kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২ । ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

নিকোলা মিকোভিচ

ভূ-রাজনীতির নাটাই এখন এরদোয়ানের হাতে

১২ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



ইউক্রেনে যখন যুদ্ধ চলছে, তখন তুরস্ক রাশিয়া ও পাশ্চাত্যের মধ্যে নিজেকে সেতু হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এটি আংকারার এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যা শুধু কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে নয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ ককেসাস পর্যন্ত তার ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে দেখা করতে রাশিয়ার সোচি রিসোর্টে যান। এর মাত্র ১৭ দিন আগে তাঁরা তেহরানে বৈঠক করেন।

বিজ্ঞাপন

ধারণা করা হয়, বৈঠকে এরদোয়ান সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ চালাতে রাশিয়া ও ইরানের সবুজ সংকেত পেতে চেয়েছিলেন।

চার ঘণ্টার বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পুতিন ও এরদোয়ান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে অকপট, আন্তরিক ও বিশ্বাসযোগ্য সম্পর্কের যথার্থ প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। ’ তাতে আরো বলা হয়, ‘বৈঠকে সিরিয়ার রাজনৈতিক ঐক্য ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষার অপরিহার্যতার বিষয়েও জোর দেওয়া হয়েছে। ’

এই বিবৃতির অর্থ কি তুরস্ক ফের সিরিয়া আক্রমণ করা এবং তুর্কি সীমান্ত বরাবর সিরিয়ার ৩০ কিলোমিটার ভেতরে বাফার জোন তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসবে? এ ক্ষেত্রে ক্রেমলিনের আহ্বান তাৎপর্যপূর্ণ। বৈঠকের আগে ক্রেমলিন সিরিয়াকে অস্থিতিশীল না করার জন্য আংকারার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল, যাতে ‘সিরিয়ার আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক অখণ্ডতা বিপন্ন’ না করার কথা উল্লেখ ছিল।

সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে কুর্দি যোদ্ধাদের বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে তুরস্ক এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদকে সমর্থন দিচ্ছে রাশিয়া। এ অবস্থায় আংকারা যদি সিরিয়ার ব্যাপারে তুরস্ককে ছাড় দিতে মস্কোকে বাধ্য করার চেষ্টা করে, তাহলে কী হবে? এর একটা উদাহরণ হতে পারে এমন যে আংকারা সিরিয়াকে অস্থিতিশীল করার পরিবর্তে পরোক্ষভাবে ককেসাস অঞ্চলের মস্কোর মিত্র আর্মেনিয়াকে অস্থিতিশীল করতে পারে।

যেহেতু মস্কো ব্যস্ত ইউক্রেন নিয়ে, তাই দক্ষিণ ককেসাসে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে মস্কোর আর্মেনিয়াকে সহায়তা করার সুযোগ কম। এর বিপরীতে আংকারার সমর্থন ভালোভাবেই পাবে আজারবাইজান। ফলে অমীমাংসিত নাগোর্নো-কারাবাখ সংঘাতকে ব্যবহার করে ক্রেমলিনের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে আংকারা, যাতে উত্তর সিরিয়ায় সম্ভাব্য তুর্কি অভিযানে চোখ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় মস্কো। যেহেতু ক্রেমলিন এখন কঠিন সময় পার করছে, তাই পুতিনকে হয়তো শেষ পর্যন্ত তাঁর কৌশলগত বন্ধু এরদোয়ানকে কিছু ছাড় দিতেই হবে।

অন্যদিকে এরদোয়ান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য সাধনের উপায় হিসেবে পুতিনকে ব্যবহার করতে পারেন। বলা হচ্ছে যে তুর্কি প্রেসিডেন্ট বলেছেন, পুতিন রাশিয়ায় সামরিক ড্রোন উৎপাদনের জন্য একটি যৌথ কারখানা স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু তুরস্কের ড্রোন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান বায়কারের প্রধান নির্বাহী হালুক বেয়ারাকতার বিষয়টি উড়িয়ে দিয়েছেন, যাদের ড্রোন এরই মধ্যে ইউক্রেন রুশদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। এ ছাড়া ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভও পুতিন-এরদোয়ান বৈঠকে ড্রোন আলোচনার কথা অস্বীকার করেছেন।

যদি ড্রোন নিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে কথাবার্ত না-ও হয়, তবু এরদোয়ান সম্ভবত ওয়াশিংটনকে একটি বার্তা পাঠাচ্ছেন—‘আপনি যদি উত্তর সিরিয়ায় কুর্দি অধ্যুষিত পিপলস ডিফেন্স ইউনিট (ওয়াইপিজি)-এর বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য আমাদের পরিকল্পনার বিরোধিতা অব্যাহত রাখেন, তাহলে আমরা রাশিয়ার কাছে ড্রোন বিক্রি করতে পারি, অথবা মস্কোর সঙ্গে যৌথ ড্রোন উৎপাদন কম্পানি গড়ে তুলতে পারি। ’

এই ধরনের পদক্ষেপ ন্যাটোতে তুরস্কের সদস্য পদের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ এর আগে আংকারার ২০১৯ সালে রাশিয়ান এস-৪০০ অ্যান্টি-মিসাইল সিস্টেম কেনায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল। ফলে এরদোয়ানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের অতিরিক্ত সংঘাতের ঝুঁকি নেওয়া অসম্ভব হবে। তাই তাকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে মৈত্রী এবং রাশিয়ার সঙ্গে অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কই বজায় রাখতে হবে।

ন্যাটোর অন্য মিত্রদের থেকে আলাদা অবস্থান নিয়ে আংকারা পশ্চিমাবিরোধী নিষেধাজ্ঞায় যোগ দেয়নি এবং রাশিয়ার জ্বালানি কেনাও বন্ধ করতে ইচ্ছুক নয়। এ ছাড়া নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে জানা গেছে, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু জ্বালানি সংস্থা রোসাটম সম্প্রতি তুরস্কের একটি পারমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ‘প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলার’ অর্থ বিনিয়োগ করেছে।

সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, আংকারা মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের একটি হলেও সে প্রায় নিশ্চিতভাবেই তার পররাষ্ট্রনীতিতে একটি উল্লেখযোগ্য স্বায়ত্তশাসন রক্ষা করে চলবে। তাই সে রাশিয়ার সঙ্গে তার বাস্তবভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়ন অব্যাহত রাখবে। তুরস্কের এই অবস্থানের কারণে মস্কো অন্তত সাময়িকভাবে একটি অনিবার্য আঞ্চলিক খেলোয়াড় হিসেবে থেকে যাওয়ার সুযোগ পাবে। ইউক্রেনে যুদ্ধের কারণে বেকায়দায় পড়া দেশটি শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ মেয়াদে একটি ভূ-রাজনৈতিক দ্বৈত নৃত্যে তুরস্কের জুনিয়র অংশীদার হয়ে উঠতে পারে। এর ফলে মস্কো ও আংকারা মধ্যপ্রাচ্য থেকে ককেসাস ও কৃষ্ণসাগর অঞ্চল হয়ে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত নেচে বেড়াবে।

 

লেখক : সার্বিয়ার রাজনৈতিক বিশ্লেষক

সূত্র : এশিয়া টাইমস

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 



সাতদিনের সেরা