kalerkantho

শনিবার । ১৩ আগস্ট ২০২২ । ২৯ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৪ মহররম ১৪৪৪  

পদ্মা সেতু : বাঙালির স্বপ্নের পরম্পরা

মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম

২৫ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



পদ্মা সেতু : বাঙালির স্বপ্নের পরম্পরা

‘তৈল ঢালা স্নিগ্ধ তনু নিদ্রা রসে ভরা’ বাঙালির স্বপ্ন দেখার শুরু খুব বেশিদিন আগের নয়, মাত্র পৌনে এক শতকের। এর আগের সুদূর অতীত পর্যন্ত ইতিহাস পর্যালোচনা করলে কোথাও বাঙালির তেমন স্বপ্নের কথা পাওয়া যায় না। স্বপ্ন দেখার মতো অবস্থায়ও ছিল না বাঙালির। প্রায় আড়াই হাজার বছরের যাপিত জীবনে বাঙালির নিজস্ব বলতে কিছু ছিল না।

বিজ্ঞাপন

তাদের রাষ্ট্র ছিল না, স্বাধীনতা ছিল না, স্বাধীনভাবে মত প্রকাশের অধিকার ছিল না, জাতি হিসেবে আত্মপরিচয়ের যেসব উপাদান প্রয়োজন, তার মধ্যে একমাত্র নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ছাড়া আর কোনো উপাদান তারা তাদের জীবনে সমন্বয় করার সুযোগ পায়নি। কারণ গত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তারা প্রজাই থেকেছে, জনগণ হতে পারেনি। যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা রাজনৈতিক কূটকৌশলের মধ্য দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে বটে, কিন্তু বাঙালি সবকালেই প্রজা থেকেছে। এর থেকে পরিত্রাণের পথ তারা কখনো পায়নি, কেউ তাদের সেই পথে অগ্রসর হওয়ার অনুপ্রেরণাও দেয়নি।

ব্রিটিশ ভারতে ইংরেজ শাসনামলে অন্যান্য অংশের জনগণের সঙ্গে বাঙালির মধ্যেও কিছু কিছু জাতীয়তাবাদী চেতনা, অর্থাৎ আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষার স্ফুরণ দেখা যায়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলার শিক্ষিত বাঙালির অংশগ্রহণ এবং আত্মত্যাগ জাতি হিসেবে আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষারই পরিচয় বহন করে। কিন্তু সেখানেও বাঙালির সামগ্রিক মনোভাব পরস্ফুিট হয় না। যাঁরা নেতৃত্বে ছিলেন তাঁরা সমগ্র জাতির প্রতিনিধিত্ব করতে পারেননি। ১৯৪০-এর পর থেকে পূর্ব ও পশ্চিম বাংলায় সৃষ্ট সম্প্রদায়িক দাঙ্গা ১৯৪৭-এর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ ত্বরান্বিত করে। এই স্বাধীনতায়ও বাঙালি তার পূর্ণ ও মৌলিক আত্মপরিচয় খুঁজে পেল না।

এই পর্যায়ে এসে বাঙালি নিজেদের কিছুটা প্রজা থেকে জনগণ ভাবার সুযোগ পায় এবং স্বাধীন দেশের নাগরিক হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, সেই স্বপ্ন ভাঙাতে বেশিদিন সময় লাগেনি। তারা বুঝতে পারে, ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের উপনিবেশে প্রবেশ করেছে। কিন্তু উপায় কী? উপায় হলো, অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আত্মপরিচয়ের সংকটের সমাধান করা। তার জন্য প্রয়োজন সুসংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলন। এই কাজটি শুরু করলেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে স্থায়ীভাবে ঢাকায় ফিরে আসার পর থেকে পরবর্তী ২৪ বছর তিনি নিরলসভাবে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি করেছিলেন, তা হলো বাঙালির মনে জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আত্মপরিচয় ফিরে পাওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা পূরণের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলা। স্বপ্নপূরণের আকাঙ্ক্ষা তিনি এত সার্থক ও সফলভাবে বাঙালির মনে জাগিয়ে তুলতে পেরেছিলেন যে বাঙালি তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষায়, তাদের আত্মপরিচয় উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়ল ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে, ৩০ লাখ লোকের প্রাণ আর দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হলো। প্রথমবারের মতো বাঙালি তার নিজস্ব রাষ্ট্র পেল।

বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখার, স্বপ্নপূরণের পথে অগ্রসর হওয়ার যে অনুপ্রেরণা জাগিয়ে দিয়ে গেছেন, বাংলাদেশ আজকে সেই স্বপ্নেরই পরম্পরার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলেছে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য নেতৃত্বে। পিতার মতো দেশ ও জাতির প্রতি অকুণ্ঠ আবেগ এবং ভালোবাসা, ঔচিত্যজ্ঞানের সমন্বিত প্রয়াসে তিনিও বাংলাদেশের জনগণকে উন্নয়ন অগ্রযাত্রার অংশীজন করতে পেরেছেন।

টানা এক যুগ তিনি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। মানবিক জ্ঞানের অনুপ্রেরণায় কর্মকুশলী এই মানুষটি এমন সব কর্মযজ্ঞ পরিচালনা করে চলেছেন যে গোটা পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। গত এক যুগে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মেগাপ্রকল্প তিনি হাতে নিয়েছেন। তার বেশির ভাগই বাস্তবায়নের পথে। নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পদ্মা সেতু এই মেগাপ্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম। নিজস্ব অর্থায়নে এমন একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া রীতিমতো বিস্ময়কর।

এ ধরনের প্রকল্প সাধারণত আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়ে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এর কোনো ব্যত্যয় ছিল না। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি হাতে নেওয়া হয়েছিল বিশ্বব্যাংকসহ অন্যান্য সংস্থারগুলোর অর্থায়নের আশ্বাসের ভিত্তিতে। চুক্তিপত্র হয়ে গিয়েছিল। বেশির ভাগ ব্যয় বহন করার কথা ছিল বিশ্বব্যাংকের। কিন্তু বায়বীয় কারণে বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে এবং এই পথ অনুসরণ করে অন্যান্য সংস্থাও পিছিয়ে যায়। ২০১২ সালের ২৯ জুন বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার করে নেওয়ার ফলে পুরো প্রকল্পই শুধু অনিশ্চিত হয়ে পড়ল তা নয় বরং গোটা জাতিই অসম্মানিত হলো। বাস্তবিক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন থেকে বিশ্বব্যাংকের পিছিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আনীত সব অভিযোগই যে অসত্য ছিল, সেটা পরে প্রমাণিত হয়েছে। দেশবাসী ও বিশ্ববাসী সে সম্পর্কে সম্যক অবগত হয়েছে। তিনি সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০১২ সালের ১০ জুলাই জেলা প্রশাসক সম্মেলনে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবং ২০১৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর মূল কাজের শুভ উদ্বোধন করেন।

পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ সুসম্পন্ন হয়েছে। ২৫ জুন ২০২২ পদ্মা সেতুর উদ্বোধন করবেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০১ সালের ৪ জুলাই মুন্সীগঞ্জের মাওয়া প্রান্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মা সেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কিন্তু পরবর্তী মেয়াদে (২০০১-২০০৬) বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রক্রিয়া কার্যত থেমে যায়। ২০০৮ সালে আবার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে পদ্মা সেতু প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে তাতে রেলপথ যুক্ত করে ব্যয় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। একটি শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করার দুঃসাহসিক প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

পদ্মা সেতু এখন আর শুধু স্বপ্ন নয়, স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন। পদ্মা সেতু উদ্বোধনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে বাঙালি যেমন স্বপ্নপূরণের আনন্দে উদ্বেলিত, তেমনি বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে এ এক মহাবিস্ময়! বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্রোতস্বিনী নদীটিকে শাসন করে তার ওপর নিজস্ব অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে ৬.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ, ১৮.১০ মিটার প্রস্থ দ্বিতলবিশিষ্ট এবং ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সহনীয় একটি সেতু, সুতরাং একে মহাবিস্ময় বলেই মনে হয়।

বিস্ময়কর এই সেতুটি নির্মাণে বৈদেশিক মুদ্রা জোগানের ক্ষেত্রে একক ও বিরল গৌরবের অংশীদার হয়েছে অগ্রণী ব্যাংক। যেখানে বিশ্ব সাহায্য সংস্থাগুলো ১.২ বিলিয়ন ডলার দিতে অপারগ হলো, সেখানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অন্যতম এক ব্যাংক অগ্রণী ব্যাংক ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত (১৯-০৬-২২) এককভাবে ১.৪৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সরবরাহ করেছে। সেতু নির্মাণ সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় আরো এক বিলিয়ন ডলার সরবরাহ করতে প্রস্তুত রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ সরবরাহ সম্ভব হয়েছে ব্যাংকটির নিজস্ব রপ্তানি আয় ও প্রাপ্ত রেমিট্যান্স থেকে। অগ্রণী ব্যাংক যে শুধু পদ্মা সেতুতেই অর্থ সরবরাহ করেছে তা নয়, বরং মেয়র হানিফ ফ্লাইওভারের মতো দেশের প্রথম পিপিপিসহ অনেক অবকাঠামো বিনির্মাণে অর্থায়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী ব্যাংকের চলমান প্রক্রিয়ারই একটি গৌরবময় অংশীদারি।

পদ্মা সেতু বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিধারাকে আরো বেগবান করবে। এই একটি সেতুর ফলে শুধু জিডিপি ১.২-২.০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে তা নয়, এটি চেঞ্জ মেকার হিসেবে বহুমুখী সুফল বয়ে নিয়ে আসবে বলে অর্থনীতিবিদরা আশাবাদ ব্যক্ত করছেন। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার ছয় কোটিরও বেশি জনগণকে দেশের অন্যান্য অংশের সঙ্গে সেতুবন্ধ তৈরি করতে যাচ্ছে পদ্মা সেতু—এসব কিছুই অর্থনৈতিক উন্নয়নের মানদণ্ডে বিশ্লেষিত বিষয়। পদ্মা সেতু বাঙালির স্বপ্ন পরম্পরার এক দীর্ঘ গৌরবময় অর্জনের অন্যতম প্রতীক, যে স্বপ্নের সূচনা হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ২৪ বছরের নিরলস সংগ্রাম ও তাঁরই নেতৃত্বে অর্জিত স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে। তাঁরই সুযোগ্য কন্যা বাংলাদেশের সফল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বপ্নের পরম্পরা তৈরি করে চলেছেন, স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার আত্মপ্রত্যয় তৈরি করে চলেছেন। এমন একটি গৌরবময় কর্মযজ্ঞে অংশীজন হতে পেরে জাতির পিতার দেওয়া নাম অগ্রণী ব্যাংক সবিশেষ গর্বিত। পদ্মা সেতু আমাদের, সব বাঙালির।

 

লেখক : অগ্রণী ব্যাংক লিমিটেডের এমডি এবং সিইও

 



সাতদিনের সেরা