্যমান। উল্লেখ্য, নতুন কৃষি বীমা পদ্ধতি কিছু ক্ষেত্রে চালু হলেও তা সর্বজনীন করার তেমন কোনো সরকারি পদক্ষেপ দেখা যায় না। একইভাবে দরিদ্র কৃষকরা প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ থেকে বঞ্চিত হন নিয়মের বেড়াজলে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, নারী ও বর্গাচাষিদের উৎপাদনপ্রক্রিয়ায় সংযুক্ত থাকা দুরূহ হয়ে পড়বে। এই বিশালসংখ্যক কৃষককে উৎপাদনপ্রক্রিয়ার সঙ্গে ধরে রাখতে না পারলে তা খাদ্যনিরাপত্তার সাফল্য ম্লান করে দিতে পারে। এটি সর্বজনস্বীকৃত যে কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও সহনশীলতার কারণে করোনার অভিঘাতে দেশে তেমন কোনো খাদ্যসংকট দেখা যায়নি। পরিতাপের বিষয় হলো, তাঁদের এই অবদানের জন্য অনুপ্রেরণা বা প্রণোদনা না দিয়ে বরং উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি করে কৃষককে নিরাশ করা হলো। উপকরণের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সমন্বয় করে উৎপাদিত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি করলে তা বেশির ভাগ জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতার ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। কাজেই কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে এবং উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সর্বসাধারণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে ইউরিয়া সার ও জ্বালানি তেলের মূল্য পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। একই সঙ্গে কৃষিঋণ স্বল্প সুদে এবং সময়মতো দরিদ্র কৃষকের (ক্ষুদ্র, প্রান্তিক, নারী ও বর্গাচাষির) মধ্যে বিতরণ করে কৃষি উপকরণ কেনার ব্যাপারে সহায়তা প্রদান করা যেতে পারে।

 লেখক : অধ্যাপক, গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

বাকৃবি, ময়মনসিংহ



সাতদিনের সেরা