kalerkantho

রবিবার । ২ অক্টোবর ২০২২ । ১৭ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

বৈশ্বিক উষ্ণতা, সত্য যেখানে ত্রাস

অনলাইন থেকে

১১ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চরম আবহাওয়া নিরূপণ বিষয়ক চার শতাধিক সমীক্ষার একটি নতুন ডাটাবেইস তৈরি করে একটি অপরিহার্য কাজ সম্পন্ন করেছেন বিজ্ঞানীরা। এ ধরনের পৃথক সমীক্ষাগুলোকে একত্র করার কর্মযজ্ঞটিকে নীতিনির্ধারণ ও প্রচার কার্যক্রমে আলোড়ন তৈরি করা উচিত। বিজ্ঞানীদের এই কাজের মধ্য দিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে তীব্র তাপপ্রবাহ, সামুদ্রিক ঝড়, খরা ও বন্যা—সব কিছুর পেছনে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনের ভূমিকা ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। এই গ্রিনহাউস গ্যাসই সূর্যতাপ আটকে রাখার ফাঁদ তৈরি করে এবং আবহাওয়া ব্যবস্থায় বিপুল পরিমাণ শক্তি সঞ্চয় করে।

বিজ্ঞাপন

এ অবস্থায় বিজ্ঞানীদের কর্মযজ্ঞটি উদ্বেগজনক অনিশ্চয়তার পাশাপাশি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের পরিণতির মাত্রাকেও চিহ্নিত করেছে।

একবিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে যখন প্রথম নিরূপণ সমীক্ষা প্রকাশিত হয় তখন বৈশ্বিক উষ্ণতার বাস্তবিক প্রভাবগুলোর সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের সম্পর্ক নির্ণয় করা বেশি কঠিন কাজ ছিল। ক্রববর্ধমান গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি কৃতজ্ঞতা যে এখন এ বিষয়ে আমরা অনেক জানতে পারছি। এর সুবাদেই আমরা জানতে পেরেছি, গত গ্রীষ্মে উত্তর-পশ্চিম কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে রেকর্ড গড়া ‘তাপ গম্বুজ’ তৈরির বিষয়টি মনুষ্যসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া প্রায় অসম্ভব ছিল। ২০১৮ সালে উত্তর গোলার্ধ জুড়ে এবং ২০১৬ সালে এশিয়ায় তাপপ্রবাহের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।

২০২০ সালে সাইবেরিয়ায় দাবানলের পেছনে ৮০ শতাংশের বেশি ভূমিকা বৈশ্বিক উষ্ণতার। আর সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের ৯০ শতাংশই মানবসৃষ্ট। প্রতিটি মহাদেশেই বর্ধিত মৃত্যুহার সুস্পষ্ট। বিজ্ঞানীদের হিসাবে গরমের কারণে প্রতিবছর এক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০১২-১৪ সালের ক্যালিফোর্নিয়ার খরা ও ফিলিপাইনের সুপার টাইফুন হাইয়ানের অন্যতম কারণও ছিল উষ্ণায়ন। চরম আবহাওয়া নিয়ে চীনে গবেষণা করা হয়েছে; কিন্তু আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকায় গবেষণা হয়েছে খুবই কম। দেখা গেছে, বিশ্বের যে অংশগুলো সবচেয়ে জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাবিত হয়েছে, এ সম্পর্কে তারাই ধারণা অর্জন ও সমস্যা সমাধানে সবচেয়ে পিছিয়ে।

‘সুন্দরই সত্য, সত্যই সুন্দর’ কথাটি জন কিটস ২০০ বছর আগে লিখেছিলেন। এটিকে যদি আমরা জলবায়ু প্রসঙ্গে নিয়ে আসি, তাহলে সত্যকে আজ ত্রাস বলে মনে হতে পারে। তবে আশার বিষয় হলো জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের সাবেক জলবায়ু প্রধান ক্রিশ্চিয়ানা ফিগুরেস এবং কপ-২৬-এর প্রেসিডেন্ট অলক শর্মাসহ বিজ্ঞানী ও নেতারা একটি বিষয়ে জোর দিয়েছেন যে এই বাস্তবতা আমাদের মোকাবেলা করতেই হবে। প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে বিপর্যয়কর ও দুঃখজনক পরিণতি এড়ানোর জন্য এটাই একমাত্র উপায়। ‘হটহাউস আর্থ’ নামে জলবায়ুবিষয়ক একটি নতুন বইয়ে অধ্যাপক বিল ম্যাকগুইর বলেছেন, আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছি যখন বিপদগুলোকে ছোট করে দেখানোর বিষয়টিকে ‘জলবায়ু তোষণ’ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।

কার্বন নির্গমনের ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতার মতোই চলমান জলবায়ু সংকটের বিষয়ে মনোভাব ও অভিজ্ঞতাকে একইভাবে প্রদর্শন করা হচ্ছে না। বিশ্বজুড়ে বিশেষ করে বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) কোটি কোটি মানুষ বেঁচে থাকার জন্য নিত্যদিনের সংগ্রামে লিপ্ত। এর অর্থ এই নয় যে তারা বৈশ্বিক উষ্ণতা বুঝতে পারে না; বরং জীবিকা নির্বাহকারী কৃষক ও জেলেরা অন্য যে কারো চেয়ে বেশি পরিমাণে পরিবেশগত ক্ষতির প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা লাভ করছে। তাই বৈশ্বিক উষ্ণতার সবচেয়ে খারাপ প্রভাব থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুরক্ষিত পশ্চিমা সরকার, ব্যবসায়ী ও ব্যক্তিদের উচিত এ ক্ষেত্রে নিজেদের বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া।

মিসরে অনুষ্ঠেয় এই বছরের কপ-২৭ দ্রুত এগিয়ে আসছে। সম্মেলন সামনে রেখে পশ্চিমা সরকারগুলোর উচিত উন্নয়নশীল বিশ্বকে সবুজ রূপান্তরে সক্ষম করে তুলতে জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি মেনে চলা। জলবায়ু নিরূপণ বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য কেবল কী ঘটছে সে সম্পর্কে বিশ্বকে সতর্ক করা নয়, বরং যা এখনো ঘটেনি সে সম্পর্কে প্রস্তুতি নিতে সহায়তা করা। এখনো ক্রমবর্ধমান নির্গমন ছাড়াও সবচেয়ে উদ্বেগজনক বৈশ্বিক প্রবণতা হচ্ছে, আমরা ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণায়নের গতিতেই রয়েছি। এটি একটি অপ্রত্যাশিত গতি, যা এর মধ্যে বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। যেহেতু আমরা জানি যে এক ডিগ্রি উষ্ণায়নের প্রভাব কী, তাই এটি বলা অতিরঞ্জিত নয় যে এই আবর্তনে থাকা কেবল আত্মঘাতীই নয়, বরং খুনিও।

তবে বিকল্প ব্যবস্থা এখনো আছে এবং এ বিষয়ের ওপর জোর দেওয়ার চেয়ে কখনোই বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিছু হতে পারে না। প্যারিস জলবায়ু চুক্তি উপস্থাপন করেছিলেন মিস ফিগুরেস। এই সপ্তাহে তিনি ‘বিশ্বকে ‘আলোর দিকে দৌড়ানোর’ আহ্বান করেছেন। জলবায়ু নিরূপণ বিজ্ঞানীদের গবেষণার উদ্বেগজনক ফলাফল হতাশার জন্ম দিতে পারে, কিন্তু সংকল্প ও আশাকে ধূলিসাৎ করা উচিত নয়।

সূত্র : সম্পাদকীয়

দ্য গার্ডিয়ান (যুক্তরাজ্য), ভাষান্তরিত

 

 



সাতদিনের সেরা