kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

নেতৃত্বের সূতিকাগার নিয়ে ভাবা উচিত

ড. মো. শফিকুল ইসলাম

৫ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



নেতৃত্বের সূতিকাগার নিয়ে ভাবা উচিত

নেতৃত্বের সূতিকাগার হলো ছাত্রসংসদ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নেতৃত্ব তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজ যাঁরা দেশ গঠনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই ছাত্রসংসদের নির্বাচিত নেতা ছিলেন। এই ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সত্যিকার নেতা বের হয়ে আসে, যদি নির্বাচন সঠিক ও সময়মতো হয়।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু কেন জানি আমরা ছাত্রসংসদ নির্বাচনের বিষয়ে আগ্রহ দেখাই না। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা এ বিষয়ে তেমন কার্যকর কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। অথচ দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন এখন আর নিয়মিত হচ্ছে না। অনেকের ধারণা, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রসংসদ নির্বাচন দিতে ভয় পায়।

দীর্ঘদিন পর ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেই নির্বাচনে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের নিয়ে নানা ধরনের সমালোচনা রয়েছে। তবে ওই নির্বাচন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে হয়নি, হয়েছে আদালতের নির্দেশ কার্যকর করার জন্য। এর পর থেকে আবার ছাত্রসংসদ নির্বাচন বন্ধ রয়েছে। নতুন করে আর নির্বাচনের কোনো উদ্যোগ দেখতে পাচ্ছি না। শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন, আবার কবে ডাকসু নির্বাচন হবে?

এ ছাড়া আরো বড় চারটি বিশ্ববিদ্যালয় যেমন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন হচ্ছে না দীর্ঘদিন, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নেতৃত্ব তৈরিতে যদি এ রকম অবহেলা হয়, তাহলে ভালো নেতৃত্ব তৈরি হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আইন অনুযায়ী পরিচালনার জন্য ছাত্রসংসদ নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলেজগুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। এমনকি অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের বিষয়ে কোনো কথা নেই। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে ছাত্রসংসদ থাকা বাধ্যতামূলক এবং সময়মতো নির্বাচন হওয়া জরুরি। কারণ ভবিষ্যতে দেশ পরিচালনার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো নেতৃত্বের প্রয়োজন হবে। এর জন্য দরকার ছাত্রসংসদ নির্বাচন। শেখ হাসিনা যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা অনুকরণীয় ও শিক্ষণীয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হল সংসদের নির্বাচনও বন্ধ রয়েছে। অর্থাৎ নেতৃত্বের সূতিকাগার বলে পরিচিত ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে কার্যকর করা দরকার। ছাত্রসংসদ না থাকার কারণে সংগঠনগুলো তার গতি হারাতে বসেছে। ছাত্রদের অধিকারগুলো নিয়ে কেউ তেমন কার্যকরভাবে ভূমিকা রাখছে না। ছাত্রসংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে পেশিশক্তির রাজনীতি বন্ধ করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ ডাকসু বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, একাত্তরের জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম এবং পরবর্তী যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ব্যাপক ও কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে নির্বাচন হওয়ার কথা পঞ্চাশবার, সেখানে নির্বাচন হয়েছে মাত্র আটবার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক রকমের নির্বাচন হয়ে থাকে, যেমন শিক্ষক সমিতি নির্বাচন এবং কর্মচারী নির্বাচন। কিন্তু ছাত্রসংসদ নির্বাচন হয় না। এখানে নানা ধরনের প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। এই নির্বাচন না হওয়ার পেছনে প্রশাসনের সদিচ্ছার অভাব রয়েছে মনে হয়। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন উদ্যোগ নিলে প্রতিবছর ছাত্রসংসদ নির্বাচন বাস্তবায়ন করা সম্ভব। ২০১৯ সালে ডাকসু নির্বাচনের নেতৃত্ব শিক্ষার্থীদের অধিকার বা দাবি আদায়ে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি।

ছাত্রসংসদ এমন একটি প্ল্যাটফরম, যেখানে নেতৃত্ব সৃষ্টি হয় এবং ছাত্রদের অধিকার আদায়ের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে কোনো ছাত্র প্রতিনিধিও নেই। ফলে ছাত্রদের অধিকার নিয়ে সিনেটে কথা বলার লোক নেই। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডাকসু, রাকসু, জাকসু, চাকসু নির্বাচনসহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন।

ছাত্রসংসদ নির্বাচন ছাত্র-ছাত্রীদের অধিকার। কিন্তু এই অধিকার থেকে শিক্ষার্থীদের বঞ্চিত করা হচ্ছে। ছাত্রসংসদ নির্বাচন না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক ধরনের পেশিশক্তির রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। যার বাস্তব প্রমাণ সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো। যেখানে জাতির পিতা, প্রধানমন্ত্রী এবং জাতীয় চার নেতার ছবি ভাঙচুর করা হয়েছে। খুবই দুঃখজনক ঘটনা। যারা এসব ঘটনার সঙ্গে জড়িত তাদের কঠোর বিচারের আওতায় আনা জরুরি। এখানে অন্য কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে সে বিষয়ে তদন্ত হওয়া দরকার। এই ঘটনাগুলো হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। যে সময় যে সরকার ক্ষমতায় থাকে, তাদের ছত্রচ্ছায়ায় ছাত্রসংগঠনগুলো নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র নামের কিছু অছাত্র রয়েছে, যারা ভর্তি বাণিজ্য থেকে শুরু করে হলে সিট বরাদ্দ, টেন্ডার বাণিজ্য—এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ছে। আবার কেউ কেউ নিয়োগ বাণিজ্য করে থাকে, যা কোনোভাবেই বিশ্ববিদ্যালয়ে হওয়া উচিত নয়। অছাত্রদের কারণে প্রাধ্যক্ষরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন না। মেধাবীরা হলে আসন পেয়ে হলে উঠতে পারে না এমন অভিযোগ রয়েছে কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এ বিষয়ে নজর দেওয়ার সময় আসছে। সরকারের সুন্দর ভাবমূর্তি এসব অছাত্রের কারণে নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না।    

অনেকেই মনে করছেন, শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যত সহজে আজ্ঞাবহ রাখা যায়, শিক্ষার্থীদের সেভাবে আজ্ঞাবহ রাখা যায় না। তাই ছাত্রসংসদ নির্বাচন নিয়ে প্রশাসনের তেমন কোনো আগ্রহ দেখা যায় না। এ ছাড়া ছাত্রসংসদের নামে প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ছাত্রসংসদ ফি এবং হল ছাত্রসংসদ ফি নেওয়া হয়। ছাত্রসংসদ নির্বাচন না হলে এ ধরনের ফি নেওয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক। এর অর্থ আমরা ছাত্রদের সঙ্গে প্রতারণা করছি। এসব ফি কোন খাতে ব্যয় করা হচ্ছে তার কোনো সঠিক উত্তর নেই বললেই চলে। সিট দখল, সিট বাণিজ্য এবং শিক্ষার্থী নির্যাতনের মতো ঘটনা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাচ্ছে, যা বন্ধ করা জরুরি। শিক্ষার্থীদের অধিকার, মুক্তচিন্তা প্রকাশ এবং অধিকার সচেতনতা সৃষ্টিতে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের ভূমিকা অনেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ছাত্রসংসদের নির্বাচন জরুরি। সর্বোপরি যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্রসংসদ বিষয়ে কিছু বলা নেই, সেখানে আইন সংশোধন করে ছাত্রসংসদ প্রতিষ্ঠা এবং নির্বাচন করার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।

 

 লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম

বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ

 



সাতদিনের সেরা