kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

কলম্বিয়ায় প্রথম বামপন্থী প্রেসিডেন্ট এবং নতুন বার্তা

অনলাইন থেকে

২৮ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সাবেক বামপন্থী গেরিলা যোদ্ধা গুস্তাভো পেত্রোর বিজয় লাতিন আমেরিকার এক যুগান্তকারী ঘটনা। ঐতিহ্যগতভাবে ডানপন্থী অভিজাত দলগুলোই দেশটি শাসন করে এসেছে। এমন একটি দেশে পেত্রো হতে যাচ্ছেন প্রথম বামপন্থী শাসক। তাঁর এই জয়ের পেছনে কারণগুলো হচ্ছে দুর্নীতি, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও সহিংসতা।

বিজ্ঞাপন

কলম্বিয়ার প্রধান শহরগুলোর ভোটাররা এসব অনিয়ম দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। এর মধ্যে কভিড মহামারি হানা দেওয়ায় দেশটির অনিয়ম-দুর্নীতিগুলো আরো স্পষ্ট হয়ে পড়ে।

নবনির্বাচিত গুস্তাভো পেত্রো আগে রাজধানী শহর বোগোতার মেয়র ছিলেন। তিনি ভোটের আগে সামাজিক কর্মসূচি সম্প্রসারণ, ধনীদের ওপর করারোপ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরশীল অর্থনীতি থেকে আসার বিষয়ে প্রচার চালান। তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন যে ৩০ বছর আগে কফিভিত্তিক অর্থনীতি বাদ দেওয়ার পর থেকে কলম্বিয়া তেল, কয়লা ও কোকেন রপ্তানির ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। এসব পণ্যের উৎপাদন ২০১২ সাল থেকে তিন গুণ বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে প্রথম দুটি জলবায়ু জরুরি অবস্থার কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে এবং শেষেরটি বাণিজ্য পরিসংখ্যানে লুকিয়ে থাকা এক ক্ষয়রোগে পরিণত হয়। এই ক্ষয়রোগই সশস্ত্র গ্যাংগুলোর ভয়ংকর পুনরুত্থানে ইন্ধন জুগিয়েছে।

কলম্বিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘন আবারও বাড়ছে এবং উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে পেত্রোকেও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। অথচ দেশটিকে আরো শান্তিপূর্ণ এবং কম বৈষম্যহীন দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টই সঠিক ব্যক্তি। লেখক জন বুনিয়ানের মতোই পেত্রোও বেকারত্বকে শয়তানের কর্মশালা বলে মনে করেন। অধ্যয়নের দিক থেকে তিনি একজন অর্থনীতিবিদ। তাঁর ব্যাখ্যা হচ্ছে যে মাদক ব্যবসা বিকাশ লাভ করেছে মূলত শহুরে শিল্প অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কারণে এবং চাষবাস অলাভজনক হয়ে পড়ার বিষয়টি মাদকপাচার চক্রগুলোকে গ্রামাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। তাই পেত্রোর লক্ষ্য হচ্ছে কৃষি ও শিল্প পুনর্গঠনের মাধ্যমে কলম্বিয়ার অপরাধমূলক সংগঠন এবং এদের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে দুর্বল করা।

পেত্রোর জোট ও শরিকদের ঐতিহাসিক চুক্তি সত্ত্বেও আইন প্রণেতার মাত্র এক-চতুর্থাংশের সমর্থন থাকায় এই কর্মসূচিটি বাস্তবায়ন করা তাঁর পক্ষে সহজ হবে না। একই সঙ্গে তাঁকে সমমনা রাজনীতিবিদ এবং মতাদর্শগত প্রতিপক্ষের মনও জয় করতে হবে। এই নির্বাচনের আগ পর্যন্ত কলম্বিয়ান রাষ্ট্র ও মার্ক্সবাদী ফার্ক গেরিলাদের মধ্যে গ্রামীণ যুদ্ধের ছায়ার কারণে কোনো বামপন্থী প্রার্থীই জনপ্রিয় ভোটের এক-দশমাংশও অর্জন করতে সক্ষম হননি। ২০১৬ সালে এই সংঘাতের অবসান ঘটে, যদিও শান্তিপ্রক্রিয়া অসমাপ্ত রয়ে গেছে। বিগত সরকারের সময় করা শান্তিচুক্তিটি মুখ থুবড়ে পড়ে। এখন সেই চুক্তিটি বাস্তবায়নের জন্য পেত্রোর নীতি এর মধ্যে ফল দিতে শুরু করেছে। কারণ এখনো সক্রিয় বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো তাঁর আলোচনার আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে।

পেত্রোর রাজনৈতিক জীবনের গত এক দশক উল্লেখযোগ্য। এই সময়ে তিনি নারীবাদী, আদিবাসী ও বর্ণবাদবিরোধী কোনো সামাজিক আন্দোলনগুলোর সঙ্গে ছিলেন না। ২০১৯ সাল থেকে কলম্বিয়ার রাজপথে কোনো বিক্ষোভ বা ধর্মঘটের নেতাও তিনি ছিলেন না। তবে পেত্রোর রানিং মেট ফ্রান্সিয়া মার্কেজ এ সময়টিতে পুরো রাজপথেই কাটিয়েছেন। ফ্রান্সিয়া একজন আফ্রো-কলম্বিয়ান নারী, যিনি বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এবং যুবকদের মিছিলে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে সফল হন। তাঁর বিজয়ের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার এই অঞ্চলের তৃতীয় জনবহুলতম দেশটি এখন প্রথমবারের মতো কৃষ্ণাঙ্গ ভাইস প্রেসিডেন্ট পেতে যাচ্ছে। মিসেস মার্কেজের একটি অসাধারণ গল্প রয়েছে। তিনি এমন একটি দেশে সাবেক গৃহকর্মী থেকে ভূমি অধিকার আন্দোলনকারী হয়ে ওঠেন, যে দেশটিতে সর্বাধিকসংখ্যক পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীর মৃত্যু হয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র পেত্রোর এই জয়কে স্বাগত জানিয়েছে। ভেনিজুয়েলার সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে বাইডেন প্রশাসন। সুতরাং কলম্বিয়ায় একই কাজ করার জন্য পেত্রোকে দূরে রাখার কোনো অজুহাত নেই। পেরু, চিলি ও মেক্সিকোতেও নির্বাচনে বামপন্থীরা জয়ী হয়েছে। ব্রাজিলও একই পথে হাঁটতে পারে।

সেন্টার ফর ইকোনমিক পলিসি অ্যান্ড রিসার্চ এই মাসে লিখেছে যে ‘কলম্বিয়ার জটিল সাংবিধানিক নীতি ও ভারসাম্যের সংমিশ্রণ এবং দশকের পর দশক ধরে চলা যুদ্ধ ও ভয়ানক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তবতা কাটিয়ে ওঠার জরুরি প্রয়োজনে একটি আপাতবিরোধী পরিস্থিতি (প্যারাডক্স) তৈরি করেছে। ’ পেত্রো যদি গণতান্ত্রিক উপায়ে এ ধরনের দ্বন্দ্বের সমাধান করতে পারেন, তাহলে এর প্রভাব তাঁর নিজের দেশের উপকূলের বাইরেও অনুভূত হবে।

সূত্র : সম্পাদকীয়, দ্য গার্ডিয়ান

(যুক্তরাজ্য), ভাষান্তরিত

 



সাতদিনের সেরা