kalerkantho

শুক্রবার । ৭ অক্টোবর ২০২২ । ২২ আশ্বিন ১৪২৯ ।  ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৪৪

স্কুল কি সৃষ্টিশীলতার গিলোটিন?

সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক

৯ আগস্ট, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



স্কুল কি সৃষ্টিশীলতার গিলোটিন?

সৃষ্টি করার যে সুখ সেটা উপভোগ করার ক্ষমতা মানুষই যে সবচেয়ে বেশি অনুভব করে সেটা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। সৃষ্টিসুখের উল্লাসে একমাত্র তারই মুখ, চোখ কিংবা খুন হাসে। কিন্তু একটা মুশকিল হলো এ ক্ষেত্রে সব মানুষ সমান নয়। শিকারিসমাজে কিছুটা সাম্য ছিল, কিন্তু কৃষিসমাজে এসে এটা কমতে শুরু করে।

বিজ্ঞাপন

এর পর থেকে গুটিকয়েক মানুষ সৃষ্টিশীল হওয়ার দায়িত্ব পালন করে আসছে। তাতে এত দিন কোনো সমস্যা হয়নি বলে সবাইকে সৃষ্টিশীল করার কথাটা কারো মাথায় তেমন আসেনি। এ কারণেই মানুষের সৃষ্টিশীল হওয়ার পথগুলো প্রশস্ত করার কথা ভাবা হয়নি, বরং এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা যে প্রতিষ্ঠানটি রাখতে পারত সেই স্কুলকে গোড়া থেকেই সৃষ্টিশীলতার গিলোটিনে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রাক্কালে এসে মনে হচ্ছে যে সবাইকে কোনো না কোনোভাবে সৃষ্টিশীল হতে হবে। অনেক দেশেই স্কুলকে সৃষ্টিশীলতার গিলোটিনের বদলে উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আমরাও তার ব্যতিক্রম নই। আমদের নতুন শিক্ষাক্রমেও এ রকম উদ্যোগ আছে।

স্কুলগুলোকে কী কারণে এবং কিভাবে সৃষ্টিশীলতার গিলোটিন বানানো হলো, সেটা প্রথমে একটু দেখে নেওয়া যাক। বর্তমান ধাঁচের শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয় প্রায় ৩০০ বছর আগে শিল্প বিপ্লবের সময়। ফলে সেই সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও তৈরি হয় শিল্প-কারখানার আদলে। শিল্প-কারখানা যেমন একরৈখিকভাবে চলে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও ওই একইভাবে তৈরি করা হয়। একই ব্যাচের কাঁচামালগুলোকে যেমন একই রকম হতে হয়, ঠিক সেইভাবে বয়স অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ক্লাসে ভাগ করে দেওয়া হয়। কাঁচামালগুলো যেমন একই প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন পর্যায় পার হওয়ার পর শেষ পরীক্ষায় উপযুক্ত পণ্য হিসেবে বিবেচিত হলে বাজারে বিক্রি হওয়ার জন্য তৈরি হয়, শিক্ষার্থীরাও অনেকটা তাই। অর্থাৎ গোড়া থেকেই জীবন্ত মানবশিশুকে জড়ো কাঁচামাল থেকে আলাদা করে দেখা হয়নি। এই দৃষ্টিভঙ্গিটাই শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীলতাকে হত্যা করার জন্য যথেষ্ট।

শত শত বছর ধরে এভাবে চলতে চলতে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে চাইলেও স্কুলগুলোতে সৃষ্টিশীলতার চর্চা করা মুশকিল। সংগত কারণেই বেশির ভাগ শিক্ষক তাঁদের অবচেতন মনে চান না যে তাঁদের শিক্ষার্থীরা সৃষ্টিশীল হোক। তাঁদের ভয় হয় শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীল হওয়ার সুযোগ দিলে তাঁরা আর ক্লাস নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন না; তাঁদের যেটুকু পড়ানোর কথা, সেই সিলেবাস শেষ করতে পারবেন না। এ ছাড়া সৃষ্টিশীল মানুষের সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো যেমন ‘ঝুঁকি নেওয়া’, ‘আবেগকে প্রশ্রয় দেওয়া’, কিংবা ‘স্বাধীনচেতা হওয়া’ ইত্যাদি স্কুলের ধরাবাঁধা নিয়মের অনুকূলে নয়। এ কারণে সৃষ্টিশীলতার বৈশিষ্ট্যগুলো বিকশিত হওয়ার সুযোগ না দিয়ে উল্টো তা চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষ বা শিক্ষকরা এই চাপা দেওয়ার কাজটা যে খুব সচেতনভাবে করেন, তা নয়। তাঁরা প্রথাগতভাবে যে শিক্ষা দেন তাতে একজন শিক্ষার্থী বড়জোর যা করতে পারে তা হচ্ছে বিখ্যাত শিক্ষাবিদ পাউলো ফ্রেইরির স্কুলরূপী ব্যাংক থেকে কিছু বিষয় মুখস্থ করে তা মাথায় ভরে নেওয়া, সৃষ্টিশীলতাবিরোধী কারিকুলামের যে জোয়াল তৈরি হয় সেটা কাঁধে নেওয়া, শিক্ষকের পড়ানোর গতির সঙ্গে নিজের শিখন গতিকে মেলানোর চেষ্টা করা এবং বিনা বাক্যব্যয়ে স্কুলের নিয়ম-কানুন অন্ধভাবে অনুসরণ করা। এসব করতে করতে সে যে কখন তার ‘ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা’, তার ‘স্বাধীন মুক্ত মানবসত্তা, সর্বোপরি তার ‘সহজাত সৃষ্টিশীল ক্ষমতা’ হারিয়ে ফেলে তা সে নিজে কিংবা তার স্কুল বা পরিবার অথবা গোটা রাষ্ট্র কেউই ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারে না।

কিন্তু সমাজ কেন এই বিষয়ে পদক্ষেপ নেয় না? শিক্ষকের মতো সমাজের অন্যান্য অংশের মানুষও হয়তো মনে করেন সবাইকে সৃষ্টিশীল হওয়ার সুযোগ দিলে, আইন-কানুন বজায় রাখা যাবে না। কিন্তু তাঁরা তো এটাও জানেন যে আমাদের আনন্দ দেওয়া, জ্ঞান দেওয়া, রক্ষা করা, আরো ভালো মানুষে পরিণত করা এবং সর্বোপরি আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তো আমাদের সৃষ্টিশীল মানুষ লাগবেই।

অন্যপক্ষে সবাইকে সৃষ্টিশীল করার বিপক্ষেও যে মত নেই তা নয়। বলা হয়, সবাই সৃষ্টিশীল হলে একেকজন মানুষ একেকভাবে জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি করবে এবং একেকজন মানুষ একেকভাবে জগেক বোঝার চেষ্টা করবে। কেউ ভালোভাবে বুঝবে, কারো বা বোঝায় ফাঁক থেকে যাবে। ফলে রাষ্ট্র বা সমাজের বুননটা যাবে ঢিলে হয়ে। হয়তো এ জন্যই মানবসমাজে সৃষ্টিশীল মানুষের সংখ্যা সব সময়ই কম ছিল। যাঁরা সৃষ্টিশীল হয়েছেন, তাঁরা মূলত নিজেদের চেষ্টায়, নিজেদের উদ্যোগে, ঝুঁকি নিয়ে, কখনো বা সক্রেটিস বা গ্যালিলিওর মতো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গিয়ে সৃষ্টিশীলতার চর্চা করেছেন।

তবে অন্য ধরনের সৃষ্টিশীলতাও আছে। প্লেটো, শেকসপিয়ার বা তানসেনরা যা সৃষ্টি করেন তার চর্চা করতে, এমনকি তা উপভোগ করতেও সৃষ্টিশীলতার প্রয়োজন হয়। যেমন—কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্বের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে শুধু যে গ্যালিলিও কারাবরণ করেছেন বা ভানিনি প্রাণ দিয়েছেন তা নয়, পরে তাঁর আরো অসংখ্য সৃষ্টিশীল অনুসারী তৈরি হয়েছিল বলেই আজ সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, চার্চকে ভুল স্বীকার করতে হয়েছে। অর্থাৎ অল্প কিছু সৃষ্টিশীল মানুষ এবং বিশালসংখ্যক ভিন্নমাত্রার সৃষ্টিশীল অনুসরণকারী মানুষের মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সমাজ এগিয়ে যায়।

এ কারণেই সমাজতাত্ত্বিকরা মনে করেন সাংস্কৃতিক বিবর্তনে মানুষের সৃষ্টিশীলতা নতুন উপাদান যোগ করে; কিন্তু বিবর্তনের ধারাকে অব্যাহত রাখতে হলে সেই নতুন উপাদানকে সংরক্ষণ করতে হয় এবং তা অনুকরণ বা অনুসরণ করে এই সংরক্ষণের কাজটি করে সাধারণ মানুষ। ঠিক যেমনটি ঘটে শারীরিক বিবর্তনে। সেখানে জিনেটিক মিউটেশনের মধ্য দিয়ে শরীরে নতুন কিছু যোগ হয়। কিন্তু নতুন কিছু যোগ হওয়াটাই শেষ কথা নয়, তাকে টিকিয়ে রাখতে হয়। সেই কাজটা স্বাস্থ্যবান মানুষরাই পারে, রুগ্ণরা পারে না।

সবাইকে যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা আলবার্ট আইনস্টাইনের মতো সৃষ্টিশীল হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। বরং না হওয়াটাই শ্রেয়। কারণ সবাই ওই মাত্রায় সৃষ্টিশীল হলে তাদের আর অনুসরণকারীদের মধ্যে যে ভারসাম্য থাকা দরকার সেটা থাকবে না; এবং এই ভারসাম্য না থাকলে কোনো নতুন সৃষ্টি টিকিয়ে রাখা যাবে না, সমাজের সাংস্কৃতিক বিবর্তন বন্ধ হয়ে যাবে, এক ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে।

তাহলে স্কুলগুলোর কাজ হচ্ছে তিনটি। প্রথমত, এটা বোঝা যে প্রচলিত শিখন-শেখানো পদ্ধতিতে প্রচলিত সৃষ্টিশীলতার অপমৃত্যু হয়। দ্বিতীয়ত, সেই শিখন-শেখানো পদ্ধতিকে যতটা সম্ভব সৃষ্টিশীলতাবান্ধব করা এবং তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীরা যে বিচিত্র মেধা নিয়ে স্কুলে আসে সেগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো বিকাশের পরিবেশ নিশ্চিত করা। এত দিন না পারলেও এখন তারা চাইলে এটা অনেক সহজে করতে পারবে, কারণ আমাদের নতুন শিক্ষাক্রমের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যই হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সৃষ্টিশীলতার বিকাশ ঘটানো।

 লেখক : মাউশি ও নায়েমের সাবেক মহাপরিচালক

 

 



সাতদিনের সেরা