kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৬ আগস্ট ২০২২ । ১ ভাদ্র ১৪২৯ । ১৭ মহররম ১৪৪৪

প্রবাসে পাসপোর্ট নবায়নে নাগরিক দুর্ভোগ

আতিকুর রহমান চৌধুরী

৩ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



কয়েক মাস ধরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশিদের পাসপোর্ট নবায়ন কিংবা নতুন পাসপোর্ট আবেদনের ক্ষেত্রে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এই দুর্ভোগ চরম মাত্রায় পৌঁছে গেছে স্বল্প বা নিম্ন আয়ের বাংলাদেশিদের বেলায়, বিশেষ করে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের। গত ২২ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের ওয়েব পেজে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেনের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয়, বাংলাদেশ সরকার সাতটি দূতাবাসে মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট সেবা বন্ধ ঘোষণা করেছে, যার মধ্যে আছে মেরিল্যান্ডের ডিস্ট্রিক্ট অব কলম্বিয়ার ওয়াশিংটন শহরে বাংলাদেশ দূতাবাসসহ নিউ ইয়র্ক কনসুলেট অফিসও। সরকার সব ধরনের সেবা ডিজিটাইজড করার লক্ষ্যে ই-পাসপোর্টের উদ্যোগ নিয়েছে, এতে সাধুবাদ জানাই।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এত বড় দেশ তার ৫০টি অঙ্গরাজ্যেই বাংলাদেশি স্বল্প আয়ের মানুষসহ শিক্ষার্থীরা আছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছোট ছোট বাচ্চাসহ পরিবার নিয়ে বসবাস করেন একক আয়ের ওপর ভিত্তি করে। সাধারণ নাগরিক হিসেবে এখন সবাইকে ই-পাসপোর্ট করতে হচ্ছে এবং যা হয়ে দাঁড়িয়েছে চরম দুর্ভোগের কারণ। কেননা ই-পাসপোর্টের জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসের স্থানভেদে দূতাবাস নির্বাচন করে নির্দিষ্ট তারিখ ও সময়, যা ফাঁকা থাকার শর্তসাপেক্ষ নির্বাচন করে সশরীরে উপস্থিত হয়ে আঙুলের ছাপ দিয়ে আসার বিধান রাখা হয়েছে নতুন ই-পাসপোর্ট করার ক্ষেত্রে ।

এই দুর্ভোগ বিশেষ করে চরমে উঠেছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত শিক্ষার্থী কিংবা তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য। কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীই আসেন সপ্তাহে ২০ ঘণ্টা বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ কাজ করার বিনিময়ে মাসিক গড়ে এক হাজার ২০০ থেকে দুই হাজার ৫০০ ডলার আয় করতে পারেন এই টাকার ওপর ভিত্তি করে। তাঁদের মধ্যে গড়ে ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থীকে আয়ের গড়ে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা দিতে হয় টিউশন ফি বাবদ বিশ্ববিদ্যালয়কে। আবার মার্কিন সরকারের আয়কর দিতে হয় সেই একই আয়ের ৬ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত। থাকতে হয় বাসাভাড়া করে, যাতে বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই একেবারে মানবেতর জীবন যাপন করেন। অনেককেই একজন আয়ের ওপর ভিত্তি করে চালাতে হয় তিন থেকে চার সদস্যের পরিবার। অর্থাৎ মাস শেষে একজন শিক্ষার্থীর এক ডলারও বেঁচে থাকে না যদি না তাঁর পার্টনারও আয় করে থাকেন। এ অবস্থায় বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই ক্রেডিট কার্ডের ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে কোনো মতে বছর পার করে দেন একটাই মূল লক্ষ্যে, তা হচ্ছে উচ্চশিক্ষা। মূলত এ ক্ষেত্রে পাসপোর্ট রি-ইস্যু কিংবা নতুন পাসপোর্টের প্রয়োজনীয়তাটা হচ্ছে একজন শিক্ষার্থী যদি আমেরিকায় আসার দুই মাস আগেও পাসপোর্ট করিয়ে এসে থাকেন, সেই শিক্ষার্থীর কোনো না কোনো সময় গিয়ে পাসপোর্ট নবায়ন কিংবা নতুন পাসপোর্ট বানানোর প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এবং একজন শিক্ষার্থীকে তাঁর নন-ইমিগ্র্যান্ট বা এফ-১/এফ-২/জে-১/জে-২ এমনকি এইচ-১/এইচ-৪ কিংবা গ্রিনকার্ড পাওয়ার পর পাঁচ বছর অবধি বাংলাদেশের পাসপোর্ট আপ টু ডেট রাখাটা অত্যন্ত জরুরি হয়ে দেখা দেয়।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জারি হওয়া বিজ্ঞপ্তির ফলে নির্ধারিত দূতাবাস বা কনসুলার অফিস থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থান বা বসবাসরত নিম্ন আয় (যেমন—প্রত্যেক শিক্ষার্থী ও তাঁদের পরিবার) করা বাংলাদেশিদের পক্ষে সশরীরে গিয়ে আঙুলের ছাপ দেওয়ার বিষয়টা গোদের ওপর বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে, যা কি না আধুনিক টেকনোলজি অ্যাপ্লাই করে সশরীরে উপস্থিত না থেকেও আঙুলের ছাপ পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এই সশরীরে উপস্থিতির সমস্যাটা কয়েক দিন আগেও ছিল না। মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট নবায়নের বেলায় আগে বাংলাদেশিরা যে যে প্রান্তেই থাকুক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সিকিউর চিঠি বা পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েই করা যেত; কিন্তু যে সাতটি দূতাবাস বা কনসুলার অফিসে এই মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট সেবা বন্ধ হয়েছে সেই দূতাবাস বা কনসুলার অফিসের জুরিসডিকশনভিত্তিক এলাকার বাংলাদেশিদের এখন হয় বাই রোডে ড্রাইভ করে দূতাবাসে গিয়ে আঙুলের ছাপ দিয়ে আসতে হচ্ছে অথবা প্লেনে করে গিয়ে দিয়ে আসতে হচ্ছে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে দেখা দিয়েছে। যেমন—মার্কিন যুক্তিরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো কিংবা টেক্সাসের এল পাসো শহরে যেসব শিক্ষার্থী আছেন তাঁদের জুরিসডিকশন পড়েছে ওয়াশিংটন ডিসি। এসব অঞ্চল থেকে ওয়াশিংটন ডিসির দূরত্ব হচ্ছে প্রায় দুই হাজার মাইল। টানা গাড়ি চালালেও সময় লাগবে ৩০ ঘণ্টার মতো। আর এটা অবশ্যই অসম্ভাব্য কাজ। অর্থাৎ কেউ বাই রোডে নিজে ড্রাইভ করে গেলেও থেমে থেমে পথিমধ্যে হোটেল বা মোটেলে ঘুমিয়ে জিরিয়ে নিতে নিতে তিন থেকে পাঁচ দিন সময় নিয়ে যেতে হবে। আবার এই সময় নিয়ে ফিরে আসতে হবে শুধু আঙুলের ছাপ বা বায়োমেট্রিক দিতে। এতে খরচ পড়ে যাবে ৮০০ থেকে এক হাজার ৫০০ ডলারের মতো। আবার যদি প্লেনে করেও যায় টিকিট খরচ ও ওয়াশিংটন ডিসির মতো উচ্চ খরুচের শহরে এক রাত থেকে আবার ফিরে আসতে হচ্ছে। এতেও খরচ পড়ে যাচ্ছে ৮০০ থেকে এক হাজার ডলারের মতো। যা টিউশন ফি, হেলথ ইনস্যুরেন্স ফি, ট্যাক্স দেওয়ার পর একজন শিক্ষার্থীর এক মাসের আয়ের সমান বা তার থেকেও বেশি। অথচ বায়োমেট্রিক সবারই দেওয়া আছে কোনো না কোনো মাধ্যমে, মোবাইলের সিমকার্ড রেজিস্ট্রেশন করার সময়ও দেওয়া লেগেছিল, সার্ভার থেকে সেটাও রিট্রাইভ করা যেতে পারে। যদি তা-ও নিরাপদ মনে না হয়, সে ক্ষেত্রে ই-বে, আমাজনসহ লোকাল সুপারমার্কেটগুলোতেও একধরনের স্টিকার ও বিশেষ ধরনের কালি পাওয়া যায়, যাতে ঘরে বসে বায়োমেট্রিক দিয়ে খামে করে পোস্টাল সার্ভিসের মাধ্যমে পাঠানো যায়। অথবা দূতাবাসগুলো প্রতিটা অঙ্গরাজ্যে কয়েকটি এজেন্সি নিয়োগ দিয়ে বা এজেন্সিদের সঙ্গে চুক্তি করে সশরীরে উপস্থিত থেকে বায়োমেট্রিক নেওয়ার ব্যবস্থা করতে পারে। আমার জানা মতে, আমেরিকার ছোট-বড় প্রতিটি শহরে অবস্থিত উপিএস বা ফেডেক্স এই কাজ করে থাকে। এত এত বিকল্প ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও কেন শিক্ষার্থী বা নিম্ন আয়ের মানুষকে এই দুর্ভোগ দেওয়া হচ্ছে তা বোধগম্য নয়। শুধু খরচের দিক থেকেই নয়, বিষয়টা দুর্ভোগের আরেকটি বড় কারণ। ফাঁকা থাকার ভিত্তিতে নির্ধারিত তারিখ ও সময় বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কাজের সময়ের সঙ্গে তাল মিলছে না। যেহেতু নিয়ম করা হয়েছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েই নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে সশরীরে গিয়ে বায়োমেট্রিক দিতে হবে, সেহেতু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই বাংলাদেশিরা এটা বাধ্য হয়েই সশরীরে উপস্থিত হচ্ছে যখন ফ্লাইট টিকিট উচ্চ হওয়া সত্ত্বেও সেই তারিখ ও সময়ে। এবং সেটা ওয়ার্কিং দিনগুলোতে ছুটি নিয়ে, যা আমেরিকায় শুধু এই ইস্যুতে পাওয়াটা দুষ্করও বটে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সরকারের দায়িত্বশীল মানুষের প্রতি আকুল আবেদন, অবিলম্বে এর একটা দ্রুত সমাধান করা হোক, অথবা যত দিন ঘরে বসে বায়োমেট্রিক সংগ্রহ কিংবা নিকটস্থ কোনো এজেন্সির মাধ্যমে সশরীরে উপস্থিত হয়ে বায়োমেট্রিক সংগ্রহের সিস্টেমের আওতায় না আনা যাচ্ছে তত দিনের জন্য শর্ত সাপেক্ষে আবার মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট নবায়নের সুযোগ দেওয়া হোক। আর স্থায়ী সমাধান হিসেবে বাংলাদেশে থাকাবস্থায় যদি কাগজপত্র দেখাতে পারে বাংলাদেশে যে সে একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিতে বা নিম্ন আয়ের উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিংবা পৃথিবীর যেকোনো দেশে গমনের নিমিত্তে প্রথমবারের মতো পাসপোর্টের আবেদন করে, তবে তাকে ১৫ বছরের মেয়াদি পাসপোর্ট প্রদান করা হলে প্রবাসী রেমিটেন্সযোদ্ধা কিংবা উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের যারপরনাই উপকার হতো।

লেখক: শিক্ষার্থী, পিএইচডি, ডাটা সায়েন্স।

টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়, এল পাসো 



সাতদিনের সেরা