kalerkantho

রবিবার । ১৪ আগস্ট ২০২২ । ৩০ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৫ মহররম ১৪৪৪

পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশার খলনায়ক কে

ফজর নাদিম

২৯ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্দশার খলনায়ক কে

অর্থনীতি, রাজনীতি ও ব্যক্তিত্ব সাধারণত অবিচ্ছেদ্য। কথাটি বলেছেন প্রয়াত মার্কিন রাজনীতিবিদ চার্লস এডিসন। পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও এটাই সত্য। কয়েক দশক ধরে পাকিস্তানকে অর্থনীতি, রাজনীতি ও ব্যক্তিত্বের এক তিক্ত মিথস্ক্রিয়া প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

যেকোনো দেশের শক্তির প্রতিফলন নির্ভর করে তার অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর, যা পাকিস্তানের পক্ষে এই মুহূর্তে পূরণ করা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের ব্যাপার। ফলে সম্পদশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান একটি চিরস্থায়ী ক্রান্তিকালে আটকে থাকছে।

পাকিস্তানে ব্যাপক দারিদ্র্য ও স্থবির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অন্য অনেক কারণের মধ্যে দুর্বল শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা প্রধান ভূমিকা রেখেছে। এ অবস্থা কাটিয়ে উঠতে হলে পাকিস্তানের ভূ-কৌশলগত অবস্থানকে সম্পদে পরিণত করার বিষয়টি অগ্রাধিকার দেওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এমনটা করতে হলে এর মূল চাবিকাঠি হবে সহায়ক অর্থনৈতিক সুশাসন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। শুধু প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক অংশীদারদের অর্থনৈতিক মিথস্ক্রিয়ার মাধ্যমে এটা অর্জন করা সম্ভব।

এই গ্রহ অনেক দেশেই বিদেশি ষড়যন্ত্র প্রত্যক্ষ করেছে। এই ষড়যন্ত্রের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে অর্থনীতি। অর্থনৈতিক সংকটে আমরা আজ যে পরিস্থিতি মোকাবেলা করছি, তার কিছুটা বিদেশি ষড়যন্ত্রের অংশ, কিছুটা আমদানি-রপ্তানির ভারসাম্য বজায় রাখতে আমাদের অক্ষমতা, ডলারের ক্রমবর্ধমান মূল্য নিয়ন্ত্রণের অক্ষমতা অথবা করের ভিত্তি প্রসারিত করার অক্ষমতার বিষয় জড়িত। এই বিষয়গুলোকে আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবা দরকার। পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে ২০২২ সালের মে মাসে পাকিস্তানে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ১৩.৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২০ সালের জানুয়ারির পর এটিই সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির হার। এই অবস্থায় উচ্চমাত্রার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বল্পমাত্রার কর্মসংস্থান বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের দুর্দশা অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

আমরা দেশীয় মিডিয়ার কল্যাণে ‘অর্থনীতির সনদ’ নামে একটি নতুন পরিভাষা সম্পর্কে অনেক কিছু শুনছি। কিন্তু এটা কি কার্যকর হবে? এই সনদের প্রধান বিষয়গুলো কী কী? একটি সাধারণ ধারণা তৈরি হয়েছে যে অর্থনীতির সনদটি সংকট উত্তরণের টেকসই উপায় হতে পারবে। কারণ দেশের অর্থনৈতিক নীতির রূপায়ণ নিয়ে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাপক রাজনৈতিক ঐকমত্যের প্রয়োজনের কথা এই সনদে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু পাকিস্তানে বর্তমানে যে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে সেটা বিবেচনায় নিয়ে সনদটি স্রেফ একটি কল্পলৌকিক ধারণায় পর্যবসিত হয়।

এই কারণে বর্তমান সরকারকে অবশ্যই টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে দেশকে পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে রাজনীতিবিদদের পরস্পরবিরোধী বাক্যবাণও কমিয়ে আনতে হবে। রাজনৈতিক অংশীদারদের অবশ্যই গুরুতর অর্থনৈতিক সংকটের এই সময়ে তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূরে সরিয়ে রাখতে হবে এবং বুঝতে হবে যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সবাইকে মারাত্মক মূল্য দিতে হয় এবং বিশেষ করে সাধারণ পাকিস্তানিদেরই এর মূল্য চুকাতে হয়।

সামষ্টিক অর্থনীতির দাবা বোর্ডে তাই দুই বা ততোধিক অর্থনৈতিক চাল নির্ধারণ করা বর্তমান সমস্যার সমাধানের জন্য যথেষ্ট নয়। পাকিস্তানের মতো একটি বৈচিত্র্যময় দেশের যে সমাজ দেশটির দৈনন্দিন রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এবং পরিবর্তনের জন্য মরিয়া, সেখানে একটি সৃষ্টিশীল, কার্যকর ও নির্ভরযোগ্য শাসনব্যবস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ, যা ধারাবাহিকভাবে ও বিচক্ষণতার সঙ্গে অর্থনৈতিক নীতি অনুসরণ করতে পারে। এ জন্য পাকিস্তানের নাগরিক সমাজ থেকে রাজনৈতিক স্তর পর্যন্ত একটি ঐকমত্য গড়ে তোলা খুব প্রয়োজন।

এই লক্ষ্যে তৃৃণমূল পর্যায়ে পাকিস্তানকে অবশ্যই তার জনসংখ্যাতাত্ত্বিক শক্তিকে শক্তিশালী সামাজিক অগ্রগতিতে রূপান্তর করতে হবে। কারণ মানুষের দুঃখ-দুদর্শা দূর করতে পারলে তারা দেশের চলমান তথ্যযুদ্ধের প্রতি আগ্রহী হবে না। আর জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতিকে ট্র্যাকে ফিরিয়ে আনার জন্য গুরুতর কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। রাজনীতিকদের অবশ্যই বুঝতে হবে যে আইএমএফের মিশন রাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন নয়, বরং এটি সরকারের দায়িত্ব। আইএমএফ শুধু বৈদেশিক দেনা পরিশোধের সংকট কাটিয়ে ওঠায় রাষ্ট্রকে সহায়তা করে থাকে।

অধিকন্তু সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য কয়েকটি তাত্ক্ষণিক সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। এর মধ্যে রয়েছে ভর্তুকি হ্রাস করা, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে ডলারের বিপরীতে রুপির কৃত্রিম অবমূল্যায়ন বন্ধ করা, করজাল বিস্তৃত করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে উৎসাহিত করার জন্য কৃষি, জ্বালানি ও সেবা খাতের জন্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলা।

পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারগুলোর উচিত বেসরকারি খাতে উৎপাদন ও বিনিয়োগের উন্নতি করা। শিল্প উদ্যোগগুলোকে অবশ্যই উৎসাহিত করতে হবে। প্রাদেশিক সরকারগুলোকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে হবে। অর্থনৈতিক নীতি পর্যবেক্ষণের জন্য পার্লামেন্টারি কমিটি গঠন করতে হবে এবং কমিটিগুলোকে অবশ্যই পার্লামেন্টের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। অধিকন্তু সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সমাজের সব শ্রেণির জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। যেমন জন গ্রিন যথার্থই বলেছেন, ‘অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিছুই না, যদি তা অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়। ’

অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা দলীয় সংশ্লিষ্টতার বিষয় হওয়া উচিত নয়, বরং সব রাজনৈতিক কৌশলীর জন্য একটি সাধারণ আদর্শিক ভিত্তি হওয়া উচিত। এখন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার দুষ্টচক্র আরো মেরুকরণের সৃষ্টি করছে। এ অবস্থায় পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক কৌশলীদের উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ও নীতিগত দিকনির্দেশনা প্রদান করতে হবে।

যে বিষয়টি আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সত্যে উপনীত করে তা হচ্ছে, আমাদের এই অর্থনৈতিক দুর্দশার খলনায়ক হচ্ছে অকার্যকর অর্থনৈতিক শাসন। তীব্র চলমান রাজনৈতিক টানাপড়েনের নিচে চাপা পড়ে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কাঠামোর মূল ভিত্তিগুলো একই রয়ে গেছে। অথচ এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাগুলো সর্বদাই জারি রয়েছে। এ জন্য রাজনৈতিক পুনর্মিলন এখন সময়ের প্রয়োজন এবং নগদ অর্থ সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের পূর্বশর্ত।

কোনো সন্দেহ নেই যে প্রাথমিক পদক্ষেপগুলো কঠিন হবে, তবে সেগুলো অর্জন করা অসম্ভব নয়। শুধু রাজনৈতিক পুনর্মিলন ও একটি অর্থনীতির সনদের মাধ্যমে কাঠামোগত সংস্কার সাধনই হতে পারে পাকিস্তানের অর্থনীতির এগিয়ে যাওয়ার পথ। না হলে শ্রীলঙ্কার মতো পরিস্থিতির আশঙ্কা খুব বেশি দূরে নয়।

লেখক : একাধিক থিংক ট্যাংকে কাজ করার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষক

সুত্র : মডার্ন ডিপ্লোমেসি

ভাষান্তর : আফছার আহমেদ

 



সাতদিনের সেরা