kalerkantho

শনিবার । ২০ আগস্ট ২০২২ । ৫ ভাদ্র ১৪২৯ । ২১ মহররম ১৪৪৪

বন্যা মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি কি ছিল আমাদের

ড. কুদরাত-ই-খুদা বাবু

২৭ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বন্যা মোকাবেলায় আগাম প্রস্তুতি কি ছিল আমাদের

আমাদের দেশের জনগণকে প্রায় প্রতিবছরই যেসব প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে নানা সমস্যা পোহাতে হয়, বন্যা সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। বিগত বছরগুলোর মতো চলতি বছরেও গত কয়েক দিনে দেশের উজানে ভারতের আসাম ও মেঘালয়ে প্রায় আড়াই হাজার মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ায় বৃষ্টির পানি ঢল হয়ে সিলেট বিভাগের সব কটি জেলায় প্রবেশ করেছে। ফলে সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়াসহ টেলিফোন নেটওয়ার্ক অকার্যকর হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে নিরাপত্তার স্বার্থে ও দুর্ঘটনা এড়াতে পুরো সিলেটের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পানির ঢল, নদীভাঙন আর প্রবল বন্যায় গৃহহীন, সহায়-সম্বলহীন হয়ে পড়েছে অসংখ্য মানুষ। সর্বোপরি অবর্ণনীয়ভাবে বেড়েছে জনদুর্ভোগ। বন্যার কারণে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে রাস্তায়, স্কুল-কলেজে নির্ঘুম ও দুশ্চিন্তাযুক্ত মনে রাত পার করছে অসংখ্য মানুষ। বন্যাসংশ্লিষ্টদের অভিমত অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন উজানে ভারতীয় অংশে ও বাংলাদেশ অংশে ভারি থেকে অতিভারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদী তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদের পানি দ্রুত বাড়ছে এবং এরই মধ্যে তিস্তা অববাহিকার চারটি জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। ফলে লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও কুড়িগ্রামে বন্যা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হতে পারে বলে মনে করছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র।

বলা বাহুল্য, এ দেশে প্রতিবছরই বন্যা হয় এবং তখন অসংখ্য মানুষ হতাহত হওয়ার পাশাপাশি জনগণকে নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। যেহেতু প্রতিবছরই দেশে বন্যা হয়ে অবর্ণনীয় জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়, তাই বন্যা মোকাবেলায় আমাদের আগাম প্রস্তুতি থাকে কতটুকু—এ প্রশ্ন থেকেই যায়। পাশাপাশি বন্যাকবলিত পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে প্রয়োজনীয় ত্রাণ, সাহায্য-সহযোগিতা ইত্যাদি সঠিকভাবে দেওয়া হয় কি না তা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রতিবছরই সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বন্যার্ত মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য। বন্যাকবলিত জেলাগুলোর শহর ও উপজেলা পর্যায়ে বা যাতায়াত করা সহজ—এমন এলাকাগুলোতে কিছু ত্রাণ তৎপরতা থাকলেও বন্যাকবলিত অনেক জেলায়, বিশেষ করে যেসব জেলায় দুর্গম চরাঞ্চল রয়েছে, সেখানে তেমন কেউ ত্রাণ নিয়ে যায় না। দেশের উত্তরাঞ্চলে এমন অনেক চর রয়েছে, যেখানকার লোকজন স্বাভাবিক শুষ্ক মৌসুমেই অভাব-অনটনের মধ্যে থাকে। তারা বন্যার সময় কতটা ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে পড়তে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। আর বন্যাকবলিত এলাকায় অনেক মানুষই ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়, জনজীবন বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, বিপুল পরিমাণ টাকার সম্পদ বিনষ্ট হয়। বন্যার প্রভাবে অনেক লোকালয় বিলীন হয়ে যায় এবং জনগণ আশ্রয় নেয় বাঁধ বা উঁচু কোনো স্থানে। বন্যার সময় বন্যাকবলিত জেলাগুলোর বেশির ভাগ স্থানের নলকূপ ডুবে যাওয়ায় খাবার পানির তীব্র সংকটও দেখা দিয়ে থাকে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, প্রতিবছর দেশে বন্যা হলেও বন্যা মোকাবেলায় সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে কেন পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকে না এবং কেন বন্যা প্রতিরোধ করার জন্য উপযুক্ত ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয় না? এ ক্ষেত্রে সমস্যা কোথায়? সরকারি-বেসরকারিভাবে প্রতিবছরই বন্যার সময় বন্যাকবলিত জনগণকে নানাভাবে সহযোগিতা করতে দেখা যায়। তবে প্রতিবছর দেশের বন্যাকবলিত জেলায় যে পরিমাণ আশ্রয়কেন্দ্র থাকা প্রয়োজন, সেই তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা অনেক কম। ফলে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে স্থান পাওয়া মানুষের সংখ্যা নগণ্য। অসংখ্য মানুষ তখন একপ্রকার বাধ্য হয়েই খোলা আকাশের নিচে দিনাতিপাত করে, যা মানবিকতা বিপর্যয়ের ভয়াবহ রূপ। এসব মানুষের জন্য শুধু চালই যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নৌকা, বিশুদ্ধ খাবার পানি, শিশুখাদ্য, ওরস্যালাইনসহ জরুরি ওষুধ-পথ্য ইত্যাদি। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি ত্রাণসামগ্রী সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। বন্যাদুর্গত মানুষের প্রতি সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া আমাদের সবারই নৈতিক দায়িত্ব। তবে বন্যাকবলিত হওয়ার পর বন্যার্তদের সাহায্য-সহযোগিতা করার চেয়ে বন্যা যেকোনো মূল্যে প্রতিরোধ করার ব্যবস্থা করা উত্তম। আগামী দিনগুলোতে সরকারের পক্ষ থেকে বন্যায় আক্রান্ত জেলাগুলোর বিভিন্ন জায়গা চিহ্নিত করে সঠিক উপায়ে বাঁধ ও বেড়িবাঁধ নির্মাণ, নদীর তীরবর্তী এলাকাগুলোয় জিও টিউব ফেলার ব্যবস্থা করা, নদীর নাব্য বৃদ্ধি করার সুব্যবস্থা করলে সহজেই বন্যা মোকাবেলা করা যায়। আর এই সব কিছুর উপযুক্ত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে অর্থাৎ বন্যা মোকাবেলা করার জন্য সব ব্যবস্থা ভালোভাবে কার্যকর করা হলে নিশ্চয় দেশের জনগণকে আর বন্যার কারণে চরম মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হতে হবে না।

 

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

[email protected]

 



সাতদিনের সেরা