kalerkantho

বুধবার । ২৯ জুন ২০২২ । ১৫ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৮ জিলকদ ১৪৪৩

সাম্প্রতিক দুর্যোগ সম্পর্কে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ

২৪ জুন, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



সাম্প্রতিক দুর্যোগ সম্পর্কে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা

অনাদিকাল থেকেই নানা রকম দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে আসছে মানুষ। এসব দুর্যোগ মোকাবেলা এবং এর অভিজ্ঞতার আলোকে দুর্যোগকালীন সম্ভাব্য সমস্যাগুলো কাটিয়ে ওঠার প্রচেষ্টাই হচ্ছে মানুষের টিকে থাকার ইতিহাস। দুর্যোগ সাধারণত দুই রকমের হয়। একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অন্যটি মানবসৃষ্ট।

বিজ্ঞাপন

প্রকৃতিতে সৃষ্টি হওয়া দ্রুত ও নিয়ন্ত্রণহীন দুর্ঘটনাগুলো হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। আর মানুষের নানা নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে সমাজে যে বিপর্যয় নেমে আসে সেটা মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ। দুটির মধ্যেই আন্তঃসম্পর্ক আছে। কারণ কিছু প্রাকৃতিক দুর্যোগ আছে, যাতে মানুষের আচার-আচরণের প্রভাব রয়েছে। যেমন—জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ুদুষণ ইত্যাদি। মানুষের তৈরি দুর্যোগ হচ্ছে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট ও বাঁধ তৈরি এবং অস্ত্র ও প্রযুক্তির ঝুঁকিপূর্ণ ব্যবহার ইত্যাদি।

দুর্যোগ যেভাবেই হোক, সবচেয়ে বড় কথা হলো মানুষই এর কেন্দ্রে থাকে। তাই দুর্যোগের কারণ চিহ্নিত করা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগের সঙ্গে অভিযোজন করার ক্ষেত্রে সমাজ ও রাষ্ট্র এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। নদীর পানি যখন বাড়তে থাকে, তখন সম্ভাব্য বন্যা মোকাবেলার প্রস্তুতি সংশ্লিষ্টদের গ্রহণ করতে হয়। সাধারণত পানি যখন আস্তে আস্তে বাড়তে থাকে, তখন এই সুযোগ থাকে। কিন্তু ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা হঠাৎ বন্যায় সে সুযোগটা থাকে না। তবে তাত্ক্ষণিক দুর্যোগকেও দুই দিক থেকে বিবেচনা করতে হয় যে এটি আসলেই হঠাৎ করেই চলে এসেছে, নাকি জানা-বোঝার ঘাটতি বা অন্য কোনো কারণ রয়েছে।

এই মুহূর্তে দেশে বন্যাজনিত দুর্যোগ চলছে, যার শুরুটা হয়েছে সিলেট ও সুনামগঞ্জে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এটা কি কোনো তাত্ক্ষণিক দুর্যোগ? আমি বলব, লোকজন বুঝতে পারেনি—এটা এমন কিছু নয়। এর সঙ্গে অতিবৃষ্টির সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যবস্থাপনাজনিত অভাবও রয়েছে। যেকোনো বিষয়ে বাংলাদেশে যুক্তি-পাল্টা যুক্তি ও বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা বেশি হয়। এবারও যেমন অতিসহজীকরণ করে বলা হলো যে সীমান্তের ওপারে অতিবৃষ্টি হয়েছে বলেই এই হঠাৎ বন্যা। বলা হচ্ছে, চেরাপুঞ্জিতে তিন দিনে যে বৃষ্টি হয়েছে, তা ১২২ বছরে হয়নি। অথচ তথ্যটি ঠিক নয়। ১৯৮৪ সালেও এমন বৃষ্টি হয়েছিল সেখানে। প্রকৃতপক্ষে সিলেট-সুনামগঞ্জে এই তাত্ক্ষণিক দুর্যোগের পেছনে শুধু অতিবৃষ্টি নয়, এর পেছনে নদীর নাব্যতা, পানির স্রোতের স্বাভাবিক পথ ব্যাহত করার মতো কারণগুলোও যুক্ত হয়েছে। দেখা গেছে, উজান থেকে নেমে আসার পথে পানির স্রোতে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

সুতরাং এই বিষয়গুলোকে একসঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় না নিলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ঠিক হবে না এবং ভবিষ্যতেও আর যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারব না। এখানে দুটি জিনিস আমাদের করতে হবে। প্রকৃতিকে বশ করা কঠিন, কিন্তু একে সহনীয় করা সম্ভব। আরেকটি হলো অভিযোজন বা প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে তোলা। যেমন দেখা যায়, ভিন্ন ভিন্ন টপোগ্রাফিতে (ভূসংস্থান) মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ব্যবস্থা গড়ে তোলে। সব টপোগ্রাফিতে মানুষ যদি একই রকম আচরণ করে এবং সব জায়গায় একই ধরনের যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলে, সেটা মোটেও ঠিক হবে না।

বাংলাদেশ বদ্বীপ অঞ্চল। এখানে প্রচুর নদ-নদী আছে। এখানে সড়কপথ যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, নদীমাতৃক দেশ হিসেবে এর জলপথের উপযোগিতাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আবার রেলপথও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে আমাদের ভারসাম্য রাখতে হবে। এর চেয়েও বড় কথা, যে অঞ্চলে যেটা উপযোগী এবং যেটা প্রকৃতির স্বাভাবিক গতিপথ বাধাগ্রস্ত করবে না, সেটাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এখানে পানির সঙ্গে বসবাস একটি সাধারণ চিত্র। তাই আমরা যদি অভিযোজনব্যবস্থাকে উন্নত করতে পারি, তাহলে বন্যার দুর্যোগের দিকটি বড় না হয়ে এর ইতিবাচক দিকটা নিয়েও ভাবা যাবে। যেমন—বন্যায় অনেক পলি মাটি আসে, মাটির উর্বরতা বাড়ে। সুতরাং আমাদের কর্মসূচিগুলো হতে হবে অভিযোজনমূলক, যাতে জান-মালের ক্ষতি কমিয়ে আনা যায়।

দেশে প্রতিবছরই সিলেট, তথা হাওরাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চল দিয়ে বন্যার বিস্তৃতি ঘটে। এ দুটি দিক থেকে আসা পানির স্বাভাবিক গতি যাতে বাধাপ্রাপ্ত না হয়, সেভাবেই আমাদের অবকাঠামোগুলো তৈরি করতে হবে। তাই পানিপ্রবাহের পথে নানা রকম বাঁধ বা কাঠামো তৈরি করার বিষয়ে আমাদের ভাবার সময় এসেছে। আমরা যে পদ্মা সেতু করেছি, সেখানে নদীশাসন ও নদীর স্বাভাবিক গতি ধরে রাখতে গিয়ে বহু টাকা খরচ করা হয়েছে। একই উদাহরণ নেদারল্যান্ডসে দেখতে পাওয়া যায়। দেশটির টপোগ্রাফি আমাদের মতো অনেকটা। এদের ভূমির স্তর পানি থেকে বেশি ওপরে নয়। এরা সব কিছু সেভাবেই গড়ে তোলে। পানির স্বাভাবিক গতি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেভাবেই রাস্তাঘাট করেছে। এই জিনিসগুলো নিয়ে আমাদের বিশেষজ্ঞদের ভাবতে হবে।

আমাদের জরুরি মোকাবেলা (ইমার্জেন্সি রেসপন্স) নিয়েও নতুন করে ভাবতে হবে। আমরা তত্ক্ষণিকভাবে যে মোকাবেলা ব্যবস্থা গ্রহণ করি, সেটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে। এরপর সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ে কাজ হয়। যেকোনো দুর্যোগে দেখা যায় ব্যক্তিগত পর্যায়ে মানুষ এগিয়ে আসছে। এটা স্বতঃস্ফূর্ত। সামাজিক পর্যায়ে মোকাবেলার সবচেয়ে বড় ক্ষেত্রটি হতে পারত ইউনিয়ন পরিষদ; কিন্তু সেটা ততটা কাজ করে না। আমাদের বেসরকারি সংস্থা (এনজিও), সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটিভিত্তিক সংগঠন যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। আমরা আগেও এটা দেখেছি এবং এবারও দেখছি। ১৯৮৮ সালের বন্যা, ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়—এমন অনেক উদাহরণ রয়েছে। তবে এবারের সিলেট ও সুনামগঞ্জের দুর্যোগের ক্ষেত্রে শুরুর দিকে ব্যক্তিগত ও সামাজিক মোকাবেলা ব্যবস্থা আগের মতো দেখা যায়নি। বলা হচ্ছে, ওই অঞ্চলের সবাই আক্রান্ত বলে ততটা চোখে পড়েনি; কিন্তু এটাই একমাত্র কারণ হতে পারে না।

জাতীয় পর্যায়ে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এবার তাদেরও খুব একটা তৎপর দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় পর্যায়ে সরকার কাজটি করছে স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে, ডিসি, ইউএনওর মাধ্যমে। স্থানীয় প্রতিনিধিদের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবেলার কাজটি খুব একটা দেখতে পাইনি। বিজিবি, পুলিশ, র‌্যাব কাজ করেছে। একটি আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে থেকেই দুর্যোগ মোকাবেলার কাজটি করা হচ্ছে।

করণীয় : এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে। এ জন্য কয়েকটি করণীয় ঠিক করা যেতে পারে। প্রথমেই প্রশাসন ও উন্নয়নকে বিকেন্দ্রীকরণ করা। হাওরের ভেতর দিয়ে বিরাট রাস্তা নির্মাণ নিয়ে নানা কথা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা রাস্তাটি না করতে মতামত দিয়েছিলেন। কিন্তু এবারের বন্যার পর দেখা গেল, এমন কিছু বিশেষজ্ঞ রয়েছেন যাঁরা বলছেন, অতিবৃষ্টির কারণেই এটা হয়েছে এবং রাস্তাটি বড় কোনো সমস্যা নয়। মূলত প্রশাসন ও উন্নয়ন কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে প্রায়ই স্থানীয় সমস্যাগুলো উপেক্ষিত থেকে যায় এবং উদ্ভূত সমস্যাগুলোর দায় এড়িয়ে যান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা। অথচ বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে স্থানীয়ভাবে জবাবদিহির একটা সুযোগ থাকে।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক পুঁজি শক্তিশালী করা। মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক সংহতি, সহমর্মিতা, সমাজ ও সরকারের প্রতি আস্থা—এসব মিলেই সামাজিক পুঁজি গড়ে ওঠে। এটা একটা বিরাট শক্তি। বেসরকারি সংগঠন, সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম—সবই সামাজিক পুঁজির অংশ। স্বাস্থ্য খাতে, বিশেষ করে ইপিআই কর্মসূচিতে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবকের অংশগ্রহণ আমরা দেখেছি। এ কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের টিকাদানের সাফল্য প্রশংসিত। তবে দুঃখজনকভাবে এই পুঁজি আস্তে আস্তে দুর্বল হয়ে আসছে। উৎসাহ দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। এর একটা কাঠামোতগত কারণও রয়েছে। সেটা হচ্ছে প্রশাসন। প্রশাসনই সব দেখবে—এই প্রবণতাই সামাজিক পুঁজিকে দুর্বল করে দিয়েছে।

তৃতীয়ত, সরকারি ও সামাজিক ভবনগুলো বহুমুখী করে নির্মাণ করা। আশ্রয়কেন্দ্র সবখানে তৈরি করা যাবে না। আমার পরামর্শ হলো স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, এমনকি থানা কমপ্লেক্সকে বুহুমুখী করে নির্মাণ করা। ভবনগুলো এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে, যাতে নিচের অংশ প্রয়োজনের সময় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, যে রকম দেশ, সে রকম অবকাঠামো তৈরি করতে হয়। এখন শোনা যাচ্ছে, কেল্লা তৈরি করা হবে। কিন্তু এগুলো সারা বছর খালি পড়ে থাকবে। কেল্লাটি যদি মাল্টিফাংশনাল বা বহুমুখী হয়, তাহলেই কেবল যথার্থ হবে।

চতুর্থত, তথ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন। দুর্যোগের সময় এবং দুর্যোগের আগে-পরে তথ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই সময় তথ্যের সুষ্ঠু প্রচার দরকার। এখন বলা হচ্ছে, সতর্কতা ঠিকভাবে পাওয়া যায়নি, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর আগে থেকে বুঝতে পারেনি কিংবা ভারত থেকে যা পাওয়া গেছে তা সঠিক ছিল না। এসব না বলে যথাযথ তথ্য সরবরাহ জরুরি। প্রাপ্ত তথ্য ফিল্টার করে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হবে, যাতে বিভ্রান্তি দূর হয়। সঠিকভাবে সতর্কবার্তা প্রচারিত হলে প্রস্তুতি নেওয়া যায় এবং স্বেচ্ছাসেবীদের তৎপর রাখা যায়। এবারের ঘটনায় এই দুর্বলতাটি স্পষ্ট হয়েছে।

পঞ্চমত, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্ম এলাকা বণ্টন করা। কে কার ওপর দায় বর্তাবেন, তা করার সুযোগ না দিয়ে দায়িত্ব সুস্পষ্ট করতে হবে।

ষষ্ঠত, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী, যারা ভেতর ও বাইরে থেকে কাজ করবে, তাদের মধ্যে একটা সমন্বয় করতে হবে।

সপ্তমত, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সংগঠিত করা। এসব মানুষকে সাহস প্রদান, তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং দুর্যোগ মোকাবেলার জন্য তাদের প্রস্তুত রাখা।

লেখক : সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

 

 



সাতদিনের সেরা