kalerkantho

মঙ্গলবার। ৯ আগস্ট ২০২২ । ২৫ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১০ মহররম ১৪৪৪

দক্ষিণাঞ্চলে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

২৯ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দক্ষিণাঞ্চলে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা

আমাদের সক্ষমতার প্রতীক পদ্মা সেতু, যার প্রভাব পড়বে আমাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটনসহ সব ক্ষেত্রে। এটি দেশের সার্বিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশ পর্যটনের জন্য সম্ভাবনাময় একটি দেশ। কিন্তু দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে আমরা এত দিন দেশ ও বিদেশের পর্যটকদের সঠিকভাবে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হইনি।

বিজ্ঞাপন

পর্যটনের সম্ভাবনাময় এলাকা বলতে এযাবৎকাল কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি—এককথায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটকে বিবেচনায় আনা হয়। মূলত ভালো যোগাযোগব্যবস্থার কারণে মানুষ ছুটে যায় কক্সবাজার কিংবা সিলেটে। কুয়াকাটা পর্যটনের অপার সম্ভাবনা হওয়া সত্ত্বেও এত দিন দুর্বল যোগাযোগের কারণে মানুষের পদচারণে সেভাবে মুখরিত হতে দেখা যায়নি। এখন আমাদের সেই সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে এই অঞ্চলের দর্শনীয় স্থানগুলো মানুষের আগমনে মুখরিত হবে এমনটি আশা সবার। পদ্মার নদীশাসন পুরোপুরি সম্পন্ন হলে এক দৃষ্টিনন্দন দৃশ্যের অবতারণা ঘটবে। নদীর পারকে কেন্দ্র করেও পর্যটনের অপার সম্ভাবনা দেখা দেবে। আর এর জন্য দরকার হবে উদ্যোগী উদ্যোক্তা আর সরকারের নীতি-পরিকল্পনা। মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ব্যবসায়ী ও সরকার উভয়েই এর দ্বারা লাভবান হবে।

আমরা এরই মধ্যে জেনেছি, পদ্মার ওপারে বিভিন্ন ধরনের শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। অচিরেই সরকার কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করবে। অর্থনৈতিক কারণে এখানে দেশি ও বিদেশিদের আনাগোনা বাড়বে। আমরা জানি, সিলেটে পাহাড় ও টিলাকে কেন্দ্র করে রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। ঢাকার কাছে গাজীপুরে অনেক রিসোর্ট আছে। সেখানে মানুষ অবকাশযাপনে যাচ্ছে। কাজেই পদ্মা পারকে কেন্দ্র করে উন্নত মানের রিসোর্ট হতে পারে; যার সর্বশেষ ধাপ হবে কুয়াকাটা। দীর্ঘ এই পথে নদীকে কেন্দ্র করে পিকনিক করার জন্য বিভিন্ন ধরনের স্পট বিনোদনের নতুন নতুন ক্ষেত্র গড়ে উঠতে পারে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দিনে এসে আবার দিনে গন্তব্যে যাওয়ার উপযোগী ব্যবস্থা। খাবারের জন্য উন্নত ও মানসম্মত হোটেলের ব্যবস্থা থাকতে পারে। টুঙ্গিপাড়ায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সমাধিকে কেন্দ্র করে পর্যটনের একটি বড় সম্ভাবনা হতে পারে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজনের জন্য বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এখানে আরো ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগেও গোপালগঞ্জকে পর্যটনের জন্য একটি বড় ক্ষেত্র হিসেবে আমরা বিবেচনায় আনতে পারি।

সেতুকে কেন্দ্র করে পর্যটনের বড় ক্ষেত্র সেতুর দুই পারে উন্নত মানের রিসোর্ট তৈরি, যা আকৃষ্ট করবে বিদেশিদেরও। আমরা দেখেছি, যমুনা সেতু ঘিরে যমুনার পারে সুন্দর পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। যমুনা পারের মতো পদ্মার পারে তৈরি হতে পারে আধুনিক মানের রিসোর্ট। বর্ষা মৌসুমে নদীর সৌন্দর্য মানুষকে সহজেই আকৃষ্ট করবে। তবে মনে রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন পরিবেশের জন্য তা হুমকি হয়ে না দাঁড়ায়। রিসোর্টগুলো এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন সেখানে বড় কোনো কনভেনশন, সভা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম করা যায়। আমরা এসব কাজের জন্য এখন কক্সবাজারকে বিবেচনায় আনি। আমাদের দ্বিতীয় ক্ষেত্র হবে পদ্মার পার কিংবা কুয়াকাটার মতো জায়গা। পর্যটনকে একটি শিল্প হিসেবে দেখলে এ খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরাও এ ক্ষেত্রে তাঁদের হাত প্রসারিত করতে পারেন। আমরা তাঁদের ভালো পরিবেশ দিতে পারলে অবশ্যই তাঁরা এগিয়ে আসবেন এবং আমাদের পর্যটন খাতকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবেন ।

আমাদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় যে প্রতিবন্ধকতা ছিল তা আজ দূর হয়েছে। আজকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত যেতে আর কোনো বাধা রইল না। আমাদের পর্যটনশিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নে পদ্মা সেতুকে কাজে লাগাতে হবে। এ খাতে আমাদের আয় বাড়াতে হবে। শুধু দেশীয় পর্যটক নয়, বিদেশিদের আকৃষ্ট করার জন্য ভালো পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা এ ক্ষেত্রে মালদ্বীপকে অনুসরণ করতে পারি। মালদ্বীপে নদীর ওপরের রিসোর্টগুলো সবাইকে আকৃষ্ট করে। আমরা তাদের মতো রিসোর্ট তৈরি করতে পারি কি না তা ভাবতে হবে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে যোগাযোগ হলো একটি দেশের প্রাণ। আমরা সেই প্রাণের পরিপূর্ণ সুবিধা এখন ভোগ করছি। পদ্মা সেতু আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমাদের বিভিন্ন ধরনের শিল্পের বিকাশে পদ্মা সেতু অবদান রাখবে, তেমনি মানুষের বিনোদনের জন্য এ সেতুর অবদান থাকবে। আমাদের আরেকটি কাজ করতে হবে, তা হলো পদ্মার ওপারে একটি বিমানবন্দর তৈরি করা। আশা করি সরকার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনায় আনবে।

এখন সময় পদ্মা সেতুকে কেন্দ্র করে দক্ষিণের মানুষের উন্নয়ন এবং এর মাধ্যমে গোটা দেশের উন্নয়ন। আমাদের বিশ্বাস, বাংলাদেশ ২০৪১ সালের আগেই উন্নত দেশে রূপান্তরিত হবে এবং পদ্মা সেতু তার একটি বড় অংশীদার হয়ে রইবে। পর্যটন একটি বড় খাত, পদ্মা সেতু তাতে অবদান রাখবে। আমরা সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট নীতি ও পরিকল্পনা আশা করব। প্রয়োজনে দক্ষিণাঞ্চলের জন্য পৃথক পর্যটন নীতিমালা করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]

 

 



সাতদিনের সেরা