kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১১ আগস্ট ২০২২ । ২৭ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১২ মহররম ১৪৪৪

হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ছয় বছর এবং বাংলাদেশের সামর্থ্য

ড. সুলতান মাহমুদ রানা

১ জুলাই, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ছয় বছর এবং বাংলাদেশের সামর্থ্য

আজ থেকে ছয় বছর আগে অর্থাৎ ২০১৬ সালের ১ জুলাই বাংলাদেশের ইতিহাসে নিষ্ঠুরতম জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটেছিল গুলশানের এক স্প্যানিশ রেস্টুরেন্টে। ওই হামলা শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা বিশ্বকে শোকাভিভূত করেছিল। ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে হত্যা করেছিল জঙ্গিরা; যাঁদের মধ্যে ৯ জন ইতালীয়, সাতজন জাপানি, একজন ভারতীয় ও তিনজন বাংলাদেশি ছিল।

ওই ঘটনার পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী একের পর এক অভিযান চালিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ভেঙে দেয় জঙ্গিদের অনেক আস্তানা।

বিজ্ঞাপন

সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ওই সময় ক্রমাগতভাবে অব্যাহত রাখা হয় জঙ্গিবিরোধী অভিযান। দেশব্যাপী চলতে থাকে জঙ্গি নিধনের মতো সাহসী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ সরকার জঙ্গি দমনে তার সামর্থ্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হয়। হলি আর্টিজান হামলা-পরবর্তী সময়ে দেশে জঙ্গিবিরোধী যে তৎপরতা লক্ষ করা গেছে তা স্মরণকালের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের বুকে বাংলাদেশে জঙ্গি দমন কার্যক্রম রোল মডেলে পরিণত হয়। শুধু তা-ই নয়, ওই হত্যাকাণ্ডের বিচারপ্রক্রিয়াও প্রমাণ করে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি কতটা আন্তরিকভাবে অব্যাহত ছিল।

ওই হামলার দুই বছরের মাথায় ২১ জনের সম্পৃক্ততা থাকার প্রমাণ পেয়ে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় মামলার তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেররিজম ইউনিট। তবে ২১ জনের মধ্যে ১৩ জন অপারেশন থান্ডারবোল্টসহ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অন্যান্য অভিযানে মারা যাওয়ায় জীবিত আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী ট্রাইব্যুনাল এই মামলার যুক্তিতর্ক শেষে রায়ে সাত আসামির মৃত্যুদণ্ড দেন। বলা যেতে পারে, ঢাকার বিশেষ আদালতে হলি আর্টিজানের সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার রায় বাংলাদেশের জন্য একটি অসাধারণ সামর্থ্যের প্রমাণ। এই সন্ত্রাসী হামলায় আমরা যেমন ২০ জন শান্তিপ্রিয় নিরীহ দেশি-বিদেশি নাগরিককে হারিয়েছি, তেমনি এই বিয়োগান্ত আলেখ্যের মধ্যে আমরা জেনেছি এক বিনম্র বীর ফারাজ আইয়াজ হোসেনের সাহসী আত্মত্যাগের অনন্যসাধারণ গল্প। সার্বিক বিশ্লেষণের শুরুতেই এ প্রসঙ্গে বলা যায়, বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে থাকবে; ঘাতকচক্রের কোনো ঠাঁই বা আশ্রয়-প্রশ্রয় এই দেশে নেই। এটি সহজেই অনুমান করা যায়, এই হামলাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। ‘স্থানীয়ভাবে বেড়ে ওঠা সন্ত্রাসীরা’ স্থানিক ভাবনা থেকে এই হামলা চালিয়েছে ব্যাপারটি মোটেও সে রকম নয়, বরং এটি বিস্তৃত আন্তর্জাতিক জঙ্গি তৎপরতারই অংশ।

অসংখ্য দেশে, বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে যেসব সন্ত্রাসী তৎপরতার ঢেউ ছিল, হলি আর্টিজান হামলা তার বাইরের কিছু ছিল না। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে এই হামলাটি স্থানীয় জঙ্গিরা চালিয়েছিল এবং পুরো ঘটনাটি সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই ঘটেছে। অন্যভাবে বলা যায়, এরই মধ্যে বাংলাদেশে যত জঙ্গি হামলা হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে ওই হামলার বহু মিল ছিল এবং আন্তর্জাতিক জঙ্গি গ্রুপগুলো বা ‘গ্লোবাল জিহাদ’ এর মধ্যে সরাসরি ভূমিকা রাখেনি। কিন্তু বাংলাদেশে তার আগের অন্য সব জঙ্গি হামলার সঙ্গে এই হামলার তুলনা করলে দেখা যাবে এটি বাংলাদেশের হামলার ধরনে নতুন মোড় এনেছিল এবং এর ধরনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক জঙ্গি হামলার ধরনের মিল দেখা গিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে শ্রীলঙ্কায় গির্জায় যে হামলা হয় সেটি দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসী তৎপরতার ক্ষেত্রে নতুন ‘সন্ধিক্ষণের’ সূচনা করে। শ্রীলঙ্কার হামলা প্রমাণ করে দক্ষিণ এশিয়ায়, বিশেষ করে ভারত, শ্রীলঙ্কা ও বাংলাদেশে আইএসের প্রভাব বাড়ছে। সিরিয়া ও ইরাকে আইএস সামরিকভাবে পরাজিত হওয়ার পর দক্ষিণ এশিয়ার বিষয়ে তাদের আগ্রহ বেড়েছে।

গত কয়েক দশকে মুসলিম বিশ্বে অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত বেড়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বের যে মুসলিম নাগরিকরা জঙ্গি তৎপরতায় আক্রান্ত হননি, তাঁদের মধ্যেও চরমপন্থা-প্রভাবিত সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিত্বের বিস্তার ঘটছে। গুলশান হামলার পরিপ্রেক্ষিতেই দেখা যায়, যেকোনো শিক্ষায় শিক্ষিত ও সামাজিক-অর্থনৈতিকবর্গের মানুষই উগ্রপন্থায় আক্রান্ত হতে পারে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ না করলেই নয় যে চারদলীয় জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬) বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় জঙ্গিবাদের ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছিল। দেশে জঙ্গিবাদের সেই বিস্তার এখন নেই। তবে এটি ধারণা করলে খুব বেশি ভুল হবে কি না জানি না যে জঙ্গিরা আপাতত গাঢাকা দিয়েছে বা মৌলবাদী বিভিন্ন সংগঠনে ঢুকে নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে। যেকোনো সময় আবার তারা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে।

এখন দেখা যাক, হলি আর্টিজানের ছয় বছরের মাথায় জঙ্গিবাদ ও জঙ্গি তৎপরতা দমনে বাংলাদেশ এখন কোথায় আছে। নিঃসন্দেহে বলতে হবে, জঙ্গিদের সক্রিয় বা সশস্ত্র অ্যাকশন দমনে বাংলাদেশ গত ছয় বছরে উদাহরণ সৃষ্টিকারী সফলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করে জঙ্গি নিষ্ক্রিয়তার পদক্ষেপ বিদ্যমান রয়েছে। কারণ শিক্ষার্থীদের দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার মূল প্ল্যাটফরম হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যথাযথ রাজনীতি চর্চা ও পাঠ্য সংশ্লিষ্ট জ্ঞানের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীরা নিজেদের আদর্শবান করা সম্ভব। বিশেষ করে শিশুকাল থেকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ না হওয়া এবং সাংস্কৃতিক চর্চা না থাকায় তরুণরা অনেক সময় বিপথগামী হয়ে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংস্কৃতি চর্চা, মৌলিক মানবিক গুণাবলি বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুতকরণ, খেলাধুলা প্রভৃতি যথাযথ অনুসরণের মাধ্যমেই শিক্ষার্থীদের মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ ও উৎসাহিত করার বিষয়টি সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ দৃষ্টি দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা গেছে। তবে করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এ বিষয়গুলো নিয়ে আবার সরকারকে ভেবে দেখার সময় এসেছে।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিক্ষা কমিশনের রিপোর্টে (ড. কুদরাত-এ-খুদা কমিশন-১৯৭৪) শিক্ষাব্যবস্থাকে মাতৃভাষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষা প্রদান কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্তবুদ্ধি চর্চার কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুপারিশ করেছিল। কিন্তু বর্তমান সময়ে শুধু উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে নয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়েও ইতিহাসের চর্চা যথেষ্ট কম হচ্ছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে মুক্তবুদ্ধির চর্চাও বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। হলি আর্টিজানের হামলায় নর্থ সাউথ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্টতায় একটি বিষয় ফুটে উঠেছে যে মূলত সঠিক ইতিহাস, আদর্শ ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার প্রতিবন্ধকতাই তাদের জঙ্গিবাদের সঙ্গে যুক্ত করে তুলেছে। কাজেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ প্রতিরোধের ব্যবস্থার অংশ হিসেবে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সব স্তরে মানববিদ্যার চর্চার মাত্রা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা