kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

জি৭-এর তহবিল কি চীনের বিরুদ্ধে মার্কিন উসকানি!

অনলাইন থেকে

৩০ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



যুক্তরাষ্ট্রের ‘চীনকে রোখার উপায় সম্পর্কিত কঠিনতম কৌশলপত্রের’ সামান্য একটি অংশ প্রকাশিত হয়েছে। গত রবিবার জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘২০২৭ সালের মধ্যে আমরা সম্মিলিতভাবে জি৭ থেকে প্রায় ৬০০ বিলিয়ন ডলার তহবিল জোগাড় করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছি। ’ তিনি অবশ্য চীনের নাম উচ্চারণ করেননি। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো এটা লুকানোর চেষ্টা করেনি যে এই তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্য হচ্ছে চীনের উত্থাপিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভকে (বিআরআই) ‘মোকাবেলা করা’  কিংবা এর সঙ্গে ‘পাল্লা দেওয়া’।

বিজ্ঞাপন

এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাটি মানুষের মনে প্রথম যে ধারণাটি তৈরি করে, তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবারও বিশ্বের সামনে একটি মুলা ঝুলিয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, ৬০০ বিলিয়ন ডলার লক্ষ্যের মধ্যে তারা দেবে ২০০ বিলিয়ন ডলার এবং বাকি অর্থ ছয়টি দেশ মিলে দেবে। বাকি দেশগুলো কী করবে তা উল্লেখ না করেই বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের পকেট থেকে ২০০ বিলিয়ন ডলার বের করা অসম্ভব। কারণ এ ধরনের একটি বিশ্বাস বহির্বিশ্বে রয়েছে দেশটির আচার-আচরণের কারণে।

গত বছরের জুনে যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র ‘বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড (বিথ্রিডাব্লিউ)’ শীর্ষক একটি সুন্দর নাম দিয়ে একটি আশা-জাগানিয়া চিত্র আঁকে। তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বিনিয়োগের ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে এটি করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছিল। বাস্তবে এটি ‘বিআরআইয়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার’ জন্য করা হয়েছিল। গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক অবকাঠামো নির্মাণে মাত্র ৬০ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছে, যা বাইডেনের পরিকল্পনা থেকে অনেক দূরে। তাহলে আজ মানুষ কিভাবে বিশ্বাস করতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্র ২০০ বিলিয়ন ডলার সামনে নিয়ে আসবে?

প্রকৃতপক্ষে যুক্তরাষ্ট্র এই ধরনের রুটিনকাজ দীর্ঘদিন ধরেই করে আসছে। ওয়াশিংটন বৈশ্বিক অবকাঠামো নির্মাণে আগ্রহী নয়। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অবকাঠামোর জন্য গৃহীত ঋণ এখনো অনেক বেশি, যা তাকে পরিশোধ করতে হবে। গত বছর প্রকাশিত আমেরিকান সোসাইটি অব সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে অবকাঠামোগত চাহিদার ক্ষেত্রে ২.৫৯ ট্রিলিয়ন ডলারের ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে বিআরআইকে ধ্বংস করা এবং আসলে চীনকে আক্রমণ করতে ঝোলানো মুলা ব্যবহার করা।

যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের মূল চাবিকাঠি হলো ‘ঋণ ফাঁদের’ কথা বলে বিআরআইকে অপবাদ দেওয়া। গত সোমবার এ বিষয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ঝাও লিজিয়ান কড়া জবাব দিয়েছেন। তিনি বিশ্বব্যাংকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, যদি বিআরআইয়ের সব পরিবহন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, তাহলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিআরআই বিশ্বের জন্য ১.৬ ট্রিলিয়ন ডলার বা বৈশ্বিক জিডিপির ১.৩ শতাংশ আয় বৃদ্ধি করবে। আশা করা হচ্ছে, এই রাজস্বের ৯০ শতাংশই অংশীদার দেশগুলো ভাগাভাগি করে নেবে এবং নিম্ন আয়ের ও মধ্যম থেকে নিম্ন আয়ের অর্থনীতিগুলোই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।

এ ছাড়া ২০১৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৭৬ লাখ মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে এবং তিন কোটি দুই লাখ মানুষকে মাঝারি দারিদ্র্য থেকে বের করে আনা হবে। এ ছাড়া বিআরআই অংশীদারদের কেউই এই গল্পটাকে সমর্থন করেনি যে ‘বিআরআই ঋণের ফাঁদ তৈরি করে’।

সম্প্রতি বিথ্রিডাব্লিউ উদ্যোগ সম্পর্কে ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’ ম্যাগাজিনের একটি নিবন্ধে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে উদ্যোগটির সবচেয়ে মারাত্মক ত্রুটি হলো, মনে হচ্ছে এটি চীনের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের দোষারোপের ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু স্থানে চীনকে ‘অনুকরণ’ করছে, যা স্থানগুলো চীনের উন্নয়ন থেকে উপকৃত হয়েছে। আর যেকোনো বিষয়েই ‘মার্কিন সমাধান’-এর ভিন্ন ভিন্ন সংস্করণ রয়েছে এবং এর পেছনে তথাকথিত গণতন্ত্র, প্রকৃত বিভাজন এবং একটি অপমানিত চীনকে দেখার মানসিকতা কাজ করছে।

বাস্তবতা হচ্ছে, বিশ্বের পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বৈশ্বিক অবকাঠামো উন্নত করার সুবিশাল সুযোগ রয়েছে। এর আগে জি২০-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০৪০ সালের মধ্যে বিশ্ব ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অবকাঠামোগত ঘাটতি মোকাবেলা করছে। মানবজাতির সামগ্রিক অগ্রগতি এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি প্রধান হাতিয়ার হিসেবে অবকাঠামোর উন্নয়নের একটি অতুলনীয় বিস্তৃত স্থান রয়েছে। এতে যথেষ্ট বিনিয়োগ হয়েছে বলে কেউ মনে করে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি এত সংকীর্ণ মনের না হতো, তাহলে চীন উত্থাপিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা করার সম্ভাবনা দেখা দিত।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েন বলেছেন, বিআরআইয়ের একটি টেকসই বিকল্প গড়ে তুলতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থায়নের জন্য ইউরোপ ৩০০ বিলিয়ন ইউরো (৩১৭.২৮ বিলিয়ন ডলার) সংগ্রহ করবে। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনেক নেটিজেনই এই মন্তব্যের সমালোচনা করেছেন। তাদের প্রশ্ন হলো, কেন ফন ডার লিয়েন চীনা তহবিলের ‘পরিপূরক’ কথাটি ব্যবহার না করে ‘বিকল্প’ শব্দটি ব্যবহার করলেন? তিনি কি বলতে চাচ্ছেন যে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অবশ্যই পশ্চিমা ও চীনের মধ্যে কোনো পক্ষ নিতে হবে? কিন্তু আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে কেন পক্ষ নেওয়ার প্রশ্ন আসবে? 

শিবিরে বিভক্ত হওয়ার খেলা খুব কম উন্নয়নশীল দেশই পছন্দ করে। এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, সবাই জানে যে ঝুলন্ত মুলা পেট ভরাতে পারে না।

সূত্র : গ্লোবাল টাইমসের (চীন) সম্পাদকীয়, ইংরেজি থেকে অনূদিত

 



সাতদিনের সেরা