kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

কিউএস র‌্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মন খারাপ করা অবস্থান

মো. জাকির হোসেন

২৬ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



কিউএস র‌্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মন খারাপ করা অবস্থান

বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংকিং মূল্যায়নকারী যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কিউএস গত ৮ জুন তাদের ওয়েবসাইটে ‘কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র‌্যাংকিংস ২০২৩ : টপ গ্লোবাল ইউনিভার্সিটিস’ শীর্ষক বৈশ্বিক র‌্যাংকিং প্রকাশ করেছে। কিউএসের প্রকাশিত সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকাকে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য র‌্যাংকিংগুলোর একটি মনে করা হয়। এই র‌্যাংকিংয়ে আটটি সূচকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামগ্রিক মান নিরূপণ করা হয়। প্রতিটি সূচকে ১০০ করে স্কোর থাকে।

বিজ্ঞাপন

সব সূচকের যোগফলের গড়ের ভিত্তিতে সামগ্রিক স্কোর নির্ধারিত হয়। সূচকগুলো হলো একাডেমিক খ্যাতি, চাকরির বাজারে সুনাম, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, শিক্ষকপ্রতি গবেষণা-উদ্ধৃতি, আন্তর্জাতিক শিক্ষক অনুপাত, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অনুপাত, আন্তর্জাতিক গবেষণা নেটওয়ার্ক ও কর্মসংস্থান। কিউএসের এবারের র‌্যাংকিংয়ে বিশ্বের এক হাজার ৪০০ বিশ্ববিদ্যালয়কে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে? ১০০-তে ১০০ স্কোর নিয়ে টানা ১১ বারের মতো প্রথম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি)। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়, তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। এ ছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে আছে যথাক্রমে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়। সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের ২০টি ও পাকিস্তানের চারটি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৩০০-তে স্থান পেয়েছে। বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় সেরা ৮০০-তে স্থান পায়নি। ৮০১ থেকে ১০০০তম অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। এই র‌্যাংকিংয়ে সেরা ৫০০-এর পরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করা হয় না। সে জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বুয়েটের অবস্থান সুনির্দিষ্টভাবে কত নম্বরে তা উল্লেখ করেনি কিউএস।

বিশ্বসেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় স্থান না পাওয়ায় খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মন খারাপ হয়েছে। হতাশার মাত্রাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে ভারত ও পাকিস্তানের সেরা তালিকাভুক্ত হওয়ার ঘটনা। অনেকের কষ্ট এ জন্য যে তারা পারলে আমরা পারি না কেন? দ্রুত মন খারাপ সারানোর কোনো দাওয়াই আমাদের জানা নেই। তবে আমিও আপনাদের মতো স্বপ্ন দেখি বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে আমাদের উন্নতি ঘটাতে হবেই। সেরা ৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে না থাকার কারণে সব শেষ হয়ে গেছে এমন নয়। আমাদের এই ভগ্নদশা শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষাগ্রহণ করে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, জার্মানিসহ বিশ্বের প্রথম সারির বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন ও গবেষণা করছেন। ইউনেসকোর ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকসের (ইউআইএস) তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে ৬০ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন। ২০২০ সালে প্রকাশিত Open Doors Report on International Educational Exchange প্রতিবেদনে প্রকাশ, ওই বছর আট হাজার ৮০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছেন। আরেকটি প্রতিবেদন বলছে, এমআইটি, প্রিন্সটন, হার্ভার্ড, ইয়েল প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বিশ্বের এক নম্বর বিশ্ববিদ্যালয় এমআইটিতে এখন বাংলাদেশের ১৬ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। এমআইটির প্রাক্তন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘Bangladeshi Students Association at MIT’-র সদস্যসংখ্যা শতাধিক। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়তে গেছেন তাঁরা অধ্যয়ন-গবেষণা করতে না পেরে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এসেছেন এমন ঘটনা বিরল।

এই শিক্ষার্থীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার যোগ্যতার ভিত কিন্তু বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই তৈরি করে দিয়েছে। কিউএস র‌্যাংকিংয়ের বরাত দিয়ে যাঁরা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাকে ভাগাড়ে নিক্ষেপ করছেন, তাঁরা পুরো সত্যটা উপলব্ধি করছেন না। অ্যালপার ডগার (এডি) সায়েন্টিফিক ইনডেক্স নামে আন্তর্জাতিক গবেষক ও বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিং প্রতিষ্ঠানের ২০২১ সালে প্রকাশিত বিশ্বের সেরা গবেষকদের তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশের এক হাজার ৭৮৮ গবেষক। আন্তর্জাতিক নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল, বই ও গবেষণামূলক প্রবন্ধের তথ্য নিয়ে কাজ করে বিশ্বমানের গবেষণা ডাটাবেইস ‘স্কোপাস ইনডেক্স’। এখান থেকে উপাত্ত নিয়ে তৈরি করা প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২১ সালে বাংলাদেশি গবেষকরা আন্তর্জাতিক জার্নালে মোট ১১ হাজার ৪৭৭টি গবেষণা প্রকাশ করেছেন। ২০২০ সালে এই সংখ্যা ছিল আট হাজার ১৪০, ২০১৯ সালে ছয় হাজার ৩৬৩ এবং ২০১৮ সালে পাঁচ হাজার ২৩৪টি। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সাইটেশনের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর সেরা ২ শতাংশ বিজ্ঞানীর র‌্যাংকিং প্রকাশ করা হয়। সে তালিকায় সেরা ১০০ প্লান্ট বায়োলজিস্টের মাঝে স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশি গবেষক শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মীর্জা হাসানুজ্জামান।

বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে আমাদের আরো এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকৃতির নিয়ম হলো, ভালো ফলন পেতে হলে ভালো মানের বীজ, প্রয়োজনীয় জৈব/অজৈব সার প্রয়োগ, জলসিঞ্চন ও নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। তাই শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো দরকার। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক গবেষণা সংক্রান্ত ব্যয় ২.৩১ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ২০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক গবেষণা ব্যয় ১১ হাজার ৩৭১ কোটি টাকা, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। ডিউক, স্ট্যানফোর্ড ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বার্ষিক ব্যয় যথাক্রমে আট হাজার ৬৩২ কোটি, আট হাজার ৪৬৬ কোটি এবং আট হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশের ৫১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ, গবেষণা, প্রশাসনিক ব্যয় ইত্যাদি মিলিয়ে বরাদ্দ ১০ হাজার ৪৪৪ কোটি চার লাখ টাকা। এই বাজেটের মধ্যে উচ্চশিক্ষায় ইউজিসি ও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার জন্য বরাদ্দ ১৫০ কোটি টাকা।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গবেষণা খাতে তাদের জিডিপির কত শতাংশ ব্যয় করে তার ভিত্তিতে United Nations Educational, Scientific and Cultural Organization (UNESCO) Institute for Statistics ১৩৫টি দেশের তালিকা করেছে। তালিকায় ভারত, পাকিস্তান, এমনকি নেপালের নাম আছে; কিন্তু বাংলাদেশের নাম নেই। CIA World Fact Book, ২০২০-এ শিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তার জিডিপির কত শতাংশ ব্যয় করে তার উল্লেখ রয়েছে। ১৭৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬৮তম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিচে রয়েছে কম্বোডিয়া, বার্মুডা, কঙ্গো, মোনাকো, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক ও দক্ষিণ সুদান। ভারতের আইআইটি মুম্বাইয়ের ২০২১-২২ সালের বাজেটে বরাদ্দ ছিল ৩২৯ কোটি রুপি, অর্থাৎ প্রায় ৩৯২ কোটি টাকা? আর সেই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার খাতে বরাদ্দ ছিল ১৫ কোটি টাকা। গবেষণা খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, এ জন্য গবেষণার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি। সব শিক্ষক আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করেন না, যাঁরা গবেষণা করেন তাঁদের জন্য গবেষণা প্রণোদনার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কিউ ১/২/৩/৪ র‌্যাংকিং অনুসারে প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধের জন্য শিক্ষকদের গবেষণা প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। এতে অনেক বেশিসংখ্যক শিক্ষক গবেষণায় উৎসাহী হবেন আশা করা যায়। আর এর প্রভাব পড়বে র‌্যাংকিংয়ের উন্নতিতে। বিশ্বের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে, যাঁরা লেকচারার পদে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পান, তাঁদের শুরুতেই গবেষণার জন্য একটি ফান্ড দিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাঁদের গবেষণার ক্ষেত্রে কোনো প্রতিবন্ধকতা না আসে। ভারতেও এই ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এবারের কিউএস র‌্যাংকিংয়ে ভারতের আইআইটি ১৫৫ নম্বরে আছে। ভারতের আইআইটির একজন পূর্ণ অধ্যাপকের বেতন বাড়িভাড়া বাদ দিয়ে মাসে তিন লাখ রুপির কাছাকাছি (বাংলাদেশি টাকার হিসাবে প্রায় তিন লাখ ৬০ হাজার টাকা)। বাংলাদেশের সিলেকশন গ্রেডপ্রাপ্ত সর্বোচ্চ বেতনধারী অধ্যাপকদের বেসিক বেতন মাসে ৭৮ হাজার টাকা মাত্র, যা আইআইটির প্রফেসরদের বেতনের মাত্র ২২ শতাংশ? পাকিস্তানের অধ্যাপকের বেতন আরো বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ও সমমানের বেতন স্কেলের সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ও ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে ব্যাপক বৈষম্য রয়েছে। এটি শিক্ষককে সামাজিক-পারিবারিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিজেই রাষ্ট্রসৃষ্ট বঞ্চনা ও বৈষম্য মোচনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। অনেকেই প্রজেক্ট কনসালট্যান্সি, শেয়ারবাজার, প্রাইভেট-কোচিং, স্কুল-কলেজের জন্য বই লেখা, এমনকি লিজ নিয়ে জমি চাষসহ নানা পথ বেছে নিয়েছেন। এভাবেই শিক্ষা ও শিক্ষার্থীর প্রতি শিক্ষকের অখণ্ড মনোযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে শিক্ষকের সম্পর্ক শিথিল হয়ে পড়েছে। শিক্ষকতা ব্রত থেকে পেশা তথা চাকরিতে রূপ নিয়েছে। উচ্চশিক্ষার প্রাণ গবেষণা কমে এসেছে। শিক্ষার্থীর সঙ্গে শিক্ষকের যান্ত্রিক সম্পর্ক গতানুগতিক ক্লাস আর পরীক্ষার ফাঁদে অটকা পড়েছে। গবেষকদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও প্রণোদনার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করা ও গবেষণা অবকাঠামো নির্মাণ করা জরুরি। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক গ্রুপিং-লবিং বন্ধ করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক নিয়োগে আরো সতর্কতা ও বিবেচনা বোধও প্রয়োজন।

 লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]



সাতদিনের সেরা